বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য–উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, এবারের আটদিনের ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনায় ২০৪ জন নিহত এবং ছয় শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে। সংস্থাটির প্রতিবেদন বলছে, ঈদযাত্রার অধিকাংশ দুর্ঘটনাই বাইক দুর্ঘটনা। এছাড়া বড় কিছু মর্মান্তিক দুর্ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এগুলো হলো প্রাথমিক তথ্য। এখন ছুটি শেষে যখন কর্মক্ষেত্র চালু হয়েছে, তখন আরো তথ্য পাওয়া যাবে। ঈদের ছুটির আগে সড়কে আমরা তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক দেখলেও ফিরতি যাত্রায় এমন ভয়াবহ চিত্র কেন দেখা যায়। কারণটি বোঝা জরুরি। ঈদের আগে সরকারের নজরদারি এবং আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীর যে কঠোরতা সড়কে থাকে, তা ঈদের পর দেখা যায় না। হাইওয়ে পুলিশ, বিআরটিএ ও স্থানীয় প্রশাসনে সরকারের দায়িত্বশীলরা ঈদযাত্রার মধ্যে বাড়ি যাওয়ার সময়ই বেশি গুরুত্ব দেন। ঈদের পর থেকে ফিরতি যাত্রার সময়ে ছুটির আমেজটা গাঢ় হয়ে যায়। এ সময়ে মানুষের ফেরার পরিকল্পনায় হেরফের ঘটে আর মানুষের মধ্যে বাড়তি তাড়া দেখা দেয়। এবারো ব্যতিক্রম হয়নি। সড়কে সমন্বিতভাবে নিয়ন্ত্রণ না থাকায় আমরা যাত্রী ভোগান্তির নিরিখে দুর্ঘটনা ঘটতে দেখেছি। ট্রেন দুর্ঘটনা অতীতের তুলনায় অনেক বেশিই বলা যায়। যাত্রী ভোগান্তি এড়ানোর ক্ষেত্রে কঠোর তদারকির প্রয়োজন ছিল। বিশেষত আমাদের রেলগুলো জরাজীর্ণ। শিডিউল বিপর্যয় এড়ানোর বিষয়টি আমাদের মূল সমস্যা নয়। জরাজীর্ণ অধিকাংশ রেলের ধারণ সক্ষমতা কম। তাছাড়া রেললাইন ও পারিপার্শ্বিক অনেক কিছুতে সমস্যা আছে। এসব সমস্যা নিয়ে ভাবতে হবে এবং কাজ করতে হবে। কারণ সামনে আরেকটি ঈদ। সে সময়ও যেন এসব দিক মোকাবেলা করা যায় তা ভাবতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, সড়ক পরিবহন আইন প্রয়োগ কাগজ–কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে দুর্ঘটনা কমবে না। মালিকদের প্রভাবে চলছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। তারা একপেশে ও একচেটিয়া সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আইন প্রয়োগে প্রভাবশালীদের ছাড় দেয়া হচ্ছে। প্রভাবশালী ও সবলদের ওপর আইন প্রয়োগ করছে না পুলিশ। দুর্বলের ওপর আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে। এছাড়া সড়কে চাঁদাবাজি, ছোট যানবাহনের আধিক্যের কারণে সড়ক পরিবহন নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ছে। উন্নত দেশে গণপরিবহনকে প্রাধান্য দেয়া হয়, আর আমাদের দেশে ছোট যানবাহনকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৯০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী যানবাহনের অতিরিক্ত গতি এবং চালকের বেপরোয়া মনোভাব। মহাসড়কে যান চলাচলের সর্বোচ্চ গতি বেঁধে দিয়ে এবং গতি পরিমাপক যন্ত্র ব্যবহার করে চালকদের ওই নির্দিষ্ট গতি মেনে চলতে বাধ্য করা হলে দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাছাড়া চালকের দক্ষতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে। মহাসড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ করতে হবে সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী।
সড়ক দুর্ঘটনার কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে ইতোপূর্বে নানা ধরনের পরামর্শ ও সুপারিশ করা হয়। কিন্তু কেউ তাতে কর্ণপাত করেন বলে মনে হয় না। কর্তৃপক্ষও যেন নির্বিকার। ফলে একের পর এক ঘটে চলেছে দুর্ঘটনা। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ২০১৯ সালে একটি আইন কার্যকর করা হলেও এর যথাযথ বাস্তবায়ন আজও নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিরা পার পেয়ে যাচ্ছেন সহজেই। দেশে সড়ক দুর্ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ায় এ আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতে, সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতীয় মহাসড়কে রোড সাইন বা রোড মার্কিং, সড়কবাতি না থাকা। অতি বৃষ্টিতে সড়কে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় যানবাহন চলাচলে ঝুঁকি বেড়েছে। জাতীয়, আঞ্চলিক ও ফিডার রোডে টার্নিং চিহ্ন না থাকার ফলে নতুন চালকরা এসব সড়কে দুর্ঘটনায় পড়েছেন। উল্টোপথে চলাচল, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, বেপরোয়া যানবাহন চালানো এবং অতিরিক্ত সময় ধরে চালকের আসনে একজন থাকায় দুর্ঘটনার সংখ্যা কমছে না। ধীর ও দ্রুতগতির বাহনের জন্য পৃথক লেনের ব্যবস্থা করতে সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, দুর্ঘটনা রোধে চালকদের ওভারটেকিং করার মানসিকতাও পরিহার করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে দেশের সড়কব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন প্রয়োজন। শুধু চালকদের দক্ষতা বিচার করে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি। এক্ষেত্রে যেন কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি না ঘটে, সে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের থেকে নিশ্চিত করা আবশ্যক।








