দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর | বুধবার , ৭ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৫:০০ পূর্বাহ্ণ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

প্রশান্ত মহাসাগরের পাড়ে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় দেখছি। দেখছি সূর্যের একটু একটু করে বিকশিত হওয়া। সাগরের বুক চিরে সূর্যের উদয় হওয়ার এই দৃশ্য যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি আমার ভিতরেও ছড়াছড়ি চলছে রোমাঞ্চের। অবশ্য, কয়েকবছর আগে জাপানেও আমি এই মহাসাগরের বুক আলোকিত করে সূর্যের উদয় হওয়া দেখেছিলাম। সূর্যোদয়ের দেশ জাপানে সূর্যের আগমনি গান শোনার রোমাঞ্চ আমাকে বেশ আলোড়িত করেছিল, তবে অস্ট্রেলিয়ার গোল্ডকোস্টেও সেই আলোড়নে খুব একটা ভাটা টের পেলাম না। প্রকৃতি আসলেই সর্বত্রই একই, শুধু একটু সাজিয়ে রাখতে পারলেই রোমাঞ্চ ছড়াবেই! সেটি হোক জাপান, অস্ট্রেলিয়া কিংবা অন্য কোন দেশে। কী যে ভালো লাগছিল!

সূর্যের আলোয় গোল্ডকোস্টের বিস্তৃত বিচের বালুগুলো ঝকমক করছে। যেনো সোনামাখা কোন উপকূলে দাঁড়িয়ে আছি! স্বস্ত্রীক লায়ন ফজলে করিম এবং লায়ন বিজয় শেখর দাশসহ দাঁড়িয়ে আছি আমরা। আমাদের আশেপাশে বহু বহু পর্যটক, সকলেই সূর্যোদয় দেখছেন। সূর্যোদয় দেখছে শত সহস্ত্র হাঁস, পাখী। বড় বড় হাঁসগুলো কী অবলীলায় না হেলেদুলে ঘুরছিলো আমাদের পায়ে পায়ে! কত ধরনের পাখি যে বিচজুড়ে খেলা করছে, করছে কলকাকলী! ক্ষণে ক্ষণে ওড়ে ওড়ে সাগর দেখে আসছে, কখনো বা সাগরে ডুব দিচ্ছে। কোন কোন পর্যটক পাখীদের খাবার ছিটিয়ে দিচ্ছিলেন। বহুদেশে এভাবে খাবার দেয়া অবৈধ, এখানে বৈধ কিনা জানি না, তবে পর্যটকদের পাখিবিলাস এবং পাখীদের ভোজোৎসব চলছিল সমানতালে। আগেই বলেছি, সার্ফার্স প্যারাডাইস অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় এবং সুন্দর একটি বিচ। হাজার হাজার বিচ রয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের কোলজুড়ে থাকা মহাদেশটিতে। কিন্তু সার্ফার্স প্যারাডাইস কিছুটা যেনো অন্যরকম। চমৎকার বিচটি তকতকে, ঝকঝকে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার নজির অস্ট্রেলিয়ায় ভুরি ভুরি রয়েছে, এই বিচ যেনো কিছুটা বেশি পরিষ্কার। সাগর থেকে উঠে আসা কোন ময়লা আবর্জনা নেই, নেই শামুক ঝিনুক মরে পড়ে থাকার দৃশ্যও। বিচে পানির খালি বোতল, চিফস কিংবা সিগারেটের প্যাকেট পড়ে থাকার দৃশ্য অকল্পনীয়। রাতের বেলা এই বিচে অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরি করেছিলাম, এখন সূর্যোদয় দেখতে এসে মনে হলো, বিচটি আসলেই অন্যরকম। বিচটির নরোম বালির যেখানে ইচ্ছে সেখানেই আপনি বসে কিংবা শুয়ে পড়তে পারেন। অনেকেই শুয়ে বসে আছেন। আমরা দাঁড়িয়ে আছি, সাগর দেখছি, বালু দেখছি, পাখী দেখছি, দেখছি পর্যটক। বুকের একদম গভীরে তীব্র একটি হাহাকার টের পাচ্ছিলাম। আচ্ছা, আমরা এমন কেনো, আমাদের সব থেকেও কিচ্ছু নেই কেনো!!

নাস্তা সারার পর আজ আমাদেরকে একটি বন দেখতে যাওয়ার কথা। প্রাচীন একটি ন্যাশনাল পার্ক। নাস্তা সারতে হবে হোটেলে। অবশ্য, হোটেল খুবই কাছে, জাস্ট সাগরপাড়ের মেরিন ড্রাইভের পাশে। সূর্য আরো কিছু উপরে ওঠার পর আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। তারকাখচিত হোটেলগুলোর সকালের ব্যুফে ব্রেকফাস্ট মানেই আলীশান একটি ব্যাপার। সেটি কোনভাবেই মিস করা যাবে না।

হোটেলেই ফিরে এলাম। রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে চলে গেলাম রেস্টুরেন্টে। হোটেলের রিসিপশনের পাশেই বিশাল রেস্টুরেন্ট, থরে থরে সাজানো দুনিয়ার নানা অঞ্চলের নানা খাবার। যার যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে নিয়ে খাওয়া দাওয়া করা যায়। বাদাম থেকে শুরু করে দুনিয়ার নানা জাতের চেনা অচেনা ফল, মাছমাংস থেকে শুরু করে সব খাবার। এতো এত্তো খাবার থাকে যে, কোনটি রেখে কোনটি খাবো বুঝে উঠা কঠিন। অনেকেই প্রচুর খাবার তুলে নেন, পরে টেবিলে ফেলে দিয়ে চলে যান। এক একটি ফাইভস্টার হোটেলে ব্রেকফাস্টে যে পরিমাণ খাবার নষ্ট হয় তা দিয়ে অনায়াসে কয়েকশ’ লোক শুধু নাস্তাই নয়, দুপুর বা রাতের খাবার সারতে পারেন। কিন্তু টেবিলে পড়ে থাকা এসব খাবার কাউকে দেয়া হয় না, তুলে নিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া হয়! অথচ, একমুঠো খাবারের জন্য দুনিয়াতে কত লোকই না হাহাকার করে, পৃথিবীর লাখ লাখ মানুষ না খেয়েই রাতে ঘুমুতে যায়, যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। আহা, সম্পদের কী নিদারুণ বৈষম্য!

নাস্তাপর্ব শেষে দ্রুত রুমে ফিরে তৈরি হয়ে নিলাম। নির্ধারিত সময়ের আগেই আমরা হোটেলের লবিতে অপেক্ষা করতে লাগলাম। গোল্ডকোস্টের সার্ফার্স প্যারাডাইস থেকে একঘন্টা দূরে গভীর একটি বন দেখতে যাওয়ার প্রোগ্রাম রয়েছে আমাদের। সেখানে যাওয়ার জন্য কমবেশি সকলেই তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছে।

গাড়ি চলতে শুরু করেছে। আমাদের বলা হলো যে, স্প্রিংব্রুক ন্যাশনাল পার্কে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পার্ক বলা হলেও এটি নাকি আসলেই একটি বন। ইতোপূর্বে আমি সানশাইন কোস্টে একটি ন্যাশনাল পার্ক দেখেছি। আমাদের সঙ্গীরা সানশাইন কোস্টের ন্যাশনাল পার্ক না দেখলেও মেলবোর্নের বন দেখেছেন। সুতরাং গোল্ডকোস্টের বনের চরিত্র কেমন হবে তা আমাদের সকলেরই কমবেশি ধারণা আছে।

শহরের কোলাহল থেকে বের হয়ে চলছে আমাদের গাড়ি। চমৎকার রাস্তা ধরে এগিয়ে চলছি আমরা। মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে গিয়ে আমরা পাহাড়ের মুখোমুখি হয়ে গেলাম। যখন আমাদের গাড়ি পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করে, তখন অদূরের সমুদ্রকে নীলাম্বরীতে সজ্জিত মানবীর মতো লাগছিল। পাহাড়জুড়ে লাখো কোটি গাছ, অগুনতি। গাছের পাতায় জমে আছে কুয়াশা, ফাঁকফোকরে চলছে আলো আঁধারীর লুকোচুরি। চারপাশের বন দেখে মনে হলো বহুবছরের প্রাচীন রেইনফরেস্টের দরজায় দাঁড়িয়ে আছি।

গাইড বললেন, এই বনটি প্রায় ২ কোটি বছরের পুরোনো। কি বললো! আবারো কনফার্ম করলাম আমি, দুই কোটি বছর! এটি নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন সাবট্রপিক্যাল রেইনফরেস্টগুলোর একটি।

উঁচু উঁচু অ্যান্টার্কটিক বিচ, লতাপাতায় ঢাকা পথ, আর ছায়ায় ঢাকা ট্রেইল। পার্কজুড়ে লাখো কোটি গাছ, ঘন বন। অথচ বনের ভিতরে তৈরি করা ট্রেইল বা ওয়াকওয়েতে একটি গাছের পাতাও পড়ে নেই। পাখির ডাক, ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ, বন্য প্রাণীর ডাক আর দূরে ঝরনার গর্জন মিলে প্রকৃতি যেনো এখানে নিজস্ব একটি ছন্দ তৈরি করে রেখেছে। পর্যটকেরা মুগ্ধ সেই ছন্দে। হাজার বছর ধরে চলে আসা এক মুগ্ধতার সাক্ষী হয়ে আমরা সামনে হাঁটছিলাম। বনের ভিতরে পথের ধারে পাখি ঘুরছে, হাঁস হাঁটছে, বন্য প্রাণীও দু’চারটি দর্শন দিলো, তাকিয়ে থাকলো অসীম সাহসে। আমি বুঝতে পারছিলাম যে, এখানে কেউ পাখি শিকার করে না, হাঁস ধরে নিয়ে খেয়ে ফেলে না। বণ্যপ্রাণীগুলো এখানকার মানুষকে শত্রু ভাবে না।

ট্রেইল ধরে কিছুপথ এগোনোর পর পানির গর্জনটা বাড়তে থাকে। মনে হচ্ছিলো, কাছাকাছিতে থাকা ঝর্ণাটি তাকে দেখতে যাওয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে। আমার সামনে এগুলাম আর গাছের ফাঁক দিয়ে ধবধবে উজ্জ্বল হয়ে উঠে ঝর্ণা, পোরলিংক ব্রুক ফলস। একটি উঁচু পাহাড় থেকে সাদা রেশমের মতো পানি নিচে পড়ছে, ছুটে চলছে। এখানেও তৈরি হচ্ছে ছন্দ, মুগ্ধতা। পাহাড় কিংবা বনের নীরবতা ভেঙ্গে সেই মুগ্ধতা হৃদয়ের গভীরে ঠাঁই করে নিচ্ছে।

অনেক পর্যটককে দেখলাম, ঝর্ণায় নেমে পানি ছুঁয়ে দেখছে, কেউ কেউ ঝর্ণার পাশে হাঁটছে। আমরা সেদিকে না গিয়ে সামনে এগুলাম। কিছুটা সামনে এগুতেই ভয়ংকর এক সুন্দরের দেখা পেলাম। খোলা চোখে দেখলে মনে হবে কিছুই নয়, কিন্তু একটু খেয়াল করলেই কলজের পানি জমে যাবে। শিরদাঁড়ায় বয়ে যাবে হিমহিম ঠান্ডা! একটি পাথরের ব্রিজ, কিন্তু প্রাকৃতিক। নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে নদী, দুই পাহাড়ের মাঝে একটি পাথর ব্রিজের মতো হয়ে রয়েছে। পর্যটকেরা এই ব্রিজ পার হচ্ছেন, এ পাহাড় ও পাহাড় করছেন। যদি পাথরটি হঠাৎ করে ভেঙ্গে পড়ে! কিন্তু গাইড বললেন যে, এটি হাজার বছর ধরে এভাবেই রয়েছে।

গাইড আমাদেরকে কিছুটা দ্রুত পা চালানোর পরামর্শ দিয়ে বললেন, এখন আমরা এই পার্কের সবচেয়ে সুন্দর স্থানে যাবে। ওটা নাকি ‘বেস্ট অফ অল লুক’। ওখান থেকে নাকি সবকিছু সবচেয়ে সুন্দরভাবে দেখা যায়।

আমরা পৌঁছে গেলাম। সারাজীবন মনে রাখবার মতো একটি দৃশ্য যেনো হঠাৎ করেই হাজির হলো চোখের সামনে। পাহাড়ের উপরে আমরা, নিচে ছড়িয়ে থাকা সবুজ উপত্যকা, নীল প্রশান্ত মহাসাগর। চোখের সামনে পুরো গোল্ড কোস্ট। শত সহস্ত্র ভবন, নানা অবকাঠামো। সাগরের কোল ভরা বিচ, যেনো একটি সোনার মালা। মহাসাগরজুড়ে চলছে নীলাম্বরীর খেলা! (চলবে)

লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকী পেলাম, কী হারালাম!
পরবর্তী নিবন্ধপ্রবাহ