দক্ষিণ আফ্রিকায় শনাক্ত করোনাভাইরাসের নতুন একটি ধরন নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এরই মধ্যে সীমান্তে কড়াকড়ির পদক্ষেপ নিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাজ্য ও এশিয়ার দেশগুলো। ধরনটিকে ডাকা হচ্ছে বি.১.১.৫২৯ নামে। বলা হচ্ছে, এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসের যত ধরন শনাক্ত হয়েছে তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে বেশিবার জিনের বিন্যাস বদলানো সংস্করণ। গতকাল শুক্রবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অন্য ধরনগুলোর মতো এরও একটি গ্রিক নাম দেবে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিবিসি। ধরনটি এতবার রূপ বদলেছে যে একে ‘ভয়ংকর’ অ্যাখ্যা দিয়েছেন এক বিজ্ঞানী, আরেকজনের মতে তাদের দেখা সবচেয়ে বিপজ্জনক ধরন এই বি ১.১.৫২৯। ধরনটি কত দ্রুত ছড়ায়, টিকার সুরক্ষা এড়িয়ে যেতে পারে কিনা- এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও মেলেনি; ধরনটিতে আক্রান্ত রোগীও এখন পর্যন্ত খুব বেশি শনাক্ত হয়নি। এখন পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার গৌতেং প্রদেশে ৭৭ জনের দেহে এই ধরনটি পাওয়া গেছে; এর বাইরে বতসোয়ানায় যে চারজন ও হংকংয়ে একজনের দেহে এ ধরন শনাক্ত হয়েছে, তারাও মূলত দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে যাওয়া। ধরনটি বেশ দ্রুতগতিতে ছড়ায় বলে প্রাথমিকভাবে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গৌতেংয়ে শনাক্ত কোভিড রোগীদের ৯০ শতাংশের মধ্যেই সম্ভবত এখন এই বি.১.১.৫২৯ পাওয়া যাবে এবং ধরনটি ‘হয়তো দক্ষিণ আফ্রিকার সব প্রদেশেই মিলবে’ বলে অনুমান বিজ্ঞানীদের। খবর বিডিনিউজের।
তবে এটি ডেল্টা ধরনের তুলনায় দ্রুত ছড়ায় কিনা, অন্য ধরনগুলোর তুলনায় বেশি প্রাণঘাতী কিনা, যেসব দেশে টিকাদানের হার অনেক বেশি সেখানে বিস্তার লাভ করতে সক্ষম কিনা- তা এখনও অস্পষ্ট। নতুন এ ধরনটি মোকাবেলায় যুক্তরাজ্য এরই মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা ও এর প্রতিবেশী ৫ দেশ থেকে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত যত ধরন দেখেছেন, তার মধ্যে এই বি.১.১.৫২৯-ই ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’, বলছেন যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানীরা। ধরনটির স্পাইক প্রোটিন উহানে শনাক্ত করোনাভাইরাসের আদিরূপের তুলনায় আলাদা। যে কারণে এটি এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত টিকাগুলোর সুরক্ষাকে পাশ কাটাতে বেশি সক্ষম হতে পারে এবং মহামারী পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে বলে শঙ্কা তাদের। অস্ট্রেলিয়া জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ আফ্রিকায় পাওয়া করোনাভাইরাসের নতুন ধরনের ওপর নজর রাখছে।
ঝুঁকির পরিমাণ বেশি বলে মনে হলে দক্ষিণ আফ্রিকা ও এর আশপাশের দেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় ঢুকতে ইচ্ছুকদের জন্য সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলেও জানিয়েছে তারা। নিউ জিল্যান্ড বলেছে, তারা কোভিডের এই নতুন ধরনের জন্যও প্রস্তুত। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বি.১.১৫২৯ নিয়ে সতর্ক করে রাজ্যগুলোকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ দেশ’ থেকে আগতদের ওপর নজর রাখতে নির্দেশ দিয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লিন বলেছেন, ইইউ’ও ওই অঞ্চল থেকে বিমান চলাচল বন্ধ করার পথে রয়েছে।
বিবিসি জানায়, ফ্রান্সও দক্ষিণ আফ্রিকার কয়েকটি দেশ থেকে ফ্লাইট নিষিদ্ধ করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা, লেসোথো, বতসোয়ানা, জিম্বাবুয়ে, মোজাম্বিক, নামিবিয়া এবং ই’সোয়াতিনির ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে ফ্রান্সও সেই একইরকম পদক্ষেপ নিয়েছে। এই দেশগুলো থেকে ফ্লাইট চলাচলে নিষেধাজ্ঞা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে অন্তত ৪৮ ঘণ্টার জন্য। ফরাসি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এক বিবৃতিতে একথা জানিয়েছে। ওদিকে, ইতালিও গত ১৪ দিন দক্ষিণ আফ্রিকায় ভ্রমণ করা মানুষজনের ইতালিতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। জার্মানি দক্ষিণ আফ্রিকাকে ভাইরাসের ধরন ছড়ানো এলাকা হিসাবে ঘোষণা করতে চলেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা। বাহরাইন এবং ক্রোয়েশিয়াও কিছু দেশ থেকে মানুষের আসা-যাওয়া বন্ধ করার পথে। অন্যদিকে, এশিয়ায় জাপানও এরই মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং আফ্রিকার অন্য আরও ৫ টি দেশ থেকে আসা দর্শণার্থীদের জন্য সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করেছে সিঙ্গাপুরও।
করোনাভাইরাসের সর্বশেষ শনাক্ত হওয়া ধরনটি নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়েছেন বিজ্ঞানীরা। কেউ কেউ বলছেন, এটিই এখন পর্যন্ত দেখা করোনাভাইরাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক ধরন।












