মার্কিন–ইসরায়েলি হামলায় ইরানে নিহত বেসামরিক নাগরিকের সংখ্যা ১ হাজার পার হয়েছে। প্রায় ৫ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। আল জাজিরা লিখেছে, এই যুদ্ধে ইরানকে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। দেশটিতে দফায় দফায় হামলা চালানো হয়েছে। তেহরানের প্রায় তিন–চতুর্থাংশ বাসিন্দা শহর ছেড়ে চলে গেছেন।
এদিকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন বাহিনীর হামলায় ডুবে গেছে ইরানি যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস দেনা’। জাহাজটি থেকে ৮৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে শ্রীলঙ্কা নৌবাহিনী। লঙ্কান নৌবাহিনীর বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি। শ্রীলঙ্কা নৌবাহিনীর কমান্ডার বুদ্ধিকা সম্পাত এক বিবৃতিতে জানান, উদ্ধারকারী দল যখন দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, তখন সেখানে জাহাজের কোনো চিহ্ন ছিল না। চারদিকে শুধু তেলের স্তর আর লাইফ র্যাফট ভাসতে দেখা গেছে। তিনি বলেন, আমরা সাগরে মানুষের মরদেহ ভাসতে দেখেছি। এর আগে জানানো হয়েছিল, জাহাজটি থেকে উদ্ধার হওয়া ৩২ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পার্লামেন্টে জানিয়েছেন, ইরানি ওই ফ্রিগেটে অন্তত ১৮০ জন আরোহী ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। নৌবাহিনীর মুখপাত্র জানিয়েছেন, উদ্ধার করা মরদেহগুলো বর্তমানে উপকূলে আনার প্রক্রিয়া চলছে। নিখোঁজ বাকিদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এর আগে ইরানি যুদ্ধজাহাজে হামলার তথ্য নিশ্চিত করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকা একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে টর্পেডো হামলা চালানো হয়েছে। আমরা ইরানি যুদ্ধজাহাজকে ডুবিয়ে দিয়েছি। সেটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিজেকে নিরাপদ মনে করেছিল। তবে কোন জাহাজটি লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু জানাননি তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তারা ইরানের ২০টিরও বেশি জাহাজে হামলা চালিয়েছে বা সেগুলোকে সাগরের তলায় পাঠিয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের অধীন ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের এই হালনাগাদ তথ্যটি আসে অল্পক্ষণ পরই, যখন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন যে ভারত মহাসাগরে একটি মার্কিন সাবমেরিন টর্পেডো দিয়ে ইরানি একটি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ৫ দিনের চলমান যুদ্ধে মানুষ নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৪৫ জনে দাঁড়িয়েছে। হামলা গোটা অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর মার্কি ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের লাগাতার হামলা চলার মধ্যে এবার তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানা হল তুরস্কও। তবে ক্ষেপণাস্ত্রটি পশ্চিমা সামরিক জোট নেটোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ধ্বংস করা হয়েছে বলে তুরস্ক জানিয়েছে। বুধবার সিরিয়া, ইরাক পার হযে তুরস্কের আকাশসীমার দিকে যাচ্ছিল একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র। তবে তুরস্কের আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই সেটিকে ধ্বংস করে দেয় নেটো আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রণালয় একথা জানিয়েছে। বুধবার এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় বলেছে, ইরান থেকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইরাক এবং সিরিয়ার আকাশসীমা পেরোতে এবং তুরস্কের আকাশসীমার দিকে যেতে দেখা যায়।
ভূমধ্যসাগরে মোতায়েন ন্যাটোর আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সেটিকে সঠিক সময়ে নিষ্ক্রিয় করেছে। এতে কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, তুরস্কের তাদের বিরুদ্ধে যে কোনও বৈরি তৎপরতার পাল্টা জবাব দেওয়ার অধিকার আঙ্কারার আছে। সংঘাত বাড়তে পারে এমন কোনও কিছু করা থেকে বিবাদমান পক্ষগুলোকে সতর্ক করেছেন তিনি।
হরমুজ প্রণালী ইরানের দখলে রাখার দাবি : হরমুজ প্রণালী দিয়ে জলপথে বিশ্বের অধিকাংশ তেল আমদানি–রপ্তানি হয়। সেই প্রণালী সম্পূর্ণ দখলে রাখা হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানের ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)। ইরানের ফার্স বার্তা সংস্থায় এক বিবৃতিতে আইআরজিসি–র নৌ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আকবরজাদেহ বুধবার বলেন, বর্তমানে হরমুজ প্রণালী ইসলামিক রিপাবলিক (ইরান) এর নৌবাহিনীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছে।
বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল এই প্রণালী দিয়ে রপ্তানি হয়। বর্তমানে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে বহু জাহাজ। ইরানের বিধিনিষেধের কারণে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল থমকে গেছে। সেই ভিড়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজও। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন তিনি ওই অঞ্চলে নৌবাহিনী পাঠাচ্ছেন,যাতে তারা হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল ট্যাঙ্কারগুলোকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যায়।
গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একসঙ্গে ইরানে হামলার পর থেকেই পাল্টা হামলা শুরু করে ইরান। সেই উত্তেজনা ছড়ায় হরমুজ প্রণালীতেও। যুদ্ধের শুরু থেকেই এই বাণিজ্যিক জলপথকে দৃশ্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইরান। কিছু জাহাজে হামলার খবরও পাওয়া গেছে। পাল্টা হামলার শুরু থেকেই ইরানে বাহিনী হরমুজ প্রণালী দখলের নওয়ার চেষ্টা শুরু করে।
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের কমান্ডার–ইন–চিফের উপদেষ্টা ইব্রাহিম জাবারির হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যদি কেউ এই জলপথ পার হওয়ার চেষ্টা করে তাহলে সেই জাহাজগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হবে।
রাশিয়া এবং চীন ছাড়া অন্যান্য দেশের তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ইরান। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা এবং বিভিন্ন প্রান্তে যাওয়া জাহাজগুলো থমকে পড়েছে।
শিপিং ডাটা ট্র্যাক করা ক্লার্কসন্স রিসার্চ এর হিসাবমতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে অলস বসে আছে ৩২০০ জাহাজ, যা বৈশ্বিক জাহাজের প্রায় ৪ শতাংশ। এর মধ্যে ১২৩০টি জাহাজ কেবল উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যেই ঘোরাফেরা করতে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলি দূতাবাসে হামলার হুমকি : লেবাননে অবস্থিত তেহরানের মিশনে ইসরায়েল কোনো হামলা চালালে বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলি মিশনগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করবে ইরান। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র আবুলফজল শেকারচি বলেছেন, ইসরায়েল যদি সেরকম অপরাধ করে, তবে আমরা সারা বিশ্বের সমস্ত ইসরায়েলি দূতাবাসকেও বৈধ লক্ষ্যবস্তু বানাতে বাধ্য হব।
গতকাল ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর আরবিভাষী মুখপাত্র আভিচায় আদ্রায়ি এক সতর্কবার্তায় বলেন, লেবাননে অবস্থানরত ইরানি সন্ত্রাসী শাসনের প্রতিনিধিদের অবিলম্বে এলাকা ত্যাগ করার জন্য সতর্ক করা হচ্ছে। তিনি তাদের সরে যাওয়ার জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছিলেন।












