দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর | বুধবার , ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

পাখীর চোখে পুরো গোল্ড কোস্ট দেখে আমাদের মনের রাজত্বে খেলা করছে মুগ্ধতা। গত কয়েকদিন ধরে গোল্ড কোস্টে চরকির মতো ঘুরেও যা দেখা হয়নি, তা যেনো ২০ মিনিটেরও কম সময়ের এই হেলিকপ্টার রাইড দেখিয়ে দিলো। কী যে সুন্দর! বিস্তৃত মহাসাগর দেখলাম, বনবনানী দেখলাম, মেঘের রাজত্ব দেখলাম, দেখলাম পাল তোলা ইয়ট থেকে রাস্তায় পিঁপড়ার মতো চলাচল করা গাড়িও। আকাশভ্রমণ শেষে আমাদের নিয়ে হেলিকপ্টার নেমে আসলো সাগরপাড়ের হেলিপ্যাডে। আমাদের বেল্ট খুলে দেয়া হলো, একজন একজন করে আমরা নিচে নেমে আসলাম। মনে হলো, রাইডটি মিস করলে সাগরনন্দিনী গোল্ড কোস্টের অপরূপ রূপ দেখা হাতছাড়া হয়ে যেতো।

শত সহস্র মানুষ সী ওয়ার্ল্ডে। ঘুরছেন সকলে। কেউবা রাইডে চড়ছেন। নানা ধরনের রাইড রয়েছে বিখ্যাত এই পর্যটন স্পটে। আমরাও ঘুরে ফিরে দেখছিলাম। কোন রাইডে না চড়লেও ঘুরে ঘুরে রাইডগুলো দেখতে অসুবিধা হচ্ছিলো না। আমার খুব কফি খেতে ইচ্ছে করছিলো। পেয়েও গেলাম ক্যাফে। ক্যাফেতে না বসে আমরা টেকওয়ে নিলাম। মগভর্তি কফিতে চুমুক দিতে দিতে এদিক ওদিক ঘুরছিলাম। লায়ন ফজলে করিম ভাই এবং বিজয় শেখর দা হেলিকপ্টার রাইড দারুণ উপভোগ করেছেন। ডালিয়া ভাবীও। তারা এর আগে কখনো হেলিকপ্টারে চড়েছেন কিনা জানি না। তবে তাদের মুগ্ধতা আমাকেও স্পর্শ করে যাচ্ছিলো।

ট্যুর অপারেটর আমাদের সফরসঙ্গীদের সবাইকে নিয়ে একটি হোয়াটঅ্যাপ গ্রুপ করেছেন। সেখানেই নানা ধরনের টেক্সট দিয়ে তিনি আমাদের পরিচালনা করছেন। যে যেখানেই ঘুরিই না কেন, গ্রুপে ম্যাসেজ দিয়ে আমাদের অল্পক্ষণের মধ্যে তিনি একত্রিত করে ফেলেন। গ্রুপে ম্যাসেজ আসলো যে, আমাদেরকে গেটের বাইরে জড়ো হতে হবে। বাস ছেড়ে দেবে। কফিতে চুমুক দিতে দিতে আমরা সী ওয়ার্ল্ডের গেটের দিকে হাঁটতে লাগলাম।

আমাদের আগে অনেকেই জড়ো হয়েছেন সেখানে, কেউ কেউ আইসক্রীম খাচ্ছিলেন, কেউবা ঠান্ডা পানীয়। সকলেই বেশ উচ্ছ্বসিত। আমাদের বাস এসে পৌঁছালো। আমরা যে যার মতো করে চড়ে বসলাম। অল্পক্ষণের মধ্যেই যাত্রা শুরু করলো বাস। ট্যুর অপারেটর বললেন, আমরা লাঞ্চ করে হোটেলে ফিরে যাবো। বিকেলে নিজেদের মতো করে আপনারা ঘুরে ফিরে দেখবেন।

আমি অথেনটিক অজি ফুড খাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলাম। ভদ্রলোক কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন। বললেন, এখনতো লাঞ্চের অর্ডার করে ফেলেছি। রাতের অর্ডারও দেয়া হয়ে গেছে। তবে অবশ্যই আপনাদেরকে অথেনটিক অজি ফুড খাওয়াবো। যদি খেতে না পারেন তাহলে আমাকে দোষবেন না কিন্তু!

