ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী ‘ফ্যাক্টর’

রাইসি বিনতি লোপা | শনিবার , ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১১:০৫ পূর্বাহ্ণ

এই লেখার শুরুতেই দুটি উপাত্ত উপস্থাপন করি। নির্বাচন কমিশনের সামপ্রতিক তথ্য অনুযায়ী মোট ভোটারদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি নারী ভোটার, যা দেশের মোট ভোটার পুলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ (মোট ভোটারের ঊনপঞ্চাশ শতাংশ) এবং এবারের নির্বাচনে এই নারী ভোটারদের ভোট প্রদানকে ‘ফ্যাক্টর’ হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে। এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থীর সংখ্যা অনুল্যেখ্যই বলা চলে, মাত্র সাড়ে তিন শতাংশ, যা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নারীর প্রতিনিধিত্ব খুব সীমিত রাখছে বলে বিশ্লেষিত হয়েছে। এবারে আসি মূল আলোচনায়।

জাতিসংঘ এবারের নির্বাচনের প্রাক্কালে এক বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলেছে যে ভোট ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নারীদের নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য অপরিহার্য। এতে সমস্ত নারীর অধিকার, বিশেষ করে প্রতিবন্ধী, সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের নারী এবং লিঙ্গবৈচিত্র্যের মানুষের অংশগ্রহণের প্রতিবন্ধকতা, বৈষম্য ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঝুঁকি মোকাবিলার গুরুত্বে গুরুত্বারোপ করা হয়েছিল।

বিষয়ে জাতিসংঘের ভাষ্য ছিল, নির্বাচনজুড়ে আশঙ্কাজনক সহিংসতা, হয়রানি ও ডিজিটাল হামলা’র ঘটনা নারীদের, তথা নির্বাচনের নারী প্রার্থী এবং নারী ভোটার হিসেবে অংশগ্রহণে প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি অনলাইন বুলিং, ডিপফেইক বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি বিকৃত/যৌন ইঙ্গিতযুক্ত কনটেন্টের বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে । এইসব আশঙ্কার উপর ভিত্তি করে জাতিসংঘ সমস্ত রাজনৈতিক দল ও নেতা এবং সমর্থকদের প্রতি জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে আহ্বান জানিয়েছিল যাতে নারীরা ভয়, হয়রানি বা প্রতিশোধের আশঙ্কা ছাড়াই ভোট দিতে বা প্রার্থী হিসেবে অংশ নিতে পারে।

জাতিসংঘের এই বক্তব্য একদিকে মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকারগুলোর আন্তর্জাতিক মানদন্ডকে পুনরায় সামনে এনেছে। নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে, যেখানে সমসাময়িক রাজনৈতিক উত্তেজনা, ধারাবাহিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগসমূহ চলমান ছিল, সেখানে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান সমসাময়িক গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকারগত দাবির সাথে নিশ্চতভাবেই সঙ্গতিপূর্ণ।

গতপরশু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই লেখাটি যখন লেখা হচ্ছে, তখনো কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোট গণনা চলছে, তখন পর্যন্ত (বার তারিখ দিবাগত রাতের প্রথমার্ধে) খবর পাওয়া গিয়েছিল যে প্রায় ৫২ শতাংশ ভোট দিয়েছিলেন এবং যাদের প্রায় অর্ধেক নারী ভোটার। কিন্তু সত্যিই কী এই বিপুল সংখ্যক নারী ভোটারগণ নির্বাচনের ফলাফলে কোনো গুরুত্ব রেখেছেন?

নির্বাচনী দিনের সকাল থেকে দেশের প্রায় প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে নারী ভোটারদের উপস্থিতি চোখে পড়েছে এবং তারা উৎসাহের সঙ্গেই ভোট দিয়েছেন; অনেকেই বলছেন তারা ভোট দিতে পেরে গর্বিত এবং ভবিষ্যতে দেশের নিরাপত্তা, সুযোগসুবিধা ও উন্নয়ন চাইছেন বলে মন্তব্য করেছেন মিডিয়ার সামনে। কেউ কেউ আবার ভোটকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে শান্তি, নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর করা প্রতিশ্রুতির উপর গুরুত্ব দিয়েছেন এবং এমন পরিবেশে ভোট দিতে পেরে ভবিষ্যতের জন্য আশাবাদী হওয়ার কথাও ব্যক্ত করেছেন। আবার কিছু কিছু কেন্দ্রে নারী পোলিং এজেন্ট হিসেবে কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা, হয়রানি বা অযৌক্তিক নিয়মের অভিযোগ উঠেছে, বিশেষ করে ঢাকার কিছু কেন্দ্রে নারী এজেন্টদের প্রবেশে অসুবিধার বিষয় সংবাদে প্রকাশ পেয়েছে। তৃতীয় লিঙ্গ বা অন্যান্য লিঙ্গ পরিচয়ের নাগরিকরা এখনও ভোটের সময় নির্দিষ্ট সমাজসংস্কৃতিক বাধার সম্মুখীন হয়েছেন/ হচ্ছেন এবং তাঁদের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ উন্নত করার প্রয়োজন ব্যাপকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলেও আলোচনা হচ্ছে। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীর প্রার্থী সংখ্যা খুব কম এবং প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনও পুরুষকেন্দ্রিক হওয়ায় নারীরা খুব কম সংখ্যায় মনোনয়ন পাচ্ছেন, তাই আগামীতে এই বিষয়টির উপর গুরুত্ব আরোপের আশ্বাস দিয়েছে বড় রাজনৈতিক দলগুলো।

সে বিষয়েও নারী ভোটাররা জোরালোভাবে তাদের মতামত ব্যক্ত করেছেন, তারা বলেছেন, এই আশ্বাস যেনো রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের মৌসুম পেরিয়ে গেলেই ভুলে না যান। এবং এটিও প্রতীয়মান হয়েছে যে জাতীয় নির্বাচনে নারী ভোটারদের অংশগহণ অংশগ্রহণ বর্ধিষ্ণু গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে প্রমাণিত ফলে এই শক্তিকেও আমলে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন নারীরা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধহাটহাজারী-বায়েজিদই আমার ঘর
পরবর্তী নিবন্ধনারী-সামাজিক অলংকার নয়, টেকসই অর্থনীতির অপ্রতিরোধ্য চালিকাশক্তি