দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর | বুধবার , ২১ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্টের সী ওয়ার্ল্ডের পিলে চমকে দেয়া ভয়ংকর রাইড থেকে নামার পর ধাতস্ত হতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগলো। কী ভয়ংকর রাইড রে বাবা! এভাবেও রাইড করা যায়! হুডখোলা ট্রেন এভাবে গতি তোলে, এত্তো গতি! তাও আবার উল্টেপাল্টে। ধাতস্ত হওয়ার পর এই রাইডে কখনো কেউ হার্ট এ্যাটাকে কিংবা কোন দুর্ঘটনায় মারা গেছে কিনা খবর নিলাম। কিন্তু খবর নিতে গিয়ে যা জানলাম, তাতে রোলার কোস্টার থেকে নিরাপদে নেমেও আমি আবারো ঘামতে শুরু করলাম। কাঠের তৈরি এই রোলার কোস্টার বানাতে নাকি সময় লেগেছে ৩৫ বছর। এটি চালু হয়েছে বছর দুয়েক আগে ২০২২ সালের ২ ডিসেম্বর। তখন থেকে এটি প্রতিদিনই হাজার হাজার পর্যটককে ‘আটার খামি’র মতো দুমড়ে মুচড়ে দৌঁড়লেও কোনদিন কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি। কেউ হার্ট এ্যাটাকেও মারা যায়নি। তবে রোলার কোস্টারে প্রচুর কান্নাকাটি হয়, যেটি আমি নিজেও শুনেছি, নাকি করেছি!

সী ওয়ার্ল্ডে আরো নানা রাইড আছে, বহুধরনের। কিন্তু আর কোনটিতে চড়তে আমার সাহস হচ্ছিলো না। অবশ্য রাইডে চড়ার মতো শারীরিক এবং মানসিক অবস্থাও অবশিষ্ট আছে বলে মনে হচ্ছিলো না। আমরা দলবেঁধে কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরলাম। খেয়াল করলাম যে, আমি লায়ন ফজলে করিম ভাইকে ধরে ধরে হাঁটছি। অর্থাৎ স্বাভাবিকভাবে হাঁটার শক্তিও রোলার কোস্টার খেয়ে ফেলেছে। আমার কাহিল অবস্থা দেকে করিম ভাই বা বিজয় দা ভুলেও কোন রাইডের গা ঘেঁষলেন না।

কিছুপথ এগুতে লেখা দেখলাম হেলিকপ্টার রাইড। চটকদার কথামালায় বিলবোর্ড তৈরি করা হয়েছে। একদল সুন্দরী তরুণী হেলিকপ্টারে গোল্ড কোস্ট দেখে চরমভাবে উচ্ছ্বসিতএমন একটি ছবি ফলাও করে তৈরি করা হয়েছে একটি বিজ্ঞাপন। ঢাউশ সাইজের বিলবোর্ডে সেটি প্রদর্শিত হচ্ছে। বিজ্ঞাপনটি সবার কাছে এই ম্যাসেজ দিচ্ছে যে, হেলিকপ্টারে চড়লে তোমাকেও ঠিক এমনটি দেখাবে! তো আর যায় কোথা? রাইডের টিকেট কাউন্টারের সামনে প্রচুর পর্যটক, নারীপুরুষ। সকলেই উচ্ছ্বসিত, উত্তেজিত। অসংখ্য ক্যামেরা ক্লিক করছে, হেলিকপ্টার রাইডের বিজ্ঞাপনের সাথেও পর্যটকেরা ছবি তুলছে। যদি একটু সুন্দর দেখায়, যদি বিলবোর্ডের উর্বশীদের মতো লাগে!!

জীবনে বহুবার হেলিকপ্টারে চড়েছি। কতবার যে চড়েছি তার সঠিক কোন হিসেবও আমার মনে নেই। আমার অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে বাজে জার্নির নাম হচ্ছে হেলিকপ্টারে চড়া। তবে আধুনিক বিশ্বের অত্যাধুনিক হেলিকপ্টারে আমার চড়া হয়নি। এগুলোতে চড়তে কেমন লাগে তাও জানি না। আমি যেগুলোতে চড়েছি সেগুলোতে প্রচন্ড শব্দ কান ঝালাপালা করে দেয়। আমার সেই অভিজ্ঞতা সবদিক দিয়েই ভয়াবহ। সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে বহুবার পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়েছি, মায়ানমার সীমান্তেও গিয়েছিলাম এক দুইবার। পপি ক্ষেত ধ্বংস করা, সীমান্তবর্তী উপজাতিদের চিকিৎসাসেবা দেয়াসহ নানাকাজে সেনাবাহিনীর যে মিশন তাতে কয়েকজন সাংবাদিককেও নিয়ে যাওয়া হতো। চট্টগ্রামের আরো কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে আমারও বেশ কয়েকবার যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। তাই নতুন করে হেলিকপ্টারে চড়ার কোন খায়েশ আমার হলো না। তাছাড়া টিকেটের দাম শুনেও আমি কিছুটা পিছিয়ে গেলাম।