আমাদেরকে লাহোরি কুইজিন নামের একটি রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাওয়া হলো। নামেই বলে দিচ্ছিলো পাকিস্তানি রেস্টুরেন্ট। রেস্টুরেন্টটি বেশ সুন্দর,পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। পাকিস্তানি হলেও আমরা দুইজন বাংলাদেশী মেয়ে ওয়েটার পেয়ে গেলাম। তারা এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন, সপ্তাহে বিশ ঘন্টা কাজ করার সুযোগ পান। ওয়েটার বাঙালি হওয়ায় আমাদের কথাবার্তা বা খাবারের অর্ডারে বেশ সুবিধা হলো। ট্যুর অপারেটর প্রচুর কারি, তন্দুরী, বিরিয়ানি, কাবাব এবং নানের অর্ডার করেছেন। সাথে দারুণ ঝাল করে দেয়া সালাদ। বাঙালি মেয়েটি আমাদেরকে মনে হয় একটু বেশি বেশিই দিচ্ছিলেন। উৎসবমুখর পরিবেশে আমাদের খাবার দাবার চলছিলো। খাবার শেষে ঘন লিকারের দুধ দেয়া চাও খেলাম। চা’টা এতো মজা লাগলো যে, দ্বিতীয় কাপের জন্য আমি মেয়েটিকে অনুরোধ করলাম।

আমাদের বাস আবারো চলতে শুরু করেছে। চালক একাই, কোন সহকারী নেই। ডানে বায়ের যত ঝামেলা সব তিনি একাই সামাল দিয়ে চলছিলেন। বিশাল চওড়া রাস্তা, আট লেনের। কোন গাড়িই লেন ক্রস করছে না। যে যার লেন ধরে এগিয়ে চলছে। কেউ দ্রুত গতির লেনে, কেউবা স্লো লেনে। ঠুকরাঠুকরি নেই, গাড়ির হর্ণ বাজানোরতো প্রশ্নই উঠে না। পৃথিবীর উন্নত তো বটেই,বহু অনুন্নত দেশেও আমি হর্ণ শুনিনি। শুধু আমরাই কারনে অকারণে হর্ন বাজাই! অবশ্য, একথা ঠিক যে, আমাদের বাংলা টেসলা, সিএনজি টেক্সি, লোহার টেম্পু, ঠেলাগাড়িসহ নানা কিছিমের গাড়ির যে জয়জয়কার তাতে হর্ন না বাজিয়ে গাড়ি চালানো বিনে ভিসায় বিদেশ চলে যাওয়ার মতো কঠিন!!

হোটেলের সামনে নামিয়ে দিয়ে বাস চলে গেল। ট্যুর অপারেটর বললেন, বিকেলটা নিজেদের মতো করে কাটান। শপিংটপিং করলে করে নিতে পারেন। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় ডিনারে যাবো। সবাই হোটেলের লবিতে অবস্থান করবেন। সাড়ে ৬টায় ডিনার! জ্বী, দুনিয়ার প্রায় সব জায়গাতেই সাতটা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে ডিনার শেষ হয়। আমরাই মাঝরাতে খেতে বসি।

রুমে গিয়ে দারুণ করে শাওয়ার নিলাম। শরীরটি বেশ ঝরঝরে লাগছিল। বিছানায় গা এলিয়ে ফেসবুকিং করছিলাম। কখন যে ঘুমের রাজ্যে চলে গিয়েছিলাম টের পাইনি। কি কি সব স্বপ্ন টপ্নও দেখছিলাম। বিজয় দা’র ডাকে ঘুম ভেঙে গেলো। বললেন, অনেক ঘুমিয়েছেন, উঠে পড়ুন। চলেন, ঘুরতে যাবো। ধড়পড় করে বসে পড়লাম। কিন্তু কখন ঘুমালাম, কখন জাগলাম তা ঠাহর করতে কিছুটা সময় লাগছিলো। ঘুরতেবা যাবো কোথায়, এক প্রশান্ত মহাসাগর আর কত দেখবো!

বিজয় দা ফোন করলেন ফজলে করিম ভাইকে। নিচে নামতে বললেন। ফোনে জানালেন যে, কড়া করে কফি খাবো, তারপর ঘুরতে যাবো। ডিনারে যাবো না। আমরা পরে আমাদের মতো করে খেয়ে নেবো।

বিকেলের নরোম রোদ গায়ে মেঘে আমরা ফুটপাত ধরে হাঁটছিলাম। গন্তব্য সামনের ক্যাফে। আমাদের হোটেলের ধারে কাছে প্রচুর ক্যাফে, রয়েছে ভবঘুরেও। সংখ্যায় কম হলেও কয়েকজন হোমলেস মানুষ ফুটপাতের পাশে শুয়ে বসে রয়েছে। এমন উন্নত দেশেও এদের এই অবস্থা কেনো বুঝতে পারছিলাম না। সবগুলোই নেশাখোর। এদেরকে সরকার এবং বিভিন্ন মানবিক সংগঠন ভালো জায়গায় নিয়ে রাখতে চায়, খাওয়াতে চায়, চিকিৎসা করাতে চায়, কিন্তু তারা সেখানে থাকে না। ধরে নিয়ে গেলেও ফাঁকফোকর বের করে পালিয়ে আসে। তারা টাকা পয়সাও পায়, তা দিয়ে পেট এবং মনভরে মদ,গাঁজা, হেরোইনসহ নানা জিনিস খেয়ে ‘রাজাবাদশাহ’ বনে যায়, ফুটপাতে শুয়ে থাকে। মাঝেমধ্যে পথচারীদের মেজাজও দেখায়। আবার কখনো কখনো দোকানে ঢুকে জিনিসপত্র টান মেরে দৌঁড় দেয়, চুরি করে। একটি সেভেন ইলেভেন দোকান থেকে আমি কিছু কেনাকাটা করছিলাম। দেখলাম, ক্যাশে বসে থাকা মেয়েটি একজনের পকেট হাতড়ে অনেকগুলো চকলেট বের করছেন। লোকটি ভবঘুরে, দোকানে ঢুকে চকলেটগুলো পকেটে ঢুকিয়ে নিয়েছিলো। একটু পরে দেখি ফুটপাতে শুয়ে থাকা এক ‘বাদশাহ’ আমার দিকে সাহায্যের আশায় হাত বাড়ালো।

