তিস্তার সংকট সমাধানে দেশীয় বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিশন গঠন করা প্রয়োজন

রেজাউল করিম স্বপন | মঙ্গলবার , ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর অন্যতম হলো তিস্তার পানি বণ্টন। স্বাধীনতার পর থেকে এই পানি বণ্টন নিয়ে চলেছে রাজনীতি আর আলোচনা এরপরও কোনও সুরাহা হয়নি গত ৫৪ বছরে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো ভারতের নেতিবাচক মনোভাব। রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে ভিন্নমত এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পিছনে সবচেয়ে বড় বাধা। বাংলাদেশের বিগত সরকারগুলো এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নানামুখী চেষ্টা করে গেছে তবুও ভারতের একগুয়েমির কারণে সফল হতে পারে নাই। যদিও চীন বেশ কয়েক বছর ধরে এ প্রকল্পে আগ্রহ প্রকাশ করছে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা (Comprehensive Management and Restoration of Teesta River Project) মূলত চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় তিস্তা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নাব্যতা বৃদ্ধি এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধার জন্য একটি বৃহৎ প্রকল্প। এর মাধ্যমে প্রায় ১৭১ বর্গ কিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার এবং নদীর গভীরতা ৫১০ মিটার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর লক্ষ্য হলো১। নদী ড্রেজিং, ভাঙন রোধ এবং পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা। ২। ভারত কর্তৃক পানি প্রত্যাহার সত্ত্বেও শুষ্ক মৌসুমে প্রয়োজনীয় পানি পাওয়ার উপায় বের করা। ৩। নদী খনন করে উদ্ধারকৃত ১৭১ বর্গ কিঃমিঃ জমিতে উন্নয়ন বা জনবসতি স্থাপন করা, ৪। চীনা অর্থায়নে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের খরচ এবং এর ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বের করা। ৫। নদীর প্রকৃতি বদলে ফেলার সুদূরপ্রসারী পরিবেশগত প্রভাব বা নেতিবাচক দিক হতে দেশের উত্তরাঞ্চলকে রক্ষা করা। ৬। নদী শাসন ও সংস্কারের ফলে ভিটেমাটি হারানো মানুষের পুনর্বাসন করা ও ৭। চীন ও ভারতের মধ্যকার ভূরাজনৈতিক সমীকরণে তিস্তা প্রকল্পের প্রভাব, বিশেষ করে ভারতের আপত্তি নিরসন করা।

তবে বাংলাদেশের নদনদীর পরিস্থিতি চীনের নদনদী থেকে ভিন্ন। ফলে বাঁধ নির্মাণে চীনের প্রযুক্তিগত বিপুল সামর্থ্য থাকলেও বাংলাদেশের নদনদী ব্যবস্থাপনায় তাদের পারদর্শিতা যে উপযোগী হবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। তবে ভারত কর্তৃক তিস্তাপ্রবাহের ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন ও প্রবাহ অপসারণ এবং দেশের ভেতরে অনুসৃত বিভিন্ন অনুপযোগী নীতি অনুসরণের ফলে তিস্তা নদী এক গভীর সংকটে নিপতিত। এতে শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব, বর্ষাকালের বন্যা, অসময়ে হঠাৎ বন্যা, প্রকট নদী ভাঙন ইত্যাদি সমস্যা দ্বারা তিস্তাপারের প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন আজ জর্জরিত। তাই তিস্তা সমস্যার আশু সমাধান অত্যন্ত জরুরি। তিস্তা সংকট সমাধানের দাবিতে ২০০৭ সালে ‘তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন’ গঠিত হয় এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্কের (বেন) সহযোগিতায় প্রায় ২০ বছর ধরে এই সংকট সমাধানের দাবিতে নিরলস প্রয়াস পরিচালিত হচ্ছে।

