(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
বিমানের জানালায় চোখ রেখে বাইরে বৃষ্টি দেখছিলাম। বিমানবন্দরের টারমাকে জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে লাইটের প্রতিফলন চিকচিক করছিল। নিচে বিমানের লোকজন ছাতা হাতে ব্যস্ত, টারমাকে দাঁড়িয়ে নানা কাজ সারছেন তারা। এমন বৃষ্টির মধ্যে আমাদের বিমানটির কীভাবে উড্ডয়ন সম্ভব, বুঝতে পারছিলাম না! তার চেয়ে বরং রাতটা হোটেলে কাটিয়ে সকালে অন্য কোনো ফ্লাইটে গেলে ভালো হতো। ভাগ্য আমাদের নিয়ে কী খেলা খেলছে, কে জানে!
চীনের তাইজু থেকে গুয়াংজু যাচ্ছি আমরা। চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং ৭৩৭–এর ভেতরে বসে আছি। চীনের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক যতই বৈরী হোক, তাদের বোয়িং চীনের আকাশে রাজত্ব করছে। আসলে ভূরাজনীতি আর বাণিজ্যযুদ্ধের মারপ্যাঁচ পুরোপুরি বুঝে ওঠা সাধারণ মানুষের পক্ষে কঠিন! আমেরিকার সুপারশপে চীনা পণ্যের আধিপত্য যেমন দেখেছি, তেমনি চীনের আকাশেও বোয়িংয়ের দাপট। যেন এক প্রকার ‘তোমারটা আমি নেব, আমারটা তুমি নেবে’ নীতির লেনদেন চলছে।
তাইজুর আকাশ তখন কালো মেঘে ঢাকা। বৃষ্টি ঝরছে, মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, বাজের শব্দও শোনা যাচ্ছে। তাইজু লুকিয়াও বিমানবন্দরের টারমাকে বসে প্রকৃতির রুদ্ররূপ দেখছিলাম। ভাবছিলাম, এমন আবহাওয়ায় আদৌ ফ্লাইট ছাড়বে তো?
এমন সময় পাইলটের ঘোষণা ভেসে এলো। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে জানালেন, বিমান কিছুটা দেরিতে ছাড়বে, তবে আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সবুজ সংকেত দিয়েছে। কেবিন ক্রুরা যাত্রীদের সিটবেল্ট বাঁধতে বললেন। তারা হেঁটে হেঁটে নিশ্চিত করছিলেন যে, সবাই ঠিকভাবে সিটবেল্ট বেঁধেছেন কিনা। যাদের সমস্যা হচ্ছিল, তাদের সহায়তা করছিলেন।
অল্পক্ষণ পর আমাদের বিমানটি ধীরে ধীরে টারমাক থেকে রানওয়ের দিকে এগোতে শুরু করল। বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থানে লাল–নীলাভ সংকেত জ্বলছিল, যা বিমানটিকে পথ নির্দেশনা দিচ্ছিল। রানওয়েতে ওঠার আগে বিমানটি আবারও থেমে গেল হয়তো অন্য কোনো বিমান অবতরণ বা উড্ডয়নের অপেক্ষা করছে। কিছুক্ষণ পরই আমাদের বোয়িং ৭৩৭ আবার চলতে শুরু করল এবং রানওয়েতে উঠে সামনের দিকে গতি বাড়াল। ইঞ্জিনের গর্জন বাড়তে থাকল, বাইরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল, বাজ পড়ার শব্দও শোনা যাচ্ছিল। ইঞ্জিনের গর্জন আর বাজের শব্দ মিলে কেমন যেন এক ভীতিকর আবহ তৈরি করল! কেবিনের ভেতর যাত্রীদের মুখে উৎকণ্ঠার ছাপ।
আমি লক্ষ্য করলাম, ভিজে থাকা রানওয়ের ওপর দিয়ে পাইলট দক্ষ হাতে বিমানটি সামনের দিকে এগিয়ে নিচ্ছেন। দ্রুতগতিতে ছুটে গিয়ে আচমকা এক ধাক্কায় বোয়িং ৭৩৭ মাটি থেকে আকাশে ভর করল!