ডালিয়া ভাবী রুমেই রয়েছেন, আমরা তিনবন্ধু ঘুরতে বেরিয়েছি। ক্যাফে পেতে বেগ পেতে হলো না। আমরা তিনটি কফি নিয়ে আয়েশি চুমুক দিলাম। ঘুমভাঙ্গা বিকেলে কফির স্বাদ ও গন্ধ মগজে গিয়ে দোল খাচিছলো।

ক্যাফের সামনে দিয়ে দলে দলে পর্যটক যাচ্ছেন সার্ফার্স প্যারাডাইজের দিকে, কাছেই। আমরাও সাগরমুখো হাঁটতে লাগলাম। শহরের সবচেয়ে ব্যস্ত পর্যটন স্পট সার্ফার্স প্যারাডাইজ। শত শত নারী পুরুষ সাগরপাড়ে। ইতোপূর্বে কয়েক দফায় সাগরের পাড়ে এসে ঘুরেছি, বিচে হেঁটেছি। প্রশান্ত মহাসাগরের পানিতে পা ভিজিয়েছি। এখন আর বালি মাড়াতে ইচ্ছে করছিলো না। আমরা সাগরপাড়ের মেরিন ড্রাইভের পাশে একটি টুলে বসে পড়লাম। সার্ফার্স প্যারাডাইজে সূর্যাস্ত দেখা যায় না, সূর্যোদয় দেখতে হয়। পূর্বমুখী বিচ। ভোরের সূর্যোদয় দেখার জন্য হাজারো মানুষ ভিড় করেন, আমরাও করেছিলাম। মনভরে সূর্যোদয় দেখেছি। এখন পড়ন্ত বিকেলে বিচ এবং সাগর পুরোটাই নরোম আলোতে ছেয়ে আছে। সাগরের নীল জলরাশি হাতছানি দিচ্ছে। অসংখ্য সার্ফার্স সাগরের উপর ঢেউয়ের তালে তালে দোল খাচ্ছেন। কী যে মুগ্ধতা চারদিকে!

আমাদের তিনজনেরই মোবাইলেই টেক্সট আসার শব্দ হলো। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ট্যুর অপারেটর ম্যাসেজ দিয়েছেন যে, দশ মিনিট পর হোটেলের সামনে থেকে ডিনারে যাবেন। সবাই যেনো হোটেলের লবিতে চলে আসি।

বিজয় দা ডিনারে যেতে রাজি নন। বললেন, এসব আর খেতে ইচ্ছে করছে না। কোথাও সাদা ভাত, ডাল এবং সবজি জাতীয় কিছু পেলে ভালো হতো। আমি খাবার খুঁজতে যাওয়ার বিড়ম্বনার কথা উল্লেখ করে বললাম, সবাই দলবেঁধে গিয়ে খেয়ে আসলে ভালো হবে। কোথায় আবার সবজিওয়ালা হোটেল খুঁজবো? ফজলে করিম ভাইও আমার সাথে একমত হলেন। আমরা টাকা পয়সা দেশেই দিয়ে দিয়েছি। ট্যুর অপারেটরও খাবারের অর্ডার দিয়ে দিয়েছেন। শুধু শুধু খাবারগুলো নষ্ট করে লাভ কি!

আমরা সার্ফার্স প্যারাডাইজ থেকে হেঁটে হোটেলের লবিতে চলে আসলাম। ডালিয়া ভাবীকেও ফোন করে নামতে বলা হলো। একটু পরই বাস এসে হাজির হলো। আমরা চড়ে বসার সাথে সাথে বাসটি যাত্রা শুরু করলো। গন্তব্য কোন একটি ভারতীয় কিংবা পাকিস্তানি রেস্তোরাঁ! একটি বাংলাদেশী রেস্তোরাঁ খুঁজে পেলে অবশ্যই আমার মন ভালো হয়ে যেতো! (চলবে)

লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধতারুণ্যের জয়যাত্রা : স্কুল ক্রীড়া উৎসব
পরবর্তী নিবন্ধ‘বোর্ড অফ পিস’ ও বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ : ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য সম্ভাব্য হুমকি