বিগত সরকার ভারতের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে তিস্তা সংকটের সুরাহা করতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০১৬ সালে চীনের ‘পাওয়ার চায়না’ নামের কোম্পানি কর্তৃক প্রস্তাবিত একটি পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হয়। তখন ভারত নিজে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। এতে বিষয়টি নিয়ে সরকার সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে এবং চীন রুষ্ট হয়। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার চীনের সহযোগিতায় ‘পাওয়ার চায়না’ প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রহী হয়েছে এবং সেই ধারায় অগ্রসর হচ্ছে। পাওয়ার চায়না প্রকল্পের মাধ্যমে যদি তিস্তা সংকটের সমাধান হয়, তাহলে সেটি আনন্দের বিষয় হবে। কিন্তু চীনের দ্বারা প্রস্তাবিত এবং বাস্তবায়িত হলেই যে একটি প্রকল্প সফল হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। প্রকল্পটি প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বাজেটের যথেষ্ট বড় একটি ব্যয়বহুল প্রকল্প। চীনের মিনশেং ব্যাংকের কাছ থেকে চড়া বাণিজ্যিক সুদহারের ভিত্তিতে পাওয়া ঋণ দিয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা। প্রকল্প সফল হোক বা না হোক, সুদআসল মিলিয়ে এই ঋণ বাংলাদেশের জনগণকে পরিশোধ করতে হবে। তার উপর এই প্রকল্প সফল না হলে তিস্তার সংকট আরো গভীর হবে, তিস্তাপারের জনগণ আরো হতাশায় নিমজ্জিত হবে। তাই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা প্রয়োজন।

১। তিস্তার প্রস্থ যদি বর্তমানের একচতুর্থাংশ করা হয় এবং গভীরতার যদি তেমন বৃদ্ধি না ঘটে, তাহলে প্রস্থচ্ছেদের যে হ্রাস ঘটবে, তার দ্বারা তিস্তা কীভাবে বর্ষাকালে বা হঠাৎ বন্যার বিপুল প্রবাহ ধারণ করবে? ২। প্রায় তিন মাইল পরপর স্থাপিত গ্রোয়েনগুলো কীভাবে তিস্তার বর্ষাকালীন বিপুল প্রবাহকে সংকুচিত খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে সক্ষম হবে?

৩। ভারত থেকে প্রাপ্ত তিস্তার প্রবাহ যদি বৃদ্ধি না করা যায়, তাহলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের তিস্তাতে পানির পরিমাণ কীভাবে বৃদ্ধি পাবে? ৪। তিস্তার প্রস্থচ্ছেদ যদি হ্রাস পায়, তাহলে তিস্তা প্রবাহের গতিবেগ বৃদ্ধির কারণে যে অতিরিক্ত পাড়ভাঙন দেখা দেবে, তা কীভাবে এড়ানো সম্ভব হবে? ৫। তিস্তার বর্ষাকালীন প্রবাহ যদি সংকুচিত নদী খাতে ধারণ করা সম্ভব না হয় এবং তা কূল উপচে পড়ে, তাহলে তিস্তাগর্ভ থেকে উদ্ধার করা জমিতে শিল্প স্থাপন, নগরায়ণ, আবাসন স্থাপন ইত্যাদি কীভাবে সম্ভব হবে? ৬। তিস্তার শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহ যদি বৃদ্ধি না করা যায়,তাহলে এই নদীর নাব্যতা রক্ষা করা কীভাবে সম্ভব হবে এবং সে ক্ষেত্রে এতগুলো টার্মিনাল ও জেটি নির্মাণ করে কী লাভ হবে? ৭। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নদী খাত পরিবর্তনের মাধ্যমেই তিস্তার সমস্যা সমাধান করে ফেলা সম্ভব, এমন একটি ধারণা সৃষ্টি করে পাওয়ার চায়নার প্রকল্প কি ভারতের কাছ থেকে তিস্তার ন্যায্য হিস্যার দাবি এবং তা আদায়ের সংগ্রামকে দুর্বল করে দেবে না?

কোনো প্রকল্প মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন সেই প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্য। দুঃখজনক হলো বিগত সরকার তিস্তাবিষয়ক পাওয়ার চায়নার প্রকল্প নিয়ে অত্যন্ত গোপনীয়তা অবলম্বন করেছিল এবং এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা, সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) প্রকাশ করেনি। এমনকি এই প্রকল্পের পিডিপিপিও (উন্নয়ন প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তাবনা) প্রকাশ করেনি। কিন্তু জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে বাপা ও বেন এই প্রকল্পের তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করে এবং প্রকল্পের পিডিপিপি এবং আরো কিছু তথ্য পায়। এছাড়া পাওয়ার চায়না তিস্তাবিষয়ক প্রকল্প নিয়ে একটি ভিডিও তৈরি করে ইউটিউবের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী প্রচার করে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে বাপাবেনের গবেষকেরা এই প্রকল্প পরিবীক্ষণ করেন এবং তার ভিত্তিতে ২০২০২৩ মেয়াদে প্রকাশিত একাধিক পুস্তক ও প্রবন্ধে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করে। পরবর্তীতে জানা যায়, পাওয়ার চায়না তাদের প্রকল্পের ২০১৯ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সংশোধন করেছে এবং ২০২৩ সালে তা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে। অতি সমপ্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে এই সমীক্ষা সীমিত পরিসরে পেয়ে বাপা ও বেনের গবেষকেরা পুনরায় প্রকল্পটি মূল্যায়ন করেন এবং ‘সংকটে তিস্তা নদীসমাধানের পথ কী’ শীর্ষক পুস্তকে তা সবার কাছে পরিবেশন করেন।

