তোমাকেই খুঁজি বাবা

শর্মিষ্ঠা চৌধুরী | বুধবার , ২১ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ

আজ বারো বছর তোমাকে দেখিনা বাবা। আমার নাম ধরে ডাকোনা কত সহস্র দিন! যে মেয়েটা সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত বাবাকে খুঁজতো, বাবার সাথে দেখা না হলে অস্থির হয়ে যেতো সেই মেয়েটা আজ দিব্যি আছে বাবাকে ছাড়া। তোমাকে ঘিরেই ছিলো আমার সকাল,বিকেল, সন্ধ্যে একটা অদ্ভুত সুন্দর জগৎ। সেই জগতে তুমি থাকবেনা সেটা হতে পারেনা, এরকম একটা বদ্ধমূল ধারণা নিয়ে জীবনটা বেশ কেটেই যাচ্ছিলো,তাহলে কেন আমাকে মেনে নিতে হলো বাবারা ও একদিন হারিয়ে যায়, হারিয়ে যেতে হয়!

ছোটবেলা থেকে তোমাতেই ছিলো আমার মুগ্ধতা তোমাকে নিয়ে আমি প্রতিদিন স্বপ্ন দেখতাম। কি যে সুন্দর ছিলো সেই স্বপ্নগুলো! তোমার হাত ধরে আমার স্কুলে যাওয়া, বাবা মেয়ের ঘুরে বেড়ানো, মায়ের কাছ থেকে লুকিয়ে তোমার কাছে আমার আবদার মেটানো, খাবার পছন্দ না হলে পছন্দের খাবার এনে আমাকে খুশী করতে, কেনাকাটা করবো মার্কেটে যেতে হবে সেখানেও তোমাকে চাই। প্রচন্ড ঠান্ডা তাই মশারী না টানিয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম, সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি আমি মশারীর ভেতর। জানতে চাইলে মায়ের ধমক এসব করে করেই তো তোর বাবা তোকে নষ্ট করেছে,প্রশ্রয় দিয়ে দিয়ে মাথায় তুলেছে।আমি হাসতাম, মাঝে মাঝে রাগও করতাম। তুমি মুচকি হেসে ইশারায় বলতে চুপ থাক, কিছু বলিস না, মায়েরা অনেক কিছুই বলে।আমিও বাধ্য মেয়ের মতন চুপ করে যেতাম! তোমার মেয়ে নষ্ট হয়নি বাবা, তোমার প্রশ্রয় আমাকে শক্তি দিয়েছে, মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে শিখিয়েছে। শুধু তোমার না থাকার যন্ত্রণা, তোমার অভাব আমি আজও মেনে নিতে পারিনি।

আমার স্বপ্নগুলো কিভাবে যেন আগুনে চাপা পড়লো! তবে সেই স্বপ্ন আমি আজও দেখি একটু অন্যভাবে, এই স্বপ্ন দেখেই আমি প্রতিদিন বাঁচি! তুমি যেদিন আগুনের ফুলকির ভেতর হারিয়ে গেলে সেদিন থেকে আমার স্বপ্নও পাল্টে গেলো। সেই স্বপ্নে কোন আনন্দ নেই,কেবল কষ্ট আর দীর্ঘশ্বাস। সমস্ত স্মৃতিগুলো কেবল ভীড় করে এলোমেলো স্বপ্নের ভেতর। তোমাকে ফিরে পাওয়ার আহাজারি, একটু বাবা ডাকার তৃষ্ণা। আমার অসম্ভব মন খারাপে তোমার সাথে অনেক কথা বলি,তুমি কি শুনতে পাও বাবা? মনে মনে কতবার যে বাবা বলে ডাকি তুমি সাড়া দাওনা কেন বাবা! অনেকবার মনে হয়েছে তুমি আমায় ডাকছো,পরক্ষণে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই, কেন আমায় ডাকোনা বাবা! ছোটবেলার দিনগুলো ফিরে পেতে ইচ্ছে করে,তোমাকে ভীষণভাবে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে, তোমার শরীরের মিষ্টি গন্ধ নিতে ইচ্ছে করে! কেন যে আরও বেশী করে তোমাকে আগলে রাখলাম না,তোমাকে জড়িয়ে ধরলাম না, তোমার সাথে গল্প করলাম না! তোমার কথাগুলো কেন আরও মনোযোগ দিয়ে শুনলাম না! তুমিও আমাকে অনেক কিছু বলতে চেয়েছিলে কিন্তু আমার শোনা হলোনা নাকি আমার শোনার সময় ছিলোনা জানিনা! হয়তো পরে শুনবো বলে জমিয়ে রেখেছিলাম, সেই শোনা আর হলো না বাবা! বুঝতেও পারিনি এভাবে হারিয়ে যাবে তুমি! তোমার দিকে ভীষণভাবে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে বাবা। এত সুন্দর মায়াভরা চেহারাটা আর কোনদিন দেখতে পাবোনা, কেন এমন হয় বাবা! একবার চলে গেলে সে যাওয়াটাই কেন শেষ যাওয়া হতে হবে! আর একটা সুযোগ যদি দেয়া হতো তোমাকে ফিরে পাওয়ার, তাহলে সমস্ত ভুলগুলো শুধরে নিতাম, বুকে জমানো না বলা কথাগুলো তোমাকে শোনাতাম। তোমাকে ছাড়া আমার জীবনটা কেমন যেন এলোমেলো মনে হয়। এক জীবনে সব স্বপ্নতো তো আর পূরণ হয়না তাই আমি কেবল আরেকটা জীবনের অপেক্ষায় থাকি!

আহা! বারো বছর তোমার সাথে দেখা হয় না, কিন্তু প্রতিটা ক্ষণ, প্রতিটা মুহূর্তে তুমি আমার সাথেই আছো, আমার পাশে আছো, আমাকে ছুঁয়ে আছো বাবা, তোমার স্পর্শ আমি অনুভব করি। তোমার আদর আর ভালোবাসার নির্যাসটুকু নিয়ে আমি ভালো আছি বাবা। তুমিও ভালো থেকো অন্য কোন গ্রহে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধতরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট
পরবর্তী নিবন্ধদূরের টানে বাহির পানে