(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
অস্ট্রেলিয়ার গোল্ডকোস্টের নানা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করে সময় পার করছিলাম। ন্যাশনাল পার্ক বা দুই কোটি বছরের পুরানো বনের ভিতরে ঘুরে ফিরে আমরা ফিরে আসলাম শহরে। সারাদিন চলে গেলো গোল্ডকোস্টের উপকুল এবং বন–বনানী দেখতে দেখতে। প্রচুর ঘোরাঘুরি এবং হাঁটাহাঁটি করলেও শরীর মনে খুব বেশি প্রভাব পড়েছে বলে মনে হলো না। নিজেকে বেশ চাঙ্গাই লাগছিলো, ফুরফুরে ছিলো মন। পৃথিবীর নানা প্রান্তের নতুন নতুন জায়গা দেখার যে নেশা তা আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায় অন্য অনেক কিছুর সাথে তার তুলনা চলে না। ঘুরতে এবং দেখতে কী যে ভালো লাগে!
রাতে আমাদের ডিনারে নেয়া হলো একটি পাকিস্তানি রেস্তোরাঁয়। কয়েক পদের কাবাব, বিরানি, নান, সালাদসহ রকমারি আয়োজনে ডিনার সারলাম আমরা। যে যার মতো করে বিরানি বা নান নিলেন, কেউ কেউ বিরানি এবং নান দুটোই নিলেন। চিকেন এবং বিফ কাবাবও যে যার রুচি অনুযায়ী খেলেন। ট্যুর অপারেটরই রেস্তোরাঁটি পছন্দ করেছেন। খাওয়া–দাওয়ার পর মনে হলো, ভদ্রলোক মুনাফার চেয়ে আমাদেরকে শান্তিতে খাওয়ানোর চেষ্টাই বেশি করেছেন।
খাওয়া–দাওয়ার পর রাতের গোল্ডকোস্ট দেখতে দেখতে হোটেলে ফিরছিলাম। রাস্তায় কোন পথচারী নেই, লোকজনও নেই। দোকানের সামনে আড্ডা, ফুটপাত জুড়ে স্ট্রিটফুডের পসরা সাজিয়ে বিকিকিনি কিংবা রিক্সা টেক্সির জটলার কিছুই চোখে পড়লো না। আলোকোজ্জ্বল প্রশস্ত সড়ক, সবকিছুই সাজানো গোছানো। গাড়িগুলো যে যার লেইন ধরে ছুটছে। একটি বিষয় আমাকে অবাক করলো যে, কেউ পারতপক্ষে লেইন ক্রস করেনা। একইমুখী গাড়িগুলো যে যার লেইনে চলছে। খালি থাকলেও অন্য লেইনে গুতো দিচ্ছে না। ট্রাফিক সিগন্যালগুলোকে কোথাও পুলিশ দেখলাম না, কিন্তু একটি গাড়িও সিগন্যাল অমান্য করছে না। অবশ্য, আমরা এবং ভারতের কয়েকটি প্রদেশ ছাড়া দুনিয়ার কোনদেশেই আমি ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে দেখিনি, লেইন নিয়েও সজাগ থাকে সকলে।
আমরা ভালোয় ভালোয় হোটেলে ফিরে আসলাম। রাতের আর কোন প্রোগ্রাম নেই। অবশ্য, কেউ চাইলে নিজেদের মতো করে সিনেমা কিংবা ডিসকোতে যেতে পারেন। আমাদের হোটেলেও ডিসকো রয়েছে। হোটেলের কাছেও একাধিক বার ও ডিসকো আলো ছড়াচ্ছিলো।
আমি এবং লায়ন বিজয় শেখর দাশ রুমেই ফিরে এলাম। লায়ন ফজলে করিম ভাই ভাবীকে নিয়ে একটি মলে ঢুকলেন। কি কি সব কেনাকাটা করবেন বলে জানালেন। কেনাকাটায় কোন আগ্রহ না থাকায় রুমে ফিরে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়াকে বেহেতের মনে করলাম।
কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম মনে নেই। বেশ সকালে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। ঘড়ি দেখে এপাশ–ওপাশ করে আরো কিছুক্ষণ ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। লাভ হলো না। সন্ধ্যা রাতে ঘুমিয়ে যাওয়ার যাতনা টের পাচ্ছিলাম। উঠে জানালার পর্দা সরিয়ে দিলাম। চোখের সামনে খেলা করে উঠলো সমুদ্র, মহাসাগর। সার্ফার্স প্যারাডাইজের বিস্তৃত বিচসহ পুরো সাগরটি কী যে অপূর্ব হয়ে রয়েছে। এই বিচে এতো বেশি ঘুরেছি যে এখন আর যেতে ইচ্ছে করলো না। আমি বিভোর হয়ে মহাসাগরের বিশালত্ব দেখতে লাগলাম। সময় ফুরোচ্ছিলো না। বিছানায় আবারো কিছুক্ষণ গড়াগড়ি দেয়ার চেষ্টা করলাম। হোয়াটসঅ্যাপ এবং ফেসবুকিং করেও