আমাদের সফরসঙ্গী লায়ন আবু বক্কর সিদ্দিকী প্রিয়তমা স্ত্রীকে নিয়ে হেলিকপ্টারে চড়ার গোঁ ধরলেন। তিনি বললেন, এটা না দেখে যাবেন না। আকাশ থেকে গোল্ড কোস্ট দেখতে হবে। নিশ্চয় ভালো লাগবে। আমি আমতা আমতা করতে লাগলাম। আকাশ থেকে গোল্ড কোস্ট দেখার কথা শুনে ঢোক গিললাম। আসলেই তো, এতো সুন্দর জায়গা। আকাশ থেকে নিশ্চয় আরো সুন্দর লাগবে। কি করবো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। পরে অনেকটা থেমে থেমে টিকেট কাউন্টারের সামনের লাইনে কয়েকজনের পেছনে দাঁড়িয়ে গেলাম। নিজেকে এই বলে স্বান্তনা দিলাম যে, ছবির চেয়ে সুন্দর দেশ অস্ট্রেলিয়ার পর্যটন নগরী গোল্ড কোস্টকে পাখিরা কিভাবে দেখে তা না দেখে দেশটি ছেড়ে যাওয়া ঠিক হবে না। গোল্ড কোস্টকে উপর থেকে দেখার জন্য শহরের ভিতরেই সুউচ্চ একটি অবজারভেশন টাওয়ার আছে। ৭০ তলার বেশি উচ্চতার একটি বিল্ডিং থেকে পুরো গোল্ড কোস্ট দেখা যায়। টিকেট কেটে ওই টাওয়ারের উপরে যেতে হয়। ৭০ তলা মানে ৭০০ ফুট। হেলিকপ্টার নিশ্চয় আরো অনেক উপর থেকে দেখাবে। উপর থেকে গোল্ড কোস্টও দেখবো, হেলিকপ্টারেও চড়বো। রথ দেখা এবং কলা বেচার মতো না হলেও এক টিকেটে দুই ছবির মতো একটি ব্যাপার নিশ্চয় হয়ে যাবে। আমি টিকেট করে ফেললাম।

টিকেট করার সময় শরীরের ওজন জিজ্ঞেস করলেন তরুণী। শরীরের কেজি হিসেবে টিকেটের দর নির্ধারণ করবে নাকি! নিজের ওজন কিছুটা কমিয়ে বললাম। তরুণী টিকেটের ওপর সেই ওজনটি লিখে আমাকে টিকেট দিলো। কিন্তু গোলমালে পড়ে গেলাম হেলিপ্যাডে যাওয়ার গেটে। সেখানে ওজন মাপা হচ্ছিলো। আমার ওজন মেপে টিকেটের ওপর কারেকশন করে লিখে দিলো। কিন্তু বাড়তি কোন টাকা নিলো না।

ছোট্ট হেলিকপ্টার, পাইলট ছাড়া ৭ জন যাত্রী বসতে পারে। ১৫১৬ মিনিটের ট্রিপ, পুরো গোল্ড কোস্ট চক্কর দিয়ে দেখায়। টিকেটের দাম ১০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার, বাংলাদেশী মুদ্রায় আট হাজার টাকার বেশি।

বক্কর ভাই প্রিয়তমা স্ত্রীকে বাদ নিয়ে নিজেই লাফ দিয়ে বসে গেলেন পাইলটের পাশে। পেছনের দুই সারিতে আমরা তিনজন করে মোট ৬জন বসলাম। লায়ন ফজলে করিম চৌধুরী এবং বিজয় শেখর দাশসহ আমরা তিনজন মাঝের সিটে, বক্কর ভাইয়ের স্ত্রী ও ফজলে করিম ভাইয়ের স্ত্রী অপর একজন নারী পর্যটককে নিয়ে পেছনের সিটে বসলেন। আমাদেরকে শক্ত করে বেল্ট দিয়ে বাঁধা হলো। আবার বেল্ট ক্যান? হেলিকপ্টারও কী হুডখোলা রোলার কোস্টারের মতো ভেল্কি মারবে!