এই মূল্যায়ন থেকে দেখা যায়, সংশোধন সত্ত্বেও পাওয়ার চায়নার তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ইতিপূর্বে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর নিরসন হয়নি বরং আরো কিছু নতুন প্রশ্নের উদ্ভব ঘটেছে।

পাওয়ার চায়নার প্রকল্পটি হলো নদনদীর প্রতি বেষ্টনীপন্থাভিত্তিক একটি প্রকল্প, যাতে বাংলাদেশে তিস্তার পূর্ণ দৈর্ঘ্যজুড়ে দুই পাশে মোট ২০৪ কিঃমিঃ বাঁধ নির্মিত হবে। কিন্তু দেশীয় বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিস্তা সংকট সমাধানের মূল সূত্রটি নিহিত বর্ষাকালীন প্রবাহকে যতটা সম্ভব তিস্তার বিস্তীর্ণ অববাহিকার ভূপৃষ্ঠের (শাখা ও উপনদী, খাল, বিল, নালা, দিঘি, হাওর, বাঁওড়, পুকুর ইত্যাদি) এবং ভূগর্ভের জলাধারে সঞ্চিত করা।

সে জন্য প্রয়োজন উন্মুক্ত পন্থা। অর্থাৎ তিস্তার বর্ষাকালীন প্রবাহকে তিস্তা অববাহিকায় অবারিতভাবে বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া, সব শাখা ও উপনদীর সঙ্গে তিস্তার সংযোগের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং তিস্তা অববাহিকার সব জলাধারের সংস্কার করা। এতে একদিকে প্লাবনের উচ্চতা সহনীয় সীমার মধ্যে থাকবে, প্লাবনভূমিতে পলিপতন বাড়বে। অন্যদিকে নদী খাতে পলিপতন কম হবে, নদীর গভীরতা বজায় থাকবে। বর্ষার পানি ধারণের জন্য নদীর পাড় ভাঙনের চাপ হ্রাস পাবে। ফলে নদীর প্রস্থ প্রাকৃতিক নিয়মেই হ্রাস পাবে এবং নদীর সুস্থতা অনেকাংশে ফিরে আসবে। প্রাকৃতিক এই প্রক্রিয়ায় নদীর পাড় স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে জিও ব্যাগ ব্যবহার করতে হবে। নদীর তীরের বিদ্যমান স্থিতিশীল বিন্দুগুলো ধরে প্রথমে নদীতীরকে স্থিতিশীল করতে হবে এবং তারপর ক্রমে নদীর নিজস্ব আচরণ বিবেচনায় নিয়ে জিও ব্যাগপ্রযুক্তির যোগমূলক বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে নদীতীরকে আরো ভেতরের দিকে অগ্রসর করতে হবে। তাই তিস্তা নদীর সংকট সমাধানের পথ নিরূপণের জন্য দেশীয় বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি তিস্তা নদী কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। এই কমিশন পাওয়ার চায়নার তিস্তা প্রকল্পের পর্যালোচনা করবে ও সময় সময় প্রকল্পটি নিয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত দিয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনাটিকে আরো বেশি যুগোপযোগী ও সাসটেইনেবল করে তুলবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধফারহানা ইসলাম রুহীর উপন্যাস ‘ধুলো পড়া ডায়েরিতে’ অপার জীবনবোধ
পরবর্তী নিবন্ধভেনেজুয়েলা গ্রীনল্যান্ড ও একাত্তরের বাংলাদেশ : অপরিবর্তিত মার্কিন নীতি ও আমাদের রাজনীতির পরম্পরা