ত্যাগের মহিমায় ঈদ-আনন্দ

নেছার আহমদ | মঙ্গলবার , ১৭ মার্চ, ২০২৬ at ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ

বাঙালি মুসলমানের জীবনে রমজান মাস নানান তাৎপর্য ও বৈচিত্র্য নিয়ে হাজির হয়। সাহরি, ইফতার সহযোগে এক মাসের সংযম সাধনার মধ্য দিয়ে বস্তুত এ সময় পাল্টে যায় আমাদের চিরচেনা জীবনচিত্র। ইসলাম ধর্মে রোজা বা রমজান বাধ্যতামূলক করা হয় হিজরি দ্বিতীয় বর্ষে। মূলত এর পর থেকেই ইসলামি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে রোজা সারা বিশ্বে পালনের বিষয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের মানুষের কাছে রমজানের গুরুত্ব অনেক।

এক মাস রোজা পালন শেষে শাওয়ালের বাঁকা চাঁদ নিয়ে আসে পরম আনন্দ ও খুশির ঈদ। রোজাদার যে পরিচ্ছন্নতার ও পবিত্রতার সৌকর্য দ্বারা অভিষিক্ত হন, যে আত্মশুদ্ধি, সংযম, ত্যাগতিতিক্ষা, উদারতা, বদান্যতা, মহানুভবতা ও মানবতার গুণাবলী দ্বারা উদ্ভাসিত হন, এর গতিধারায় প্রবাহ অক্ষুণ্ন রাখার শপথ গ্রহণের দিন হিসেবে ঈদুল ফিতর সমাগত হয়। এদিন যে আনন্দধারা প্রবাহিত হয়, তা অফুরন্ত পুণ্য দ্বারা পরিপূর্ণ। নতুন চাঁদ দেখা মাত্র রেডিওটেলিভিশন ও পাড়ামহল্লার মসজিদের মাইকে ঘোষিত হয় খুশির বার্তায় ‘ঈদ মোবারক’। সেই সঙ্গে চারদিকে শোনা যায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত রোজার ঈদের গান

ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ

তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাগিদ….’

ঈদ মানেই আনন্দ ও খুশির উৎসব। উচ্ছলউচ্ছ্বাসে হারিয়ে যাওয়ার মুহূর্ত। ঈদ প্রতিবছর চন্দ্র বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী নির্দিষ্ট মাসের নির্দিষ্ট তারিখে নির্দিষ্ট রীতিতে এক অনন্য আনন্দবৈভব বিলাতে আসে। এক মাস কঠোর সিয়াম সাধনার মাধ্যমে নানা নিয়ম কানুন পালনের পর উদ্‌যাপিত হয় ঈদুল ফিতর, অন্য কথায় রোজার ঈদ। ‘ফিতর’ শব্দের অর্থ ভেঙে দেওয়া। আরেক অর্থে বিজয়। দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখার পর যে উৎসব উদ্‌যাপন করা হয়, তাই ঈদুল ফিতরের উৎসব।

মানুষের বিভিন্ন অনৈতিক, আবেগতাড়িত ও অবিবেচনাপ্রসূত কার্যাবলীর কারণে অনেকের জীবনে গভীর অশান্তি নেমে আসে ঈদ যাত্রায়। মানুষ বাড়িতে যাওয়ার জন্য ঢাকাসহ বড় বড় শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে নাড়ির টানে ছুটতে শুরু করে। আর এই ছোটা নিয়ে শুরু হয় বিভিন্ন ধরনের অদ্ভূত সব কর্মকাণ্ড। অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টিসহ বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপ বেড়ে যায় বহুগুণে। এগুলো দেখলে মনে হয়, রমজানে ক’জন সহীহ শুদ্ধভাবে রোজা পালন করছে। এমনিতেই বহুল জনসংখ্যার দেশে এই যাত্রা একটি বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছায় কারণ সাধারণ অবস্থাতেই আমাদের রাস্তাঘাটে জ্যাম লেগে থাকে। আর ঈদ এলে এই জ্যাম পুরোটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এসব কাজে যারা নিয়োজিত থাকে তারা অনেক সময় ইচ্ছে করেই জ্যাম লাগিয়ে রাখে। মানুষকে কষ্ট দিতে পেরে এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দ তারা উপভোগ করে। যারা রাস্তাঘাট নির্বিঘ্ন করার দায়িত্বে নিয়োজিত তারাও নিজ থেকে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে না, কোন দায়বদ্ধতা নেই , কোন চাপ নেই, নৈতিক কোনো তাড়না নেই যে, তাদের এই পবিত্র দায়িত্ব সততার সাথে পালন করতে হবে। তাই প্রতিবছর আমরা দেখতে পাই যানবাহনের দীর্ঘ লাইন, এই লাইন ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ মাইল কিংবা তারও বেশি। প্রচণ্ড দাবদাহ, প্রকৃতির ডাকে সারা দিতে না পারাসহ বহু পেরেসানির মধ্যে ছটফট করতে থাকে ছোট শিশু ও নারী যারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা, পুরো দিন ও রাত এমনকি ঈদের দিন বিকেলেও অনেকে বাসায় পৌঁছাতে পারে না। এত কষ্ট সহ্য করে যখন বাসায় পৌঁছে, সাথে সাথে চিন্তা কীভাবে আবার কর্মস্থলে আসবেন। এগুলোর জন্য আমরা নিজেদের ভাগ্যকেই দায়ী করি জীবনের একটি অংশ হিসেবে মেনে নিতে হয়েছে। এত ধর্ম কর্ম নিষ্ঠা, নামাজ দোয়া সবকিছু পালন করা সত্ত্বেও আমাদের মাঝে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা পায়নি। কেন? কী জন্য? কী কারণে? অনেকগুলো প্রশ্নের সমাধান হওয়া প্রয়োজন।

সর্বত্র বৃদ্ধি পাচ্ছে অস্থিরতা, ভয়, ভীতি, শঙ্কা ও ভবিষ্যতের প্রতি অনাস্থা। বৃদ্ধি পাচ্ছে শোষণ, নির্যাতন, অন্যায় ও অরাজকতা। মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাস। বৃদ্ধি পাচ্ছে মাদকের ব্যবসা। মানুষ শান্তির অন্বেষায় ব্যাকুল হয়ে পড়েছে। মানুষকে শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারছে না কোন সমাজ, কোন সংগঠন, কোন রাষ্ট্র, এমন কি কোন ধর্ম। সর্বত্রই অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা বিরাজমান।

দারুণ সংকটে কাটছে দিন। উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা সকলের মধ্যে। একের পর এক খুন হচ্ছে মানুষ। পারিবারিক কলহে স্বামীর হাতে স্ত্রী, স্ত্রীর হাতে স্বামী খুনের শিকার হচ্ছেন। ব্যক্তি স্বার্থ আর দ্বন্দ্বে সহোদর, নিকট আত্মীয়, বন্ধু, বান্ধবকেও খুন করা হচ্ছে। রাজনৈতিক কারণ কিংবা সন্ত্রাসী ঘটনারও মানুষ খুন হচ্ছে। প্রতিনিয়তই পত্রিকার পাতা খুললে খুনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের অভাবে পারিবারিক বন্ধন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতার কারণে জীবনে বাড়ছে হতাশা, মানসিক বিষণ্নতা, আর্থিক দৈন্যতা। ফলে সমাজে বেড়েই চলছে অপরাধ। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে শিশু সন্তানেরাও কন্যা সন্তানের উপর পাশবিকতা আইয়ামে জাহেলিয়াতকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। পারিবারিক কলহ, রাজনৈতিক বিরোধ, পরকীয়া, ছিনতাইকারীর আক্রমণ ও পেশাদার অপরাধী গ্রুপের অভ্যন্তরীণ বিরোধে ঘটে চলছে খুনের ঘটনা।

মানুষ চারিত্রিক দিক দিয়ে কলুষতার নিম্নতম পর্যায়ে নেমে গেছে। যেসব গুণাবলী মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করে তার চর্চা এখন নেই বললেই চলে। এখন চলছে সেসব জৈবিক প্রবণতার লালন ও তোষণ যা মানুষকে জানোয়ারে পরিণত করে। যে লজ্জাবোধ সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছে তা এক প্রকার হারিয়ে গেছে। মানুষের এই ক্রমাবনতিকে ত্বরাম্বিত করছে নীতিহীনতা। যেসব রিপুর প্রাবল্যে মানুষকে অমানুষ করে তা ক্রমেই তীক্ষ্ন ও তীব্র হচ্ছে। মানবিক মূল্যবোধ প্রায় বিধ্বস্ত।

ব্যক্তি থেকে প্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠান থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত লক্ষ্য করি দেখা যায় যে, রমজানের সংযম শিক্ষার বিষয়টি সেই অর্থে কোথাও প্রতিফলিত হচ্ছে না।

রমজান মাসে বাহারি ইফতার পার্টি যেন এক প্রকার ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। ইফতার পার্টি এবং শপিং সকাল সন্ধ্যায় মানুষের যে সমাগম তাতেই রমজানের যে মূল শিক্ষা তা নাই বললেই চলে। পবিত্র ঈদে আমরা আমাদের নির্যাতিত নিপীড়িত রক্তাক্ত মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের জন্য আহ্বান জানাব এবং ঈদের আনন্দে যেন যুদ্ধ বিধ্বস্ত জনপথের সকলে শরীক হতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি সহানুভূতিশীল সমাজ গড়তে হলে প্রত্যেককে নিজের হৃদয় জাগ্রত করতে হবে। রমজান সেই জাগরণের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। রমজান শুধু একটি মাস নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সংযম ও মানবিকতার প্রশিক্ষণকাল। রোজা অহংকারকে ভেঙে দেয়, ধনীগরিব, শিক্ষিতঅশিক্ষিত সবাই একইভাবে ক্ষুধার্ত হয়। এ সমতা মানুষকে বিনয়ী করে। রমজান শেষে ঈদের আনন্দে, যদি আমরা শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করি তবে সমাজে ঘৃণার বদলে ভালোবাসা, সহমর্মিতা তৈরি হবে। আসুন রমজানের শিক্ষাকে শুধু রীতি হিসেবে গ্রহণ না করে মানবিক বিপ্লবের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি। তবেই গড়ে উঠবে একটি সহানুভূতিশীল, দায়িত্বশীল ও মানবিক সমাজ।

লেখক: প্রাবন্ধিক, সম্পাদকশিল্পশৈলী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঈদের ছুটিতে গ্রামে শিশুদের সুরক্ষা প্রসঙ্গে
পরবর্তী নিবন্ধ‘যে সমাজে পরমতসহিষ্ণুতার চর্চা যতো বেশি, সে সমাজে অপরাধপ্রবণতা ততো কম’