ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই মিলন। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর পবিত্র ঈদ–উল–ফিতর আসে মানুষের জীবনে অনাবিল সুখ, ভালোবাসা ও পারিবারিক বন্ধনের বার্তা নিয়ে। এই আনন্দকে পূর্ণতা দিতে শহর থেকে গ্রামে, কর্মস্থল থেকে শিকড়ে ফিরে যাওয়ার এক আবেগঘন যাত্রা শুরু হয়। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রতি বছর ঈদের আনন্দময় যাত্রা অনেক সময় পরিণত হয় শঙ্কা, ভোগান্তি ও দুর্ঘটনার বেদনাদায়ক বাস্তবতায়।
প্রতিবার ঈদের আগে ও পরে সংবাদপত্রে সড়ক দুর্ঘটনার মর্মান্তিক খবর পাওয়া যায়। কোথাও বাসের সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষ, কোথাও বেপরোয়া গতির কারণে উল্টে যাওয়া গাড়ি, আবার কোথাও অতিরিক্ত যাত্রী বহনের কারণে প্রাণহানি। এসব দুর্ঘটনার পেছনে থাকে অনেকগুলো পরিবারের অশ্রু আর অসহায় কান্না। যে মানুষটি পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে বাড়ির পথে রওনা দিয়েছিলেন, তিনি হয়তো আর ফিরে আসেন না। তার অপেক্ষায় থাকা মা, বাবা, স্ত্রী বা সন্তানদের কাছে তখন ঈদ হয়ে ওঠে এক গভীর শোকের দিন।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের মহাসড়কগুলো– বিশেষ করে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক, চট্টগ্রাম–কক্সবাজার সড়ক কিংবা চট্টগ্রাম–রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি সংযোগ সড়ক– ঈদের সময় অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে প্রায়ই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অনেক সময় দেখা যায়, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, লাইসেন্সবিহীন চালক কিংবা অতিরিক্ত যাত্রী বহনের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এ ধরনের পরিস্থিতি শুধু যাত্রীদের জন্যই নয়, পুরো সড়ক ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এই বাস্তবতা পরিবর্তনের লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে “নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)”। নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশব্যাপী যে সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠেছে, তার অন্যতম সক্রিয় অংশ চট্টগ্রাম মহানগর কমিটি। লক্ষ্য একটাই–সড়কে আর যেন অপ্রয়োজনীয় প্রাণহানি না ঘটে, প্রতিটি মানুষের যাত্রা যেন নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হয়।
ঈদে সড়কে মানুষের চাপ বেড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ায় এই দাবিটি আরও বেশি গুরুত্ব পায়। তাই ঈদযাত্রাকে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
প্রথমত, সড়কে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর নির্মাণসামগ্রী যেন যত্রতত্র ফেলে রাখা না হয়, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। অনেক সময় দেখা যায় সড়কের পাশে বা মাঝখানে বালু, পাথর, রড কিংবা অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী পড়ে থাকার কারণে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ে। ঈদের আগেই এসব বিষয় সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা প্রয়োজন। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে অতিরিক্ত ট্র্যাফিক পুলিশ মোতায়েন, যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করা আবশ্যক। এতে করে যানজট কমার পাশা পাশি যাত্রীরা স্বস্তিতে চলাচল করতে পারবেন।
তৃতীয়ত, ফিটনেসবিহীন ও লাইসেন্সবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। ঈদের সময় অতিরিক্ত চাহিদাকে কেন্দ্র করে অনেক সময় অযোগ্য গাড়ি সড়কে নামানো হয়, যা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নিয়মিত তদারকি ও আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে এসব যানবাহনের চলাচল বন্ধ করা জরুরি।
এ ছাড়া যানবাহনে অতিরিক্ত যাত্রী বহন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অধিক লাভের আশায় অনেক পরিবহন মালিক বা চালক অতিরিক্ত যাত্রী তোলেন, যা যাত্রীদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। এ বিষয়ে পরিবহন মালিক–শ্রমিকদের দায়িত্বশীল আচরণ যেমন জরুরি, তেমনি যাত্রীদেরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
ঈদের সময় ভারী যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। সিমেন্ট, রড, পাথর ও বালুবাহী ট্রাকগুলো মহাসড়কে চলাচল করলে অনেক সময় যানজট সৃষ্টি হয় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। তাই ঈদের কয়েক দিন আগে এসব ভারী যানবাহনের চলাচল সীমিত রাখা হলে সাধারণ যাত্রীবাহী পরিবহনের যাত্রা অনেকটাই স্বস্তিদায়ক হওয়া সম্ভব।
তবে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সচেতনতা। চালক, যাত্রী, পথচারী–সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। ট্র্যাফিক আইন মেনে চলা, বেপরোয়া গতি এড়িয়ে চলা এবং ধৈর্য ধরে গাড়ি চালানো সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ঈদ আনন্দের উৎসব। এই আনন্দ যেন কোনোভাবেই সড়ক দুর্ঘটনার কারণে ম্লান না হয়ে যায়–এটাই আমাদের সবার কামনা। আমরা চাই না আর কোনো মায়ের বুক খালি হোক, কোনো পরিবার হারাক তাদের প্রিয়জনকে।
চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে পুরো বাংলাদেশে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত হোক–এই প্রত্যাশা নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে “নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)”। আসুন, ঈদের এই আনন্দময় সময়ে আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি– সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখব, ট্র্যাফিক আইন মেনে চলব এবং নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে একে অপরকে সহযোগিতা করব। তবেই ঈদের আনন্দযাত্রা হবে সত্যিকার অর্থে নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক এবং আনন্দময়। ‘পথ যেন হয় শান্তির, মৃত্যুর নয়’।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও সাধারণ সম্পাদক, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা), চট্টগ্রাম মহানগর কমিটি।











