তারেক রহমানের ‘ফ্যামিলি কার্ডের’ বাস্তবতা!

অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল

| সোমবার , ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ

যারা জনাব তারেক রহমানকে পছন্দ করেন না, তারাও নিশ্চয়ই মানবেন যে স্বৈরশাসনের সময় তাকে কথা বলতে না দেওয়ার পাশাপাশি তার চরিত্র হনন করার জন্য যা যা করা সম্ভব, তার প্রায় সবই করা হয়েছে। তাই তরুণদের মধ্যে তাকে নিয়ে বিভ্রান্ত বা মিশ্র ধারণা তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু ৫ আগস্টের পর যারা তাকে দেখেছেন ও শুনেছেন, এমনকি যারা আগে তাকে অপছন্দ করতেন, তারাও এখন আগের সেই ভুল ধারণায় আর থাকতে পারছেন না। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এতদিনে তারেক রহমান নিজেকে এক ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছেন। তিনি শান্তভাবে কথা বলেন, চিৎকার করে নয়। প্রতিপক্ষের ব্যাপারে তার ভাষা সংযত, তিনি কখনো ব্যক্তিগত আক্রমণ করেন না। এমনকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা আগের স্বৈরশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের নিয়েও তিনি সরাসরি আক্রমণাত্মক কথা বলেন না। তার সহনশীলতা যে অভিনয় নয়, তা বোঝা যায় যখন তাকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন তিনি হাসিমুখে গ্রহণ করেন, এমনকি ভবিষ্যতেও যেন এই কার্টুন আঁকা চলতে থাকে সেটাও বলেন। এই কারণেই মনে হচ্ছে, সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে তার সঙ্গে একটা আত্মিক যোগাযোগ অনুভব করতে শুরু করেছে। মানুষ ভাবছে তিনি আমাদেরই একজন। আজ তার কথাগুলো আর মানুষ ফাঁকা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বলে মনে করছে না। তিনি যখন তার রাজনৈতিক পরিকল্পনার কথা বলেন, তখন তার কণ্ঠে ও ভঙ্গিতে বোঝা যায় এগুলো তার বহুদিনের স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের জন্য ভেবেচিন্তে রাখা পরিকল্পনা। এগুলো কতটা বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। কিন্তু তার ভাবনাগুলো যে আন্তরিক ও মন থেকে আসা, সেটা নিয়ে সন্দেহ করা খুবই অমানবিক হবে।

তিনি প্রায়ই ভবিষ্যতে সরকারে গেলে কীভাবে কাজ করবেন, সে কথা বলেন। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি এসব কথা তার দলের কর্মীদের মাধ্যমে জন মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। আর এই কাজে তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন নতুন প্রজন্মকেছাত্র সংগঠন, যুবদল, মহিলা দল থেকে শুরু করে মূল দল পর্যন্ত।

সম্প্রতি ‘দেশ গড়ার পরিকল্পনা’ কর্মশালায় তার বিবেচনায় আটটি অতি গুরুত্বপূর্ণ জন চাহিদার বিষয় তিনি বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন। তার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য সমাজে নারীর মর্যাদা ও সম্মান প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা। তিনি কৃষক কার্ডের কথা বলেছেন, যেখানে প্রান্তিক কৃষকের জন্য ভর্তুকি মূল্যে ফসলের জন্য বীজ, সার, কীটনাশক দেবার কথা আছে, আছে কৃষি পণ্যের মূল্য নিশ্চয়তার কথা। নামমাত্র সার্ভিস চার্জে কৃষি ঋণ প্রাপ্তির সুবিধা, মৎস্যজীবী পোল্ট্রি চাষীদেরও তিনি এর আওতায় রাখতে চেয়েছেন। তার অন্য পরিকল্পনাগুলোস্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ, কর্মসংস্থান নিয়ে। কর্মসূচিতে আছে পরিবেশ, ইমামমুয়াজ্জিনখতিবদের এবং সকল ধর্মের উপাসনা প্রধানদের সম্মাননা প্রদানের বিষয়ও এই অগ্রাধিকারে।

স্বল্প পরিসরে সবগুলো নিয়ে কথা বলা হয়তো সহজ নয়, কারণ সেটায় তথ্য বিভ্রান্তির সুযোগ থাকে। আজ এখানে শুধুমাত্র ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নিয়ে কিছু প্রাসঙ্গিক আলোচনা করা যেতে পারে। আর আলোচনাটি নির্মোহ হওয়াই ঠিক হবে। এটা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, কতটা নিছক স্বপ্নবিলাস, অর্থায়ন কিভাবে হবে, দুর্নীতিমুক্ত থাকবে কিনা, সত্যিকার নিম্নবিত্তরা পাবেন নাকি তেল মাথায় তেল ঢালা হবে সেটাও দেখা দরকার। প্রমাণ করতে হবে কতটা আন্তরিক তিনি? নাকি নির্বাচনের আগে প্রথাগত প্রতিশ্রুতির তালিকার নবসংযোজন? দেখা যাক বিশ্লেষণ কি বলে।

