দুর্নীতিকে সহনীয় পর্যায়ে আনতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে

| শনিবার , ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বিচারে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বাংলাদেশে দুর্নীতি পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়েছে। তাতে তাদের বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নতি ঘটেছে এক ধাপ। দুর্নীতির এই ধারণা সূচকের (সিপিআই) ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী (ভালো থেকে খারাপ) বিশ্বের ১৮২টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এবার ১৫০ নম্বরে। গতবার এ তালিকায় বাংলাদেশ ১৫১ নম্বরে ছিল। আবার অধঃক্রম অনুযায়ী (খারাপ থেকে ভালো) বিবেচনা করলে বাংলাদেশ অবস্থান এবার ১৮২ দেশের মধ্যে ১৩তম, যেখানে গত বছর ছিল ১৪তম অবস্থানে। ১০০ ভিত্তিতে এই সূচকে বাংলাদেশের স্কোর এক বছরে এক পয়েন্ট বেড়ে হয়েছে ২৪। এই স্কেলে শূন্য স্কোরকে দুর্নীতির ব্যাপকতার ধারণায় সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ১০০ স্কোরকে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত বা সর্বোচ্চ সুশাসনের দেশ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বের ১৮২টি দেশ ও অঞ্চলের ২০২৫ সালের দুর্নীতির পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বার্লিনভিত্তিক সংস্থা টিআই গত মঙ্গলবার তাদের এই বার্ষিক সূচক প্রকাশ করেছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এবারের প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক এবং বাংলাদেশের দুর্নীতির পরিস্থিতি তুলে ধরেন। টিআইবি মনে করছে, এ বছর বাংলাদেশের এক পয়েন্ট স্কোর বৃদ্ধির পেছনে জুলাই অভ্যুত্থানের ফলে সূচিত গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক সুশাসন অর্জনে অব্যবহিত ইতিবাচক সম্ভাবনার প্রভাব কাজ করেছে। তবে রাষ্ট্রসংস্কার প্রক্রিয়ার পরবর্তী বাস্তবতার প্রতিফলন সংশ্লিষ্ট তথ্যসূত্রের মেয়াদভুক্ত ছিল না। তাই রাষ্ট্রসংস্কার প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি না হওয়ায় আদতে বাংলাদেশের স্কোর ও অবস্থানের খুব একটা ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি।

গতবারের মতোই এ সূচকে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে বাজে অবস্থায় আছে কেবল মিয়ানমার ও আফগানিস্তান। ১৬ স্কোর নিয়ে দুটি দেশই ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী (ভালো থেকে খারাপ) রয়েছে তালিকার ১৬৯ নম্বরে। গতবারের মতোই এ সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে ভুটান। ৭১ স্কোর নিয়ে ভুটানের অবস্থান সূচকের ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী ১৮ নম্বরে। এরপর ভারত ও মালদ্বীপ ৯১ (স্কোর ৩৯), শ্রীলঙ্কা ১০৭ (স্কোর ৩৫), নেপাল ১০৯ (স্কোর ৩৪) ও পাকিস্তান ১৩৬তম (স্কোর ২৮)। ২৪ স্কোরে বাংলাদেশের সঙ্গে সূচকের একই অবস্থানের রয়েছে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক ও প্যারাগুয়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও দুর্নীতি দমনের অভিযানকে সফল করতে হলে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগউদ্যমকে একযোগে কাজে লাগাতে হবে। তবে এই কঠিন লক্ষ্যে সফলতা অর্জনের একটি পূর্বশর্ত হচ্ছে দুর্নীতি সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। যদি সংঘবদ্ধ ও সমন্বিতভাবে দুর্নীতির কদর্য চেহারাকে পরিচিত করে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এবং জনস্বার্থে এর কুফল সম্পর্কে তথা জনসচেতনতা সৃষ্টি করা যায়, তাহলে দেশ আরও এগিয়ে যাবে।

সাধারণ মানুষের মধ্যে দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতা তৈরির ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেন, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার মাধ্যমেই কেবল দুর্নীতিকে সহনশীল মাত্রায় কমিয়ে আনা সম্ভব। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বব্যাপী প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। কোনো মানুষ দুর্নীতিবাজ হিসেবে জন্মগ্রহণ করে না। পারিবারিক, সামাজিক ও আশপাশের পরিবেশই মানুষের জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। তাই দুর্নীতিবিরোধী অভিযান নিজের ঘর থেকেই শুরু করতে হবে। দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। সৎ, আন্তরিক ও নিষ্ঠাবানদের সামাজিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। তাহলেই দুর্নীতি হ্রাস পাবে।

বিশ্লেষকরা বলেন, একধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে দেশে। তাতে পরোক্ষভাবে দুর্নীতিবাজদের পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে। আগে সরকারের পক্ষ থেকে দুর্নীতির বিষয়টি অস্বীকার করা হতো। কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করলে নাগরিকসমাজ ও গণমাধ্যমকর্মীদের নাজেহাল হতে হয়েছে। ফলে দুর্নীতিবাজরা এতে উৎসাহিত হয়েছে। বাংলাদেশে আরও কয়েকটি কারণে দুর্নীতি কমানো যাচ্ছে না। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতির ঘাটতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবহিদিতার অভাব, রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য অবস্থান সংকুচিত করে দেয়া এবং গণমাধ্যম ও সুশীলসমাজের প্রতিনিধিদের কথা বলার সুযোগ সীমিত করে দেয়া।

তাঁরা বলেন, নাগরিক সচেতনতা সৃষ্টি না হলে, সামাজিকভাবে দুর্নীতিবাজদের বয়কট না করলে শুধু আইন দিয়ে দুর্নীতি কমানো সম্ভব নয়। দুর্নীতি রেখে দেশের উন্নয়নও সম্ভব নয়, হলেও সে উন্নয়ন টেকসই হবে না। দুর্নীতি সহনীয় পর্যায়ে আনতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে