বিগত পঞ্চাশ বছর থেকেই সৌদি আরব বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য শীর্ষ গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। অভিবাসী শ্রমিকরা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছেন। তাদের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত আয় দেশে ফেরত পাঠানোর মধ্য দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও লেনদেন ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। এছাড়া গ্রামবাংলার আর্থসামাজিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও বেকারত্ব সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের জন্য অভিবাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানেও সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বাংলাদেশি মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশ সৌদি আরবে কর্মরত।
ভিশন ২০৩০–এর অধীনে ‘গ্রিন সৌদি উদ্যোগ’ এবং ‘ফিফা বিশ্বকাপ ২০৩৪’ আয়োজনের মতো মেগা প্রকল্পগুলো সৌদি সরকার গ্রহণ করেছে। যা দেশটির শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের জন্য অধিকতর কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এমনকি নতুন মেগা প্রকল্পগুলোয় শ্রমিক জোগান দেয়ার জন্য সৌদি আরব আগামীতে বাংলাদেশ থেকে আরো কর্মী নিয়োগের আগ্রহ দেখাচ্ছে।
বর্তমানে প্রায় তিন মিলিয়ন বাংলাদেশি সৌদি আরবে কাজ করছেন, যাদের বেশির ভাগই নির্মাণকাজ, পরিচ্ছন্নতা ও গৃহপরিচারিকা বা পরিষেবা খাতে নিয়োজিত। সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকরা সরকারি চ্যানেলের মাধ্যমে বার্ষিক প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠায়। এছাড়া অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে আরো ৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে আসে। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হল যুগের পর যুগ ধরে এই দেশটিতে আমাদের দেশের লোকজন যাচ্ছে তাদের সবচেয়ে নিম্ন বেতনের চাকরিগুলি করার জন্য। ৩.২ মিলিয়ন বাংলাদেশি বসবাস করে এই দেশটিতে যাদের মাঝে দক্ষ জনশক্তি বা পেশাজীবীর উপস্থিতি একেবারেই নগণ্য। অথচ বিগত দশক থেকে সৌদি আরবে দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য তৈরী হয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। যা সঠিকভাবে আমাদের দেশ থেকে পাঠাতে ব্যর্থ হয়েছে একইভাবে অদক্ষ শ্রমিকদের ভিড়ে আমাদের যে দক্ষপেশাজীবী আছে সেটিও সৌদি আরবের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরতে আমরা হয়েছি ব্যর্থ। শুধু এই সৌদি আরবে যদি আমরা আমাদের ইয়ং প্রফেশনালদের কে নিয়ে যথাযথভাবে কান্ট্রি ব্র্যান্ডিং করতে পারি তাহলে বছরে আমাদের রেমিটেন্স বহুগুণে বাড়ানো সম্ভব। আইডি বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, পর্যটন ও স্বাস্থ্যখাতে দক্ষ প্রফেশনালদের জন্য বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে সেদেশে।২০৩০ সালের মধ্যে সৌদি আরব এআই–ভিত্তিক জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। স্মার্ট সিটি প্রকল্প যা আইটি বিশেষজ্ঞদের জন্য বিশাল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
সৌদি আরবও হতে পারে আদর্শ গন্তব্য বাংলাদেশি আইটি পেশাজীবীদের বেশিরভাগই যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ বা কানাডার চাকরিকে সেরা সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সৌদি আরব এখন একটি অন্যতম আইটি হাব হিসেবে গড়ে উঠছে এবং এখানে প্রতিযোগিতা তুলনামূলকভাবে কম।
আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইনের প্রফেশনালরা সৌদি আইটি বাজারে দ্রুত প্রবেশ করছে, এমনকি নিম্ন বেতনে শুরু করেও। কারণ তারা জানে, একবার সুযোগ পেলেই নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করে কয়েক মাসের মধ্যেই ভালো সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব।
অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের প্রতিযোগীদের মূল মন্ত্র হলো; অভিজ্ঞতা, দক্ষতা অর্জন এবং বাজারে দ্রুত প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার গঠন করা। আমাদের পেশাজীবীরা ঠিক এখানেই পিছিয়ে গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলি যেমন বহির্বিশ্বের চাকরির বাজার সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দিচ্ছে না, আমার অন্যভাবে পড়াশোনা শেষ করে ক্যারিয়ার কোথায় হবে কোন দেশের কী কী সুযোগ–সুবিধা আছে সেসব নিয়ে আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের বিস্তারিত জানার আগ্রহ তুলনামূলকভাবে অন্য দেশের ছেলে মেয়েদের চেয়ে কম। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের বিশ্ববিদ্যালয় পড়া অবস্থাতেই ছেলেমেয়েরা যে দেশে ক্যারিয়ার তৈরি করতে চায় সেইসব দেশ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা এবং সেই দেশে নিজ দেশের প্রবাসীদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে প্রয়োজনীয় স্কিল ডেভেলপমেন্টের কাজটিও সম্পন্ন করে ফেলে। এতে পাস করার সাথে সাথে যেমন সেসব দেশে তাদের চাকরির ক্ষেত্রটি থাকে উন্মুক্ত তেমনি দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার পরিকল্পনাতেও তারা থাকে অনেক এগিয়ে। সরকারকে যেমন আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা সম্পর্কে ধারণা নিয়ে স্থানীয় বাজারে প্রচার করতে হবে, একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও সেইসব বাজারের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা সম্পন্ন পেশাজীবী তৈরি করতে হবে। আগামী পাঁচ থেকে দশ বছর কোন কোন দেশে কোন কোন খাতে কী ধরনের চাকরির ক্ষেত্র তৈরি হবে এই বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা প্রদানের সাথে সাথে সেই সব চাকরিতে যোগ্য হিসেবে তৈরি করার জন্য কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে এই দুটি পদক্ষেপ এক সুতোয় গাঁথা। আমাদের দেশের লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়েরা গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করে এই বৈশ্বিক বাজারে নিজেদেরকে সংযুক্ত করতে পারে। আশির দশকের শুরু হওয়া ম্যানপাওয়ার বা আদম ব্যবসার কনসেপ্ট এর ভেতরেই আমাদের সমস্ত পরিকল্পনা ও পলিসি আটকে আছে। সেখান থেকে বের হয়ে আমরা যদি হিউম্যান রিসোর্স নিয়ে পদক্ষেপ না নেই তাহলে দিনশেষে আমরাই হারাবো এই উন্মুক্ত বৈশ্বিক চাকরির বাজারে নিজেদের তুলে ধরার এই সুযোগ। এবং তা করতে হবে এখনই। আগামী ১০ বছর পরে আমাদের জনগোষ্ঠীর যে বয়স হবে তাতে তখন চাইলেও আমরা আর এই সুযোগ নিতে পারব না। শুধু দরকার একটি বাস্তবসম্পন্ন পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন।
বাংলাদেশি আইটি পেশাজীবীদের সৌদি আরব বেছে নেওয়া উচিত। কারণ; উচ্চ বেতন ও করমুক্ত আয়, প্রতিযোগিতামূলক চাকরি, যেখানে দক্ষতা থাকলে দ্রুত উন্নতি সম্ভব, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজের সুযোগ, সৌদি–বাংলাদেশ সংস্কৃতির মিল থাকায় সহজে মানিয়ে নেওয়া যায়। সৌদি আরবের ডিজিটাল রূপান্তর বাংলাদেশি আইটি পেশাজীবীদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করছে। বর্তমানে ইউরোপ বা আমেরিকায় চাকরির প্রতিযোগিতা অনেক বেশি, কিন্তু সৌদি আরব এখনো তরুণ ও দক্ষ জনশক্তির সন্ধান করছে।
বাংলাদেশি আইটি কর্মীরা যদি দক্ষতা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং বাজারের বাস্তবতা বোঝে, তবে সৌদি আরবে উন্নত ক্যারিয়ার গড়ে তোলা সম্ভব। আইটি কর্মীদের পাশাপাশি চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলী, নার্স এবং পর্যটন খাতে বিপুল দক্ষ পেশাজীবীদের সৌদি আরবে চাকরি সুযোগ রয়েছে।
সৌদি শ্রমবাজারের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগগুলো ধরার জন্য জনশক্তি রফতানিতে সরকারকে অভিবাসীবান্ধব কূটনীতির ওপর রাষ্ট্রনীতিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করতে হবে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর মাধ্যমে কম জনশক্তি রফতানি করেও রেমিট্যান্স আয় বেশি উপার্জন করা যেতে পারে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক।