বৃষ্টি তখনো ঝরছে, আকাশ মেঘে ঢাকা। বিমানটি মেঘের ভেতর ঢুকতেই প্রথম ধাক্কাটা অনুভব করলাম। মনে হলো, বিমানটা থেমে থেমে যাচ্ছে! কখনো মনে হচ্ছিল, প্রচণ্ড ঘর্ষণের মতো একটা শব্দ হচ্ছে। তবে ভয় পাওয়া ছাড়া আর তেমন কোনো সমস্যা হচ্ছিল না। আমাদের বিমানটি মেঘের ভেতর দিয়ে ওপরে উঠতে লাগল। নিচের শহরের আলো ক্রমশ ছোট হতে হতে মিলিয়ে গেল। চারদিকে কেবল সাদা ধোঁয়ার মতো কুয়াশা আর ঘন কালো মেঘ। মনে হচ্ছিল, যেন এক বিশাল শূন্যতার দিকে ছুটে চলেছি!
জানালার পাশে বসে মেঘের রাজ্যে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমার কিছুই করার ছিল না। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল করলাম, চারপাশে জ্যোৎস্নার বন্যা! মেঘের ওপর ছড়িয়ে থাকা জ্যোৎস্না এক অপার্থিব সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে। সাদা তুলোর মতো মেঘের রাজ্যে রুপালি আলো ছড়িয়ে রয়েছে, যেন চাঁদ নিজেই মেঘের ওপরে এক অনন্ত পথচলা শুরু করেছে! নিচে ঝড়–বৃষ্টি, আর ওপরে প্রশান্ত মেঘের রাজ্যে চাঁদের ঝলকানি– এ এক বিস্ময়কর বৈপরীত্য! প্রকৃতির এই খেলা বোঝার সাধ্য কি আমার আছে? নিজের চোখে না দেখলে হয়তো বিশ্বাসই করতাম না। বৃষ্টি বা প্রতিকূলতার কোন চিহ্ন নেই আকাশে। থালার মতো চাঁদ যেনো অনেক কাছে চলে এসেছে। চারদিকে থৈ থৈ জ্যোৎন্সা, আজ কী ভর পূর্ণিমা, কে জানে!!
পাইলটের ঘোষণা ভেসে এলো ককপিট থেক্তে। ইংরেজীতে বললেন, আমরা এখন ক্রুজিং অল্টিটিউডে পৌঁছেছি, ৩৬,০০০ ফিট উচ্চতায় উড়ছি। গন্তব্য গুয়াংজু পৌঁছতে আমাদের দুই ঘণ্টার মতো সময় লাগবে। বাইরে আবহাওয়া ভালো, আশা করছি আমরা সময়মতো নামতে পারব। তিনি তাপমাত্রাসহ নানা কিছুও বললেন। সময়মতো পৌঁছাতে পারার ঘোষণা আমাকে আশ্বস্ত করলো।
আমি বুঝতে পারছিলাম যে, এতোক্ষণে ককপিটে বিমান চালনার দায়িত্বের একটি বড় অংশ চলে গেছে অটোপাইলটের হাতে। আধুনিক যাত্রীবাহী বিমানের বেশিরভাগ সময়ই অটোপাইলট সিস্টেম চালিত থাকে। এটি এমন একটি প্রযুক্তি, যা পাইলটদের সহায়তা করে নির্দিষ্ট গতি, উচ্চতা এবং দিকনির্দেশ বজায় রাখে। পাইলটরা এটি ব্যবহার করেন, বিশেষ করে ক্রুজিং অবস্থায়, যাতে তারা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন আবহাওয়ার অবস্থা পর্যবেক্ষণ, রেডিও যোগাযোগ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দিকে মনোযোগ দিতে পারেন। তবে একথা ঠিক যে, অটোপাইলট মানে এটি নয় যে, বিমান নিজে নিজেই পুরো পথ চলবে। টেকঅফ এবং ল্যান্ডিং সাধারণত হাতে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। অটোপাইলট চালু থাকলেও জরুরি পরিস্থিতিতে পাইলটদের হস্তক্ষেপ করতেই হয়। তাই অটোপাইলট থাকা সত্ত্বেও, ককপিটের দুই পাইলট পুরো পরিস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত মনোযোগী থাকেন। তারা নিশ্চয় সবকিছুর সবুজ সিগন্যাল পেয়েছেন বলেই যাত্রা করেছেন, এবং এখন আমাদের আশ্বস্ত করছেন।
লায়ন ফজলে করিম ভাই এবং ডালিয়া ভাবী আমার পাশের রো’তে পাশাপাশি সিটে বসেছেন। এতোক্ষণ কোন কথা না বললেও এবার করিম ভাই যেনো বেশ সাহসী হয়ে উঠলেন। বললেন, সব ঠিকঠাক আছে। সমস্যার কিছু নেই। এমন ঝড়–বৃষ্টিতে বিমানযাত্রায় কোন সমস্যা হয় না। করিম ভাইয়ের কথায় আমি সায় দিলাম। এতোক্ষণ যে পরাণে পানি ছিল না, বা এখনো যে সেখানে খাঁ খাঁ করছে তা বুঝতে দিলাম না।
আকাশপথে চলতে গেলে কিছু বিশেষ নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। বিমান যখন আকাশে উঠে যায়, তখন সাধারণত ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়ে, কারণ এই উচ্চতায় বাতাসের ঘনত্ব কম থাকে এবং জ্বালানি সাশ্রয় হয়। পাইলট কন্ট্রোল টাওয়ারের নির্দেশনা অনুসারে পথ নির্ধারণ করেন, যাতে অন্য কোনো বিমানের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি না থাকে।
আকাশে অনেক সময় টারবুলেন্স হয়। আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে বিমান কিছুটা কেঁপে ওঠে। বাতাসের শূন্যতায় বিমান একেবারে হুট করে কয়েকশ’ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে যায়। মনে হয় পড়ে যাচ্ছি। তবে পাইলটরা এইধরনের পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য প্রশিক্ষিত। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল থেকে সতর্ক সংকেত পেলে তারা বিমানকে একটু নিচে বা উপরে নিয়ে যান, যেখানে বাতাস তুলনামূলক শান্ত থাকে। বিমান চলাচলে বাতাস যে কী পরিমান গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তা হয়তো আমরা অনেকেই জানি না।
আমি জানালার কাঁচে মাথা ঠেকিয়ে চাঁদের আলোয় ডুবে থাকা মেঘের রাজ্য দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমরা যেন স্বপ্নের এক রাজ্যে ভাসছি। কয়েক মুহূর্তের জন্য বাস্তবতা ভুলে গিয়েছিলাম।
বোয়িংয়ের ভিতরের আবহ পুরোপুরি স্বাভাবিক। কেবিন ক্রুরা স্বাভাবিকভাবে খাবার পরিবেশন শুরু করেছেন। আমিও এক কাপ কফি নিলাম, আর জানালার বাইরের সেই রুপালি সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগলাম। ককপিটে হয়তো তখন সবকিছু স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলছিল, কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল, পুরো ভ্রমণটাই যেন এক জাদুর মতো। কফির কাপে আদুরে চুমুক দিতে দিতে আমি বাইরের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম।
আরো কিছুক্ষণ পর পাইলট ঘোষণা দিলেন যে, আমরা অল্পক্ষণের মধ্যে গুয়াংজুর বায়ুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবো। এখানে আবহাওয়া তুলনামূলক ভালো। বাইরের তাপমাত্রাও স্বাভাবিক। বিমান ধীরে ধীরে নিচে নামতে শুরু করল, আর চীনের অন্যতম প্রসিদ্ধ শহর গুয়াংজুর ঝলমলে আলো আমাদের যেনো স্বাগত জানাচ্ছিলো। কিছুক্ষণের মধ্যে তীব্র একটি ঝাঁকুনি জানান দিল যে, আমরা মাটি স্পর্শ করেছি। অনিশ্চিত এক যাত্রার অবশেষে নিশ্চিত এবং নিরাপদে অবতরণে প্রতিটি যাত্রীর মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস। আমার জীবনে অসংখ্য বিমানযাত্রার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে এই যাত্রা ছিল ভয় ও রোমাঞ্চের এক অনন্য মিশ্র অভিজ্ঞতা। যা হয়তো একজীবনের পুরোটা সময়ই মনে গেঁথে থাকবে। (চলবে)
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।