তিন গ্রামের বসতবাড়ির দেওয়াল ও পিলারে ফাটল

হারবাং ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের প্রভাব ফসলি জমিও ক্ষতিগ্রস্ত

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া | শনিবার , ৪ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:১৭ পূর্বাহ্ণ

কক্সবাজারের চকরিয়ার উত্তর হারবায়ের তিন গ্রামের অনেক (পাকা ও মাটির ঘর) বসতবাড়ির দেওয়াল ও পিলারে ফাটল দেখা দিয়েছে। এমনকি শত শত একর ফসলি জমিতেও ব্যাপক ভূমিধস দেখা দিয়েছে। এই অবস্থায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় একাধিক পরিবারের লোকজন ঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে।

এ বিষয়ে একাধিক ভুক্তভোগী পরিবারের লোকজন দৈনিক আজাদীকে জানানগত দুইমাস ধরে উত্তর হারবায়ের ইছাছড়ি, ভাণ্ডারির ঢেবা, কোরবানিয়া ঘোনা গ্রামের ওপর দিয়ে প্রবহমান হারবাং ছড়া থেকে অবৈধভাবে শক্তিশালী ড্রেজার ও শ্যালোমেশিন বসিয়ে উত্তোলন করা হচ্ছে ভূগর্ভের বালু। দিনরাত সমানে এই পন্থায় অবৈধভাবে ভূগর্ভের বালু তোলার জন্য ব্যবহৃত যন্ত্রের আওয়াজের বিকট শব্দে একদিকে ঘুম হারাম হয়েছে। অপরদিকে ছড়ার তলদেশের অন্তত ১০০১৫০ ফুট গভীর থেকে বালু তুলে ফেলার কারণে বিশাল বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়ে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।

দেওয়াল ও পিলারে ফাটল দেখা দেওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী পরিবারের লোকজন। তারা বলছেনগত দুইমাস ধরে প্রকাশ্যে বালুদস্যুরা অন্তত ১০ স্থান থেকে অবৈধভাবে শক্তিশালী ড্রেজার ও শ্যালোমেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করছে।

সরজমিন দেখা গেছেউত্তর হারবাংয়ের ইছাছড়ি, ভাণ্ডারির ডেবা, কোরবানিয়া ঘোনা ও আশপাশের ছড়াখাল এলাকায় শক্তিশালী শ্যালোমেশিন ও ড্রেজার ব্যবহার করে বালি উত্তোলন করায় ছড়াখালের তলদেশ অস্বাভাবিকভাবে গভীর করে ফেলা হয়েছে। এমনকি ৫০৬০ ফুট প্রস্তের প্রাকৃতিক এই ছড়াখাল বর্তমানে কোনো কোনো স্থানে ২০০ ফুট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে।

ভুক্তভোগী পরিবারের বেশ কয়েকজন ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক আজাদীকে বলেন, একাধিক বালুদস্যু সিন্ডিকেট পরিবেশবিধ্বংসী এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে। তারা এলাকায় এমনভাবে প্রভাবশালী যে, তাদের বিরুদ্ধে কারোরই মুখ খোলার সাহস নেই। মূলত তারা সশস্ত্র সন্ত্রাসীদ্বারা পাহারা বসিয়েই দিনরাত সমানে নির্বিঘ্নে এই পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে উত্তর হারবাংয়ে।

যার কারণে পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা বা উপজেলা প্রশাসন, এমনকি আইনশৃক্সখলা বাহিনীও সেখানে অভিযান চালানোর আগে কয়েকবার চিন্তা করে। যদি প্রাণ নিয়ে ফেরত আসতে না পারেন, এই আশঙ্কায়। এতে দীর্ঘ দুইমাস ধরে নির্বিঘ্নে এই পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে এসব বালুদস্যু সিন্ডিকেট।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শক্তিশালী ড্রেজার ও শ্যালোমেশিনে অবৈধ পন্থায় বালু তোলা ছাড়াও হারবাং ছড়ার দুই তীর কেটে ও ফসলি জমি ধ্বংস করে অব্যাহত বালু উত্তোলনের কারণে শত শত একর ফসল উৎপাদনের জমিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে কৃষক পরিবার এবং কৃষি শ্রমিকেরা জীবিকা হারানোর শঙ্কায় পড়েছেন। পাশাপাশি বসতবাড়িগুলোও মারাত্মক ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছেবালুদস্যু সিন্ডিকেগুলোর পরিবেশবিধ্বংসী এই কর্মকাণ্ডের কারণে গ্রামীণ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্রতিদিন শত শত ট্রাকডাম্পারে বালু পরিবহনের কারণে সেখানে ধুলোময় পরিবেশে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে ওঠেছে। এই অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে যারাই সোচ্চার বা প্রতিবাদ করেছেন তাদেরকে শারীরিকভাবে মারধর করাসহ এলাকা ছাড়া করা হয়েছে। এতে এলাকায় নিজ বাড়িতে বসবাস করতে সমস্যা হবে ভয়ে অনেকে প্রকাশ্যে মুখ খোলারও সাহস করেন না।

