( পূর্ব প্রকাশিতের পর)
ছুটছিল আমাদের গাড়ি। চকচকে গাড়িটি নতুন না হলেও আয়েশ ছিল নতুনের মতোই। অবশ্য এই আয়েশ কী রাস্তার জন্য নাকি গাড়ির জন্য তা নিশ্চিত হওয়া কঠিন। নখের পিঠের মতো রাস্তা, কোথাও কোন খানাখন্দক নেই। কুচকুচে কালো রাস্তার বুক জুড়ে সাদা দাগে নানান ট্রাফিক সিগন্যাল। সাই সাই করে ছুটছে অগুনতি গাড়ি। কিন্তু কেউ রাস্তার সিগন্যাল অমান্য করছে না। এলোমেলো করে চালাচ্ছে না গাড়ি। এমন রাস্তায় গাড়ি চালাতে আরাম, চড়েও। আমি গাড়িতে বসে থাকলেও চোখ ছুটছিল ডানে বামে। কিছুক্ষণ ডানদিকে ছড়ানো মুগ্ধতা দেখছিলাম, কিছুক্ষণ বাম দিকে। সড়কের দুপাশ যে কত সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা যায় তা সাংহাই বিমানবন্দর থেকে শহরে যাওয়ার পথটি না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। সড়কের দুপাশ জুড়ে বাগান, কত রকমারি ফুল যে তাতে ফুটে আছে। আছে আরো নানা কিছু! মন ভরে দেখছিলাম এক অপার সৌন্দর্য। নানা রঙে সাজানো নানান নান্দনিকতা মন ছুঁয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল কোন এক রঙিন দুনিয়ায় ছিটকে পড়েছি। সাংহাই শহরের আকাশ ফুটো করতে চাওয়া ভবনগুলো কেবলই কাছে আসছিল।
বিমানবন্দর থেকে শহরে যাচ্ছি আমরা। সাংহাই শহর ঘুরে দেখার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। তবে দলপতি লায়ন ফজলে করিম বললেন, আগে আমরা লাঞ্চ সারতে হবে। ক্ষুধার তাড়না বেশ অনুভূব করছিলাম। বিমানে কোন কিছু খাওয়া হয়নি আমাদের। অনেকক্ষণ আগে যা খেয়েছিলাম তা এতক্ষন আমাদের সামলে নিয়েছে। বিমানবন্দরজুড়ে মাইলের পর মাইল হাঁটা এবং খোঁজাখুঁজিতে শরীরের উপর দিয়ে যে ধকল গেছে তার ভারতো পুরোটাই সামলাতে হচ্ছে পেটকে। এতে করে বেলা গড়ানোর সাথে সাথে পেটের তাড়াও বেশ অনুভূব করতে শুরু করেছিলাম। তাই ছোটখাটো শরীরের আমাদের দলপতি লায়ন ফজলে করিম বললেন, আগে সিচুয়ান রেস্টুরেন্টে গিয়ে পেট ভরে খাবো, পরে শহরে ঘুরবো। বিষয়টির সাথে আমি পুরোপুরি একমত ছিলাম না। আমিও খাওয়ার পক্ষে, তবে রেস্তোরায় বসে গা হেলান দিয়ে খাওয়ার পক্ষপাতি নয়, ক্ষুধা তাড়ানোর জন্য আমি বার্গার বা স্যান্ডউইচ টাইপের কিছু একটা নিয়ে গাড়িতে বসে খেয়ে ফেলার পক্ষে। সাংহাই বিশাল শহর। এই শহর ঘুরতে অনেক সময় লাগবে। তাই যতটুকু সময় বাঁচানো যায় ততই মঙ্গল। তবে করিম ভাইসহ অন্যান্যরা বললেন, আগে ভালো করে দুপুরের খাবার খাবো, পরে প্রয়োজনে সারারাত ধরে সাংহাইর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবো, বেড়াবো। সর্বাধিক ভোটেরই জয়জয়কার। আমার আর তেমন কিছু বলার থাকলো না। আয়েশ করে খাওয়ার ব্যাপারটিকেই গুরুত্ব দিতে হলো। লায়ন ফজলে করিম আমাদের গাইডকে চীনা ভাষায় কি কি সব বললেন। গাড়ির যেন গতি বাড়লো।
সিদ্ধান্ত হলো যে, আমরা সাংহাইর বিখ্যাত একটি রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খাবো, সিচুয়ান ফুড খাবো। সিচুয়ান ফুডের ব্যাপারে আমার কোন ধারণা নেই। কোনদিন খাইনি। তবে ফজলে করিম জানালেন, সিচুয়ান ফুড চীনের বেশ জনপ্রিয় খাবার। বহুধরনের রেসিপিতে সিচুয়ান ফুড তৈরি করা হয়। মুলতঃ প্রচুর ঝাল এবং মসলা দিয়ে এই খাবার তৈরি করা হয়। সিচুয়ান একটি প্রদেশের নাম। ওই প্রদেশের লোকজন প্রচুর ঝাল খায়। তাদের ওই ঝাল খাওয়া থেকেই জন্ম সিচুয়ান ফুডের। এখন শুধু সিচুয়ানেই নয়, পুরো চীনেই এমনকি বিশ্বের নানা দেশেই সিচুয়ান ফুডের জয়জয়কার। বাংলাদেশ থেকে চীনে বেড়াতে যাওয়া এবং খাবার খেতে না পেরে ত্যক্ত বিরক্ত মানুষগুলোর কাছে সিচুয়ান এবং হিউয়ান ফুড খুবই জনপ্রিয়।
ছুটছিল আমাদের বাহন। সাংহাই শহরের বুক ছিঁড়ে ছুটছে আমাদের গাড়ি। শহর জুড়ে হাজার হাজার আকাশ ছোঁয়া ভবন, ভবনের গা জুড়ে ঢাউশ সাইজের সব ডিসপ্লে। তাতে বিজ্ঞাপন চলছে। ভবনগুলোর গা গতর যেন এক একটি ঢাউশ সাইজের টিভি। প্রচুর মানুষ। হাঁটছেন, দৌঁড়াচ্ছেন, সাইকেল চালাচ্ছেন। কেউবা মোটর সাইকেল এবং স্কুটি নিয়ে ছুটছেন। ছুটছেন গাড়ি নিয়ে। রাস্তার পাশাপাশি অনেকগুলো ফ্লাইওভার চোখে পড়লো। সর্পিল গতিতে যাওয়া ফ্লাইওভারগুলোর উপর দিয়েও চলছে গাড়ির ছোটাছুটি।
উন্নয়নের সোনার হরিণের নাগাল পাওয়া বিশ্বের অন্যতম বড় শহরটির চোখ ধাঁধানো উন্নয়ন মাথা ঘুরে যাচ্ছিল। প্রায় তিন কোটি মানুষের ভারে ভারাক্রান্ত শহরটির চারদিকে কী আকাশ ছোঁয়া উন্নয়ন যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। বেশ সুন্দর একটি নদী সাংহাই শহরকে দুভাগ করে দিয়েছে। যতটুকু জানা গেল, সাংহাই শহরটি পূর্ব-মধ্য চীনের উপকূলে, ছাং চিয়াং (ইয়াংসে) নদীর ব-দ্বীপ অববাহিকাতে অবস্থিত। এটি ছাং চিয়াং নদীর মোহনার দক্ষিণপ্রান্তে এবং হাংচৌ উপসাগরের উত্তরে চমৎকার এক লোকেশনে গড়ে উঠেছে। মুলতঃ ছাং চিয়াং নদীর উপশাখা হুয়াংফু নদীর তীরেই অবস্থিত পৃথিবীর অন্যতম সেরা শহর সাংহাই। হুয়াংফু নদীর দুই তীরে যেভাবে সাংহাই শহর গড়ে উঠেছে তেমন করে কর্ণফুলীর দুই তীরে শহর গড়তে টানেল নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে এরজন্য কত কাল যে অপেক্ষা করতে হবে কে জানে!
শহরের পাশাপাশি বিশ্বের কন্টেনার হ্যান্ডলিং এ শীর্ষস্থান দখল করে রাখা বন্দর হচ্ছে সাংহাই। ভৌগোলিক অবস্থানের কারনে এই বন্দর পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হয়ে উঠেছে। হুয়াংফু নদীর বদৌলতে শুধু সমুদ্রগামীই নয়, মহাসাগর পাড়ি দেয়া বিশালাকৃতির মাদার ভ্যাসেলগুলো অনায়াসে নোঙর করতে পারে সাংহাই বন্দরে।
নানা পথ এবং ফ্লাইওভার মাড়িয়ে গতি কমালো আমাদের বাহন। এতক্ষণ ধরে ঝলকে ঝলকে দেখা নদীটির একেবারে তীরে এসে থামলো আমাদের গাড়ি। চালক দরোজা খুলে আমাদের নামার ইংগিত দিলেন এবং বললেন, তিনি পার্কিং এ যাচ্ছেন। ফোন করলে চলে আসবেন। কথাবার্তা যা হচ্ছিল তার সবই ফজলে করিমের সাথে। দলের আমরা বাকি সদস্যরা সবকিছু শুধু অনুসরণ করে যাচ্ছিলাম।
ফজলে করিম জানালেন, এটিই হুয়াংফু নদী। এই একটি নদীই সাংহাইর ভাগ্য বদলে দিয়েছে। এই নদীটি না থাকলে সাংহাইর অর্থনৈতিক অবস্থা এত উন্নত হতো কিনা সন্দেহ রয়েছে। আমার মনে হলো, সাংহাইর এই ভাগ্যটির সাথে চট্টগ্রামের দারুণ মিল রয়েছে। চট্টগ্রামের ভাগ্যও শুধুমাত্র একটি নদী নিয়ন্ত্রন করেছে। কর্ণফুলী না থাকলে চট্টগ্রামের সাথে বগুড়া কিংবা পাবনার খুব বেশি পার্থক্য থাকার কোন কারন ছিল না।
আমরা হেঁেট নদীপাড়ের একটি রেস্টুরেন্টে বসলাম। সিচুয়ান রেস্টুরেন্ট। নদীর তীরের এই রেস্টুরেন্ট বেশ অভিজাত এবং দামি। নানা বয়সের নানা ধরনের মানুষ রেস্টুরেন্টের টেবিলে টেবিলে। মদের গ্লাস নিয়েও ভোজন চলছিল অনেকের। আমাদের টেবিল রিজার্ভ করা ছিল। ফজলে করিম অনলাইনে টেবিল রিজার্ভ করে রেখেছিলেন। এতে করে নদীর দিকে মুখ করে চমৎকার একটি টেবিলে বসতে আমাদের কোন সমস্যা হলো না।
মগভর্তি গ্রীন টি নিয়ে এক তরুণী হাজির হলেন। তিনি আমাদের সামনে থাকা গ্লাসগুলো গ্রীণ টি দিয়ে ভরে দিলেন। আমাদের সবার গ্লাসেই ধুমায়িত গ্রীণ টি। শুধু চীনই নয়, আশিয়ান অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি দেশেই গ্রীণ টি’র দাপুটে অবস্থান। আমার মনে হয় এরা পানির চেয়ে গ্রীণ টি বেশি খায়। গাড়ি চালাতে চালাতে কিংবা দৌঁড়াতে দৌঁড়াতেও এরা চুমুক দেয় গ্রীণ টি’র মগে। ঠান্ডা গরম দুভাবেই চলে তাদের এই অমৃত পান। ইন্দোনেশিয়া থেকে জাপান, তাইওয়ান থেকে হংকং, মালয়েশিয়া থেকে থাইল্যান্ড-প্রতিটি দেশেই গ্রীণ টির জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। অধিকাংশ হোটেলেই মুল খাবারের আগে গ্লাস ভর্তি করে গ্রীণ টি দেয়া হয়। গ্লাস ফুরিয়ে গেলে সাথে সাথে ভর্তি করে দেয়া হয়।
সিচুয়ান ফুড রেস্তোরায়ও একইভাবে গ্রীণ টি সার্ভ করা হচ্ছিল। আমি বেশ আনন্দ নিয়ে গ্রীণ টি খাওয়া শুরু করলাম। চ্যাপ্টা নাকের দারুণ সুন্দরী এক তরুনী এসে দাঁড়ালেন টেবিলে। হাতে ডিজিটাল গেজেট, ট্যাব। খাবারের ম্যানু টেবিলে সেট করা, তাও ডিজিটাল। তরুণী লায়ন ফজলে করিমের কাছ থেকে অর্ডার নিয়ে নিজের ট্যাবে নোট নিচ্ছিলেন।
গ্রীণ টি নিয়ে মশগুল হয়ে উঠা আমার ওদিকে খুব বেশি নজর ছিল না। সিচুয়ান নিয়ে যেহেতু কিছু জানি না, বুঝিনা তাই ওসব নিয়ে শুধু শুধু মাথা ঘামাতেও চাচ্ছিলাম না। তবে একটি জিনিস আমার মগজে কড়া নাড়ছিল না। চীন তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার যে কোন পর্যায়ে নিয়ে গেছে! আমাদের টেবিলে দাঁড়িয়ে তরুণী যে অর্ডার নিচ্ছেন তার হাতে থাকা ট্যাবে নোট করার সাথে সাথে অর্ডার চলে যাচ্ছে কিচেনে। ওখানে শুরু হচ্ছে খাবার তৈরি। একই সাথে অর্ডারের কপি চলে যাচ্ছে ক্যাশে। যেখানে তৈরি হচ্ছে বিল। তথ্য প্রযুক্তি বহু খাতে বহুভাবে আমরাও ব্যবহার করছি, কিন্তু চীন যেন এই খাতেও অন্যদের ছাড়িয়ে গেছে। (চলবে)
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।