আমাদের হেলিকপ্টারের ইঞ্জিনের শব্দ বাড়তে লাগলো। ওড়ার প্রস্তুতি নিলেন পাইলট। তিনি গাইডের মতো করে আকাশ থেকে গোল্ড কোস্টের সৌন্দর্যের বর্ণনা দিতে লাগলেন। আমাদের প্রত্যেকের কানে হেডফোন লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। এতে কপ্টারের আওয়াজের অত্যাচার যেমন কমবে, তেমনি পাইলটের সব কথাও ভালোভাবে শুনতে পাবো।

আমাদের সবাইকে ঠিকঠাকভাবে বাঁধার পর পাইলট কথা বলতে শুরু করলেন, ‘জাহাজে আপনাদের স্বাগতম, প্রস্তুতি নিন গোল্ড কোস্ট দেখার জন্য, যা আগে কখনো দেখেননি।’ তিনি যা বললেন তার সোজা বাংলা করলে দাঁড়ায়, সাগরের নীল আর শহরের ঝিলমিল আলোএই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে রঙিন শহরগুলোর একটি গোল্ড কোস্ট। শহরটিকে যদি সত্যিকার অর্থে আবিষ্কার করতে চান, তাহলে স্থল নয়, আকাশই হতে হবে আপনার পথ। আর সেই পথের নাম হেলিকপ্টার রাইড।

পাইলট কথা বলতে বলতে ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছিলেন। কয়েকশ’ ফুট উঠার পরই হালকা একটি দোল দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। তারপরই ছুটতে লাগলেন, বিপুল গতিতে। খুব বেশি উচ্চতায় নয়, তবে গতি বেশ। দুইশ’ কিলোমিটারের বেশি হবে বলে মনে হচ্ছিলো।

উপরে উঠতেই আমার চোখ চানাবড়া, কী রূপ, কী অপরূপ! প্রশান্ত মহাসাগর যেনো কোন রাজবাড়ীর নীল কার্পেট। ঢেউগুলো সাদা তুলোর মতো ভেঙে পড়ছে সৈকতের বুকে। সার্ফার্স প্যারাডাইসের দীর্ঘ বালুকাবেলা, সেখানে ঘুরে বেড়ানো মানুষ আর সমুদ্রের গায়ে ভাসমান সার্ফারদের অন্যরকম লাগছিলো। মনে হচ্ছিলো কোন এক অপার্থিব ছবি দেখছি।

হেলিকপ্টার আবারো ঘুরে যায়, মনে হয় দক্ষিণ দিকে। নিচে দেখা যায় সবুজে মোড়া পাহাড়ের সারি। বিস্তৃত সী বিচ, শহরের কংক্রিট আর সবুজে সবুজে একাকার হয়ে উঠা পাহাড় একইসাথে কেবল পাখিরাই দেখতে পায়, যা এখন আমাদের চোখের সামনে।

গোল্ড কোস্টের আকাশচুম্বী ভবনগুলো সব অন্যরকম লাগছিলো। মনে হচ্ছিলো কোন আর্কিটেক্ট কোন একটি শহরের মডেল তৈরি করে রেখেছেন। শহরের রাস্তাগুলোকে অনেকটা সরু লাগছিলো। সোনালি সূর্যের আলোয় সেগুলো চকচক করছে। নদী আর খালগুলো শহরের ভেতর দিয়ে সাপের মতো বয়ে গেছে। যাদের পুরো শরীর যেনো নীল রঙে ছেয়ে আছে।

প্রশান্ত মহাসাগরের পাড়েও মনে হলো বেশ বড়সড় একটি বন রয়েছে। প্রচুর গাছ বনটিতে, ঘনসবুজ। বিমান থেকে চারদিকে পানির মাঝে রূপসীর কপালের টিপের মতো বনটি সবুজের মায়া ছড়াচ্ছিলো।

হেলিকপ্টার ছুটছিল। আমরা ব্যস্ত প্রকৃতি দর্শনে, সাথে মোবাইলে ছবি তোলা চলছিল অনবরত। আমাদের হেলিকপ্টার মনে হয় একটু উপরে উঠলো। আমাদের নিচ দিয়ে মেঘের ভেলা ভেসে যাচ্ছিলো। নানা আকৃতির মেঘ, হাতি ঘোড়া, বিয়ের পালকিআরো কত ডিজাইন যে মেঘের রাজ্যে ঘোরাঘুরি করছিলো। সূর্য মনে হয় আরো একটু কাছে চলে আসলো। মেঘ ছুঁয়ে ছুঁয়ে রোদের রঙ অনেকটা সোনালি। কী যে সুন্দর রোদ। শুধু জ্যোৎন্সাই নয়, আকাশে সুযোগ পেলে রোদও বুঝি খেলা করে! মনে হচ্ছিলো, আমাদের হেলিকপ্টার পথ ভুলে কোন রূপকথার রাজ্যে ঢুকে পড়েছে। নিচে শহর, মাঝখানে মেঘ, আর ওপরে নীল আকাশএকই দৃষ্টিতে তিন স্তরের পৃথিবী দেখা ভাগ্যের ব্যাপার মনে হচ্ছিলো। (চলবে)

লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধতোমাকেই খুঁজি বাবা
পরবর্তী নিবন্ধশারীরিক নিষ্ক্রিয়তাও একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা: গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন