মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরে সাত দিন ধরে আটকে আছে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন জাহাজ এমভি বাংলার জয়যাত্রা। জাহাজটিতে রয়েছেন ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক। প্রতিদিন আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আনাগোনা এবং দূর থেকে বিস্ফোরণের শব্দ শুনে আতঙ্কের মধ্যেই সময় কাটছে তাদের।
জাহাজটির ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে তারা কার্যত ‘জান হাতে নিয়ে’ দায়িত্ব পালন করছেন। গতকাল সন্ধ্যায় তিনি দৈনিক আজাদীকে বলেন, জেবেল আলী বন্দরের ১০ নম্বর টার্মিনালে নোঙর করে থাকা অবস্থায় প্রতিদিনই আশপাশে সামরিক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। ‘জাহাজ থেকে প্রায় প্রতিদিনই আকাশে মিসাইল ও ড্রোন উড়তে দেখি। মাঝে মাঝে আকাশে বিস্ফোরণও হয়। বন্দরের কাছাকাছি বিস্ফোরণের শব্দও শোনা যায়,’ বলেন তিনি।
গত শনিবার জাহাজ থেকে মাত্র দুইশ মিটার দূরে একটি তেল সংরক্ষণাগারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা নাবিকদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দেয় বলে জানান ক্যাপ্টেন শফিকুল। তিনি বলেন, ঘটনাটার পর সবাই খুব ভয়ে ছিল। পরে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি।
বিএসসির জাহাজটি গত ২৬ ফেব্রুয়ারি কাতারের মেসাইদ বন্দর থেকে ৩৮ হাজার ৮০০ টন স্টিল কয়েল নিয়ে জেবেল আলী বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছে। পরদিন বন্দরের টার্মিনালে ভেড়ে এবং কয়েকদিন পর পণ্য খালাস শুরু হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী পণ্য নামানোর পর জাহাজটির আবার কাতারে যাওয়ার কথা ছিল নতুন কার্গো নেওয়ার জন্য। কিন্তু এর মধ্যেই ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পাল্টা হামলায় বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করলে পরিস্থিতি দ্রুত অস্থির হয়ে ওঠে।
এই পরিস্থিতিতে জাহাজটির পরবর্তী গন্তব্য এখনো নির্ধারিত হয়নি। ক্যাপ্টেন শফিকুল জানান, স্টিল কয়েল খালাসের কাজ শেষ হলে জাহাজটি কোথায় যাবে, সে সিদ্ধান্ত দেবে জাহাজটি ভাড়া নেওয়া বিদেশি কোম্পানি। তিনি বলেন, জাহাজে এখনো পর্যাপ্ত পানি, খাবার ও জ্বালানি রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার, বিএসসি এবং আমিরাতে বাংলাদেশ দূতাবাস আমাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে।
জেবেল আলী বন্দরে বর্তমানে প্রায় একশ জাহাজ অবস্থান করছে এবং বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমও চালু রয়েছে বলে জানান তিনি। তবে পরিস্থিতি খারাপ হলে নাবিকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে। তিন দশকের বেশি সময় ধরে নাবিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ কর্মজীবনে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি তিনি আগে কখনো হননি। তার বাড়ি চাঁদপুরে; সেখানে রয়েছেন স্ত্রী ও সন্তানরা। পরিবারের সবাই খুব উদ্বিগ্ন। আমরা প্রতিদিনই ফোনে কথা বলি, যাতে তারা কিছুটা স্বস্তি পায়– বলেন তিনি।
বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক জানান, জাহাজের নাবিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং তাদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পণ্য খালাসের কাজও চলমান রয়েছে, যা শেষ হতে আরও কয়েকদিন লাগতে পারে।