স্থানীয় পরিবেশ সচেতন একাধিক ব্যক্তি বলছেনঅবৈধ পন্থায় বালু তোলার কারণে ছড়াখালের তলদেশ যেভাবে গভীর ও প্রশস্ত হয়ে পড়েছে তা ভারি বৃষ্টিপাত শুরু হলেই উত্তর হারবাংয়ের উপরোক্ত একাধিক গ্রামও বিরানভূমিতে পরিণত হবে। ওই এলাকায় ফসলি জমিতে ব্যাপক ধস নেমে আসবে।

উত্তর হারবাং সাংগঠনিক ইউনিয়ন বিএনপির সদস্যসচিব জাহাঙ্গীর আলম তার এলাকায় পরিবেশবিধ্বংসী এসব কর্মকাণ্ড চলমান থাকার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেনঅবৈধ পন্থায় বালু তোলার কারণে কয়েক ধরণের সমস্যা দেখা দিয়েছে কয়েকটি গ্রামে। তন্মধ্যে রয়েছেপাকা ও মাটির ঘরের দেওয়াল ও পিলারে ফাটল দেখা দিয়েছে। ভূমিধসের মতো পরিস্থিতি হয়েছে শত শত একর ফসলি জমিতে। আবার অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু পরিবহনের কারণে গ্রামীণ সড়কগুলো একেবারে চলাচল অনুপযোগী এবং পুরো এলাকায় ধুলোময় পরিবেশে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে গেছে। কৃষক পরিবার ও কৃষিশ্রমিকেরা জীবিকা হারানোর শঙ্কায় ভুগছেন প্রতিনিয়ত। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, হারবাং ছড়া থেকে বালু তোলা অব্যাহত থাকলে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ বন্যা ও ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়ে যাবে। একইসঙ্গে জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব শুরু হয়েছে এলাকায়।

অবৈধভাবে বালু তোলার কারণে অন্যতম ভুক্তভোগী উত্তর হারবাংয়ের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কোরবানিয়া ঘোনার বাসিন্দা প্রবাসী এনামুল হক আবেগতাড়িত হয়ে দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘জীবিকার তাগিদে আমরা তিন ভাই সুদূর প্রবাসে থাকি। প্রবাসে থেকেই ছড়ার কয়েকশ ফুট দূরে থাকা আমাদের পৈত্রিক জায়গায় একতলা বাড়ি নির্মাণ করি। কিন্তু গত দুইমাস ধরে অবৈধভাবে বালু তোলার কারণে অনেক কষ্টে গড়ে তোলা স্বপ্নের বাড়িটির দেওয়াল ও পিলারে ভয়াবহ ফাটল দেখা দিয়েছে।’

প্রবাসী এনামুল হক কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, এই অবস্থায় আমি দেশে চলে আসি এবং পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় বালুদস্যুরা আমাকে হুমকি দিয়ে বলেছে যে, এই বিষয়ে কোথাও মুখ খুললে পুরো বসতবাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়ে সমুদয় জায়গাসহ দখলে নেওয়ার। এই অবস্থায় বসতবাড়িতে চরম ঝুঁকিতে বসবাস করা ছাড়াও বালুদস্যুসন্ত্রাসীদের হুমকির মুখে ভীতসন্ত্রস্থ অবস্থায় রয়েছি।

স্থানীয় কয়েকজন জানানপরিবেশবিধ্বংসী এসব কর্মকাণ্ডের সচিত্র প্রতিবেদন সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর উপজেলা প্রশাসনের একটি দল বিচ্ছিন্ন অভিযান চালিয়ে একটি শ্যালোমেশিন জব্দ করে। কিন্তু তারা চলে যাওয়ার পর আবারও একই কায়দায় শুরু হয় পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড। তাই বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, বালুদস্যুদের এসব কর্মকাণ্ড স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হলে পরিকল্পিতভাবে সাঁড়াশি অভিযান চালানোসহ জড়িতদের তালিকা করে কঠোর আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণসহ তাদেরকে গ্রেপ্তার না করলে তাদের রোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

চকরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রুপায়ন দেব বলেন, ছড়াখালে অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের বিষয়টি তাদের নজরে রয়েছে। ইতোমধ্যে সেখানে অভিযানও করা হয়েছে। এর পরও যদি কেউ যদি বালু তোলার কার্যক্রম চলে তাহলে পরিবেশ ও সরকারি সম্পদ রক্ষায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হবে। তবে ইতোপূর্বে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. . মান্নান এবং পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পরিচালক মো. জমির উদ্দিন সরজমিন পরিদর্শন করে হারবাং ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু তোলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বললেও তা কথাতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধটেকনাফের বাহারছড়ায় ১১৮ কোটি টাকার অবৈধ জাল জব্দ
পরবর্তী নিবন্ধচুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে ধসে পড়ছে টিলা