ঠিক এই মুহূর্তে বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ হতদরিদ্র, যার মধ্যে প্রায় এক কোটি মানুষের সঠিকভাবে খাবার জোটে না। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য মূল্যবৃদ্ধির শিকার প্রায় ৮৮ শতাংশ মানুষ, যাদের বেশিরভাগই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত আর নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির। প্রতি ১০০ জন শিশুর ৩০ জনই পুষ্টিহীনতার শিকার। সঞ্চয়হীন, অপুষ্টির শিকার এই পরিবারগুলো বাধ্য হয়েই বাল্যবিবাহ, শিশু শ্রমের উপর নির্ভরশীল। প্রশ্ন হলোএতোদিন ধরে সরকার এসবের প্রতিকারে কি করেছে? কাগজেকলমে ২৩ মন্ত্রণালয় আর বিভাগ প্রায় ১৪০ টি কল্যাণমুখী প্রকল্প পরিচালনা করছে। সামগ্রিকভাবে বছরে ব্যয় হচ্ছে ৯৩৫৯ কোটি টাকা। ফলাফল! পরিসংখ্যানে বেরিয়ে এসেছে হতাশার চিত্র। সুবিধাভোগীদের ৬২ শতাংশই গরিবও নয় এবং কোনো ঝুঁকিতেও নেই। এক একটি কর্মসূচির জন্য পৃথক গুদাম, পরিবহন, বিতরণ আর পরিচালন ব্যয়, সাথে দুর্নীতির অভিযোগ তো আছেই। টিসিবি যে সব নিত্যপণ্য সরবরাহ করে, সেটা বিনামূল্যে তো নয়ই আর মাসের চাহিদা পূরণের জন্যও যথেষ্ট নয়।

এই বাস্তবতার প্রেক্ষিতে তারেক রহমানের প্রস্তাবনা ‘ফ্যামিলি কার্ড’। প্রশ্ন হলো এই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চলমান অন্যান্য কল্যাণ কর্মসূচি থেকে আলাদা কীভাবে? বলা হয়েছে এই পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই কার্ডের প্রাপক হবেন পরিবারের নারী প্রধান বা গৃহকর্ত্রী। প্রশ্ন হলো নারী কেন? উদ্দেশ্য নারীকে সম্মানিত করা। আর অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, নারীরা সাধারণত মিতব্যায়ী হন, তারা প্রাপ্য সুবিধার সঠিক ব্যবহার করেন, সঞ্চয়ী হন, সন্তানদের লেখাপড়া শেখাতে চান, ফলে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ যদি তাকে আর্থিক সুবিধা দেয় তাহলে এর যথাযথ ব্যবহারে নারীরাই সঠিক নির্বাচন। যুক্তি হিসাবে ফেলে দেবার মত নয়।

আরো আগ বাড়িয়ে হয়তো এটাও বলা যায়, এই কার্ড নারীকে নিরাপত্তা দেবে, ফলে কথায় কথায় তাকে বিবাহ বিচ্ছেদ বা গৃহত্যাগের শিকার হতে হবে না। পরের প্রশ্ন হলোফল ভোগীদের নির্বাচন কীভাবে করা হবে? তারেক রহমানের পরিকল্পনা বলছে, কার্ড প্রাপক নির্বাচন প্রক্রিয়া হবে একটা পরিবারের উপার্জন, বাসস্থান, শিক্ষা, টয়লেটের ধরন, পানির সুবিধা কতটা পায়, এসবের প্রাথমিক তথ্য ভিত্তিতে। আরো স্বচ্ছ করতে দ্বিতীয় ধাপে স্থানীয় শিক্ষক, ইমাম, সরকারি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে গ্রামীণ সভায় সবার সামনে পরিবারগুলো নির্বাচিত হবে। তৃতীয় ধাপে মোবাইল অ্যাপে আবেদন করতে হবে, যাতে এই সহায়তার টাকা বা পণ্য পেতে কারো অনুগ্রহের উপর অপেক্ষা করতে না হয়।

এখন দেখা যাক ফ্যামিলি কার্ডে সুবিধা কী থাকবে। পরিকল্পনা রয়েছে প্রতি পরিবারকে ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকা অথবা ২৫ কেজি চাল, ৫ কেজি আলু, ১ কেজি মসুর ডাল, ২ লিটার ভোজ্য তেল আর এক কেজি লবণ দেয়া হবে প্রতি মাসে।

তারা হিসাব করে দেখেছেন, ৫ সদস্যের একটা পরিবারের জন্য এই পরিমাণ খাদ্য সামগ্রী মোটামুটি গ্রহণযোগ্য। আর্থিক সক্ষমতা বাড়লে সেবা গ্রহীতার সংখ্যা ও সুবিধার পরিমাণ বাড়বে এমন আশাবাদও আছে। আপাতদৃষ্টিতে পরিকল্পনাটি কল্যাণমুখী সন্দেহ নাই। তবে এর বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ কম নেই। বছরে ১২ হাজার কোটি টাকার অর্থের যোগান, সঠিক পরিবার নির্বাচন, বিতরণ, সরবরাহ নিশ্চিত করা। তবে আশার কথা হলো এই প্রকল্প পুরোপুরি চালু হলে গরীবধনী নির্বিশেষে দেশের সব পরিবারই এর আওতায় আসবে। সুতরাং এতে দুর্নীতির সুযোগ কমবে, আর প্রকল্প সফল হলে বাজারে নিত্য পণ্যের মূল্যও স্থিতিশীল হবে। বাজারের অস্থিরতা কমবে, পুষ্টি সমস্যার উন্নতি হবে। দেশীয় উৎপাদন বাড়লে আমদানি নির্ভরতা কমবে। শেষ কথা হলোতারেক রহমান ফ্যামিলি কার্ডের এই প্রকল্প আটঘাট বেঁধেই নিয়েছেন মনে হয়।

এটা নিছক নির্বাচনী চমক হলