দীপক বড়ুয়ার নিটোল শিক্ষণীয় শিশুতোষ গ্রন্থ ‘পৌলমির গাছ বন্ধু’

বাসুদেব খাস্তগীর | সোমবার , ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১১:০১ পূর্বাহ্ণ

বিচিত্রমুখী লেখকের কলমে বিচিত্রভাবে ধরা দিয়েছে আমাদের পরিবেশের অন্যতম উপাদান গাছ। দীপক বড়ুয়ার হাতের কলমে গাছের কথকতা নিয়ে এমনি একটি গল্প উঠে এসেছে যেখানে কাল্পনিক নানা ঘটনার আড়ালে একটি গাছকে যেভাবে তুলে আনা হয়েছে তা চমৎকার ও প্রশংসারযোগ্য। দীপক বড়ুয়া এই জনপদে লেখালেখির জগতে অতি পরিচিত এক নাম। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি লেখালেখি করে আসছেন। লেখালেখির বিভিন্ন শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ। ছোট ছোট বাক্য বিন্যাসে তাঁর গল্প এগিয়ে যায় ঝরনার রিমঝিম ছন্দে চলার মত। চরিত্রের কথোপকথন যেন গল্পের মাঝে প্রাণ ছড়িয়ে দেয়। গাছকে নিয়ে আমরা কে কতটুকু ভাবি সে প্রশ্ন বর্তমান সময়ে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ পরিবেশের এই উপাদানের প্রতি আমরা যে প্রতিনিয়ত অবিচার করে চলছি তার জবাব প্রকৃতি কিন্তু সময়ে সময়ে আমাদের দিয়ে যাচ্ছে। দীপক বড়ুয়ার ‘পৌলমির গাছ বন্ধু’ ছোট্ট শিশুতোষ উপন্যাসটি আমাদের শিশু মনস্তত্ত্বকে ধারণ করে লেখা। বইটি পড়লেই শিশুরা আনন্দ পাবে এবং একটি কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যাবে। এমন কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যেতেই তো শিশুরাই ভালোবাসে। একটি গাছকে কেন্দ্র করে শিশু পৌলমির কাল্পনিক যে ভাবনা এখানে ফুটে উঠেছে গাছের প্রতি তা একটি শিশুর মমত্ববোধ ও নিখাদ ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। গল্পের নানা পর্যায় শুধু গাছকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে পৌলমির জীবন। বিষয়বস্তুটা কাল্পনিক ঢঙের হলেও এখানে রয়েছে চমৎকার একটি ইতিবাচক বার্তা। যে গল্প পড়ে গাছকে ভালোবাসা যায়, গাছের গুরুত্বকে উপলব্ধিও করা যায়। গল্পটা খুব বেশি বড় না হলেও তার আবেদনের রেশ দীর্ঘ। গ্রামের নাম ভূমিশ্রেষ্ঠা। সে গ্রামের ছোট্ট এক কিশোরী পৌলমি। প্রতিদিন স্কুলে যায়। স্কুলে আসা যাবার পথে তার সাথে ভাব হয়েছে একটি গাছের, সেই গাছের সাথে তার প্রতিনিয়ত ভাবনা চিন্তার শেয়ার করা বিষয়গুলো যেন আমাদের জীবনেরই কথা। আমরা সেই ছোট্টবেলায় কত হেঁটে হেঁটে স্কুলে গিয়েছি। প্রচণ্ড রোদের তাপদাহে কিংবা বর্ষার রিমঝিম ছন্দেও তখন স্কুলের পথচলা থেমে থাকেনি। সেই রোদ কিংবা বৃষ্টির ক্ষণে আমরাও কত বৃক্ষের ছায়াতলে নিজেকে সমর্পণ করে ধন্য হয়েছি। ‘পৌলমির গাছ বন্ধু’ পড়লেই যেন সেই সব দিনে আবার ফিরে যাওয়া হয়। একটি গাছই যেন আমাদের সেই সব দিনে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। পৌলমির স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় একটু ঠাণ্ডা হাওয়া পেতে কিংবা বিশ্রামের জন্য একটি গাছের ছায়াতলে বসে কী এক পরম প্রশান্তি অনুভব করতে করতে গাছটিও যেন পরম বন্ধু হয়ে ওঠে। সেই বন্ধুত্ব এমন নিবিড় ও গাঢ় হয়েছে যে গাছটি যেন তার সাথে কথা বলে বলে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। গাছের শীতল ছায়া ও বাতাসে সে যখন ঘুমিয়ে পড়ে ঘুমের মধ্যে পৌলমি যেন শুনতে পায় গাছটি তার সাথে কথা বলছে। গাছটি বলছে, ‘ঘুমুচ্ছো? এবার বাড়ি যাওমা ভাবছে।’ পৌলমি ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখে এতো স্বপ্ন। কিন্তু পৌলমিও গাছকে ধন্যবাদ দিয়ে বাড়ির পথে পা বাড়ায়। এভাবেই পৌলমির সাথে গাছের কথোপকথনের মাধ্যমে গল্প এগিয়ে গেছে। যেন ছন্দের নিটোল দোলায় প্রতিদিন গাছের সাথে নানা গল্পে মেতেছে পৌলমি। গাছ শুনিয়েছে তার নিজের কথা, পৌলমিও শুনিয়েছে তার কথা। গাছের হাত নেই, পা নেইতার মর্মবেদনা শুনিয়েছে পৌলমিকে, কিন্তু পৌলমির প্রয়োজনে গাছ নিজেকে উজার করে দিয়েছে। গাছ দিয়েছে পাতা, পৌলমি পাতা দিয়ে মুকুট বানিয়ে পরে মাকে দেখিয়েছে। গাছ ক্ষুধার সময় পৌলমিকে ফল দিয়েছে, তা দিয়ে পৌলমি ক্ষুধা নিবারণ করেছে। পৌলমির এ আনন্দে গাছও আনন্দিত হয়। অন্যের উপকারে নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার যে আনন্দ সে আনন্দের সত্যিকার অর্থে কোনো সীমারেখা নেই। একটি গাছের চরিত্রের মাঝে চমৎকার সে ভাবনাকে তুলে আনা হয়েছে। বৃষ্টির সময় পৌলমিকে গাছটি আগলে রাখে। প্রচণ্ড ঝড়ে মাবাবা হারানো পৌলমিকে তার নিজের ভাঙা ডাল দিয়ে বাড়ি তৈরি করে থাকতে দিয়েছে। গাছের ডাল ভাঙার কথা বলায় পৌলমির যে মর্মবেদনা প্রকাশ পেয়েছে তা গাছের প্রতি মানুষের ভালোবাসারই প্রকাশ। গাছের ফল বিক্রি করে পৌলমি নিজের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেছে এবং গাছকেও খাবার জন্য যে আবেদন নিবেদন তা একসাথে থাকার আনন্দকেই প্রকাশ করেছে। একসময় পৌলমি একাকীত্ব অনুভব করে, সেই অনুভবে সে তার মাবাবাকে স্মরণ করে। সে সমুদ্রে যেতে চায়। কিন্তু তার নির্বাক মন যেন কিছুই প্রকাশ করতে চায় না। একসময় গাছ পৌলমির অনুভবকে বুঝতে পারে এবং জানতে পারে সে সাগরে যেতে চায়। তার এই চাওয়াটা পূরণের জন্য গাছ নিজেকে উজাড় করে দিয়ে নৌকা বানিয়ে দেয়। স্থানীয় এক বাজারের কারিগরের সহায়তা নিয়ে পৌলমি নৌকা বানিয়ে সমুদ্রে পাড়ি দেয়। পৌলমি যাবার সময় দেখে গাছটির সেই জৌলুস আর নেই। গাছটির প্রায় অংশ কর্তন হয়েছে পৌলমির জন্য নৌকা বানাতে। তবুও যে গাছের প্রশান্তি পৌলমির চাহিদা পূরণ করতে পেরে। গাছের কণ্ঠে যেন পৌলমি শুনতে পায়, ‘বন্ধু যাও। সাবধানে যাবে। বেড়িয়ে তাড়াতাড়ি ফিরবে। আমি অপেক্ষায় থাকব।’ কিন্তু সমুদ্র পৌলমির ভালো লাগে না। পৌলমি গাছের বন্ধুত্বের কাছে হার মেনে আবার সমুদ্র থেকে ফিরে আসে। গাছের নিচে বসেই যেন পৃথিবীর সমস্ত সুখকে সে অনুভব করে। এর চেয়ে শান্তি যেন আর কোথাও নেই। পৌলমির অনুভবে দোলা দেয় গাছটিকে কেটে সে মহা অপরাধ করে ফেলেছে। এটি যেন ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু গাছ বলে একদিন তার আবার ডালপালা বাড়বে এবং তাদের বন্ধুত্ব অটুটই থাকবে। গল্পের শেষে পৌলমির অনুভবটা চমৎকার। সে ভাবে, ‘গাছটার মনটা আকাশের চেয়েও অনেক বড়ো, উদার সরল।’ দীপক বড়ুয়ার এ শিশুতোষ গল্পটা একটা শিশুর সাথে একটি গাছের কল্পনাশ্রয়ী ভাবনা। ভাবনাটা কল্পনাপ্রবণ হলেও গাছের সাথে মানুষের প্রাত্যহিক যে নিবিড় সম্পর্ক তা দারুণভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে। গল্পটি একেবারে ছোট হলেও এর বক্তব্য বিশাল। গল্পের শেষের মত করে বলা যায় গাছের মন আসলেই উদার সহজ সরল ও আকাশের মত বিশাল। আমাদের সকলের মনও সে রকমই হওয়া উচিত। গল্পের মাধ্যমে লেখক সে বার্তাকেই আমাদের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন। বইটির প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন শিল্পী নাটু বিকাশ বড়ুয়া। বইটির মূল্য ১৬০টাকা। শিশুকিশোররা বইটি পড়ে আনন্দের সাথে শিক্ষণীয় বিষয়েও সচেতন হয়ে উঠবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাংলাদেশকে ঘিরে সবার দৃষ্টি
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রাম : বাণিজ্যিক রাজধানীর অপরিহার্যতা