ইসরায়েলের ধারাবাহিক বিমান হামলায় নিহত ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের জানাজায় গতকাল তেহরানে নজিরবিহীন জনসমাগম দেখা গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক জনসমুদ্রে পরিণত হয়, যেখানে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত অংশ নেন। চলমান সংঘাতের মধ্যে এই জানাজা ইরানের রাজনৈতিক প্রতিরোধ ও জনসমর্থনের এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধান আলী লারিজানি, বাসিজ বাহিনীর প্রধান গোলামরেজা সোলেইমানি, গোয়েন্দা বিষয়ক মন্ত্রী ইসমাইল খতিব এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের উপ–প্রধান আলীরেজা বায়েত। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, এসব জানাজায় সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সামরিক নেতৃত্ব এবং বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ অংশ নেন।
ইসরায়েল দাবি করেছে, গত সোমবার দিবাগত রাতে তেহরানে বিমান হামলায় লারিজানি, তার ছেলে মোর্তেজা ও নিরাপত্তা টিমসহ নিহত হন। একই রাতে পৃথক হামলায় সোলেইমানিও নিহত হন। পরে ইরান সরকার এসব মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে। গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খতিবের নিহত হওয়ার বিষয়ে প্রথমে অনিশ্চয়তা থাকলেও পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তা নিশ্চিত করেন। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এক শোকবার্তায় বলেন, এই কাপুরুষোচিত হত্যাকাণ্ড আমাদের গভীর শোকে নিমজ্জিত করেছে। তিনি নিহতদের পরিবার ও জাতির প্রতি সমবেদনা জানান।
এদিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সমন্বয়ে ইরানের যেকোনো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে টার্গেট করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ইরান কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। এসব হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দুর্বল করতে পারবে না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ একাধিক শীর্ষ নেতা নিহত হন, যা এই সংকটকে নতুন মাত্রা দেয়। গত ৪ মার্চ শ্রীলঙ্কার উপকূলে মার্কিন নৌবাহিনীর টর্পেডো হামলায় ইরানের সামরিক জাহাজ ‘দেনা’ ধ্বংস হয়, যাতে অন্তত ৮৪ জন নৌসেনা নিহত হন। এই ঘটনাও সামপ্রতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে।
গতকাল জানাজার দিনই ইরান পাল্টা সামরিক প্রতিক্রিয়া জোরদার করে। তেল আবিবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত দুইজন নিহত হয় এবং আহত হয় বেশ কয়েকজন। ইরান দাবি করেছে, তারা ইসরায়েলের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এসব কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে হাদেরার ওরত রাবিন, আশকেলনের রুটেনবার্গ, ইয়কনেয়ামের হাগিত, আশদোদের এশকোল এবং কিরিয়াত মালাখির হারুভিত প্ল্যান্ট–যেগুলো দেশটির বিদ্যুতের বড় অংশ সরবরাহ করে। ইসরায়েলি সূত্রের দাবি, ইরান ক্লাস্টার ওয়ারহেড ব্যবহার করছে, যা মাঝ আকাশে ভেঙে বিস্তৃত এলাকায় ক্ষতি ছড়ায় এবং প্রতিরোধ করা কঠিন। তেল আবিবের কাছে বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে তিনটি ব্যক্তিগত বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি বিমানে আগুন ধরে যায় বলেও জানানো হয়েছে।
সংঘাতের প্রভাবে আঞ্চলিক সামরিক পরিস্থিতিও জটিল হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের চারটি সামরিক উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। কুয়েতে ভুলবশত তিনটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয় এবং পরে ইরাকে একটি রিফুয়েলিং বিমান বিধ্বস্ত হয়, যদিও এর কারণ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে।
জ্বালানি খাতেও এর বড় প্রভাব পড়েছে। দক্ষিণ ইরানের বুশেহর প্রদেশে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্র–এ ইসরায়েলি হামলায় একটি পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় আগুন লাগে। যদিও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে, হতাহতের তথ্য এখনো নিশ্চিত নয়। এই হামলার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। কাতার সতর্ক করে বলেছে, জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হতে পারে। পাল্টা হিসেবে ইরানের আইআরজিসি ঘোষণা দিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনাগুলো এখন বৈধ লক্ষ্যবস্তু। সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নাম উল্লেখ করে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে সামরেফ শোধনাগার, আল–জুবাইল পেট্রোকেমিকেল কমপ্লেক্স, মাসাইদ হোল্ডিং কোম্পানি, আল–হোসন গ্যাসক্ষেত্র ও রাস লাফান শোধনাগারের কথা বলা হয়েছে। বিবৃতিতে আইআরজিসি জ্বালানি স্থাপনাগুলোর সকল নাগরিক ও শ্রমিকদের অবিলম্বে ওই সব এলাকা ছাড়ার কথা বলেছে। এছাড়া ইরান থেকে ইরাকে গ্যাস রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে, যা ইরাকের বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৪১ জন আহত হয়েছে বলে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। সব মিলিয়ে, শীর্ষ নেতৃত্বের মৃত্যু, পাল্টা হামলা, জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর আঘাত এবং আঞ্চলিক বিস্তার, সবকিছু মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত আরও জটিল ও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। তবে তেহরানের গতকালের বিশাল জানাজা প্রমাণ করেছে, এই সংকটের মধ্যেও অভ্যন্তরীণ সংহতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে ইরান।