কিছুক্ষণ সময় কাটালাম। বিজয় দা জেগে উঠলেন। ফ্রেশ হওয়ার পর ফজলে করিম ভাইকে নাস্তা করতে রেষ্টুরেন্টে যাওয়ার তাগাদা দিয়ে আমরা বের হলাম। অল্পক্ষণের মধ্যে ফজলে করিম ভাইও ভাবীকে নিয়ে হাজির হলেন। ছয়জনের একটি টেবিল দখল করে আমরা ব্যুফে নাস্তা করতে শুরু করলাম। কোন তাড়া নেই, আমাদেরকে আজ কোথায় যেনো নিয়ে যাবে। তবে দশটার দিকে গাড়ি আসবে বলে ইতোমধ্যে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে জানানো হয়েছে। তাই তাড়াহুড়ো না করে রয়ে সয়ে রাজকীয় নাস্তা উপভোগ করতে লাগলাম।
ঠিক দশটায় আমাদের নেয়ার জন্য বাস এসে হাজির হয়েছে। হোটেলের সামনে বেশিক্ষণ বাস দাঁড়াতে পারবে না। তাই আমরা যথারীতি দ্রুতই বাসে চড়ে বসলাম। বাস চলতে শুরু করলো। ট্যুর অপারেটর জানালেন যে, আমাদেরকে গোল্ডকোস্টের অন্যতম সেরা পর্যটন স্পট সী ওয়ার্ল্ড দেখাতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ায় এসেছি পর্যন্ত সাগর বিচ এসব নিয়েই আছি। আলাদা করে সী ওয়ার্ল্ড দেখার আর কি আছে বুঝতে পারলাম না।
অল্পক্ষণের মধ্যে আমরা সী ওয়ার্ল্ডে পৌঁছে গেলাম। সার্ফার্স প্যারাডাইস পেছনে ফেলে মেরিন ড্রাইভের রাস্তা ধরেই সী ওয়ার্ল্ডে পৌঁছে গেলাম। অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্টের সী ওয়ার্ল্ড দেখে শুরুতে টাসকি খেলাম। কী আয়োজনরে বাবা!
বাস থেকে নামতেই কানে এলো শিশুদের উচ্ছ্বাস, ভেসে আসছে সিগালের ডাক। প্রবেশদ্বারের বিশাল নীল ফটকে ইংরেজিতে লিখা– সী ওয়ার্ল্ড অস্ট্রেলিয়া।
গেটে দর্শনার্থীদের লাইন, টিকেট কাউন্টারেও। আমাদের টিকেট অনলাইনে করা ছিল। সুতরাং আমাদেরকে লাইনে দাঁড়াতে হলো না। গ্রুপ চেকইনের মতো একজন গাইড এগিয়ে এসে আমাদেরকে ভিতরে নিয়ে গেলো।
ভেতরে ঢুকেই প্রথম যেটা দেখলাম, বিশাল একটি পুল। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো ডলফিন শো। ট্রেনারদের হাতের ইশারায় ডলফিনগুলো লাফিয়ে উঠছে, পানির ফোয়ারা তুলে আকাশ ছুঁয়ে ফেলছে। ডলফিন ট্রেনারদের কথা শুনছিল। এটা আমাকে মুগ্ধ করলেও আশ্চর্য হলাম না। কারণ আগেও ডলফিনের এমন মনভোলানো আয়োজন আমি দেখেছি। থাইল্যান্ড সিংগাপুরসহ দুনিয়ার বহু দেশই ডলফিনকে বোকা বানিয়ে হরদম ডলার কামাচ্ছে।
একটু সামনে এগুলাম। এরপর ঢুকলাম পেঙ্গুইন এনকাউন্টারে। কৃত্রিম বরফে ঢাকা যেনো শীতল এক পৃথিবী। বাইরে গ্রীষ্ম, অথচ এখানে হিমশীতল অ্যান্টার্কটিকা। পেঙ্গুইনগুলো টুকটুক করে হাঁটছে, কেউ সাঁতার কাটছে স্বচ্ছ পানিতে। এমন দৃশ্যও আমি আগে দেখেছি। সুতরাং খুব বেশি বিস্মিত হলাম না। তবে একথা ঠিক যে, আমার মনে হচ্ছিলো, যেন কয়েক মিনিটের জন্য পৃথিবীর শেষ প্রান্তে চলে এসেছি।
সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ছিল শার্ক বে। কাচের দেয়ালের ওপারে বিশাল হাঙরগুলো ধীরে ধীরে সাঁতার কাটছে। এক একটি হাঙর যে কত বড় তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। থাইল্যান্ড এবং সিংগাপুরেও দেখেছি। আরো কোথায় যেনো দেখেছিলাম ঠিক মনে করতে পারছিলাম না। তবে ওগুলো মনে হয় এতো বড় ছিল না। গোল্ড কোস্ট সী ওয়ার্ল্ডের হাঙরগুলো আকৃতিতে বিশাল। বিশাল মানে আসলেই বিশাল। সমুদ্রের রাজাখ্যাত হাঙরগুলোর হা করা মুখ এবং চোখে চোখ পড়তেই বুকের ভেতর কেঁপে কেঁপে উঠছিল। বন্দীশালায় জিম্মি হয়ে থাকা হাঙরগুলো এমন ভয়ংকরভাবে তাকাচ্ছে, না জানি মহাসাগরে তাদের চাহনী কেমন ভয়াল হয়ে উঠে!
সী ওয়ার্ল্ড সমুদ্রের প্রাণীদের ভুবন। কিন্তু গোল্ড কোস্ট সী ওয়ার্ল্ডে নানা ধরণের রাইডও রাখা হয়েছে। স্ট্রোম কোস্টার এভি জেট রেসকিউ রাইড নামের একটি রাইড দেখলাম। আমাদের রোলার কোস্টারের মতো। অনেকেই চড়ছে, চিৎকার করছে। কী যে ভয়ংকর চিৎকার। বিজয় দা বললেন, ওনি চড়বেন না। লায়ন ফজলে করিম ভাইও না করে দিলেন। কিন্তু আমি বললাম, চেকে দেখবো।
একটি টানেলের ভিতর দিয়ে আমাদেরকে রোলার কোস্টারের স্টার্টিং পয়েন্টে নিয়ে যাওয়া হলো। একটি ট্রেনের মতো। ছাদ এবং পাশ খোলা উন্মুক্ত ট্রেনটি মনে হয় দুমড়ে মুচড়ে যেতে যেতে রক্ষা পায়। টুকটাক স্টিল এবং পুরোটা কাঠ দিয়ে তৈরি করা রেললাইন জিলাপির প্যাঁচের চেয়েও জটিল। শুরুতে বাংলাদেশের ট্রেনের মতো চললেও হুট করে ব্যাটার জোস বেড়ে যায়। হয়ে উঠে চীনা কিংবা জাপানি। মনে হয় দুইশ’ কিলোমিটারের বেশি স্পিডে ছুটে ট্রেন। তখন আর পরাণ বুকে থাকে না।
কলজে মুছড়ে মুছড়ে উঠছিলো। যেনো আকাশ থেকে ট্রেনটি হুট করে নিচে পড়ে যায়, তীব্র গতিতে। অনেকক্ষণ ধরে ঝড়ের বেগে ছুটে খোলা এই ট্রেন। মাথার চুল মনে হয় মহাসাগর ছুঁয়ে আসা নুনতা বাতাসে উড়ে যাচ্ছিলো। আজ মহাসাগরের কুলে বুঝি হয়ে যাবে মহাযাত্রা। আমি হাত পা ছেড়ে দিয়ে অতি কাতরস্বরে মা’কে ডাকছিলাম। আর প্রার্থনা করছিলাম ভয়ংকর এই যাত্রা যাতে থেমে যায়। কিন্তু কে শুনে কার কথা। চারপাশ থেকে তীব্র ভয়ার্ত চিৎকার ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছিলো না। ট্রেনটি কতক্ষণ ডান কাতে শুয়ে কতক্ষণ বাম কাতে হেলে ভয়ংকর গতি তুলছিলো।
অনেকটা বিধ্বস্ত হয়ে নামার পর মনে হলো, ‘ভয়ংকর সুন্দর’ কথাটি জীবনে নানা সময় নানা জায়গায় নানাকিছুর উপমা দিতে লিখলেও এরচেয়ে ‘ভয়ংকর’ কোন সৌন্দর্যের মুখোমুখি কখনো হয়েছি বলে মনে হলো না। এর থেকে ভয়ংকর আর কিছু কোথাও ছিল না। যেখানে মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে হাত নাড়িয়ে চলে এলাম বলে আমার মনে হচ্ছিলো। (চলবে)
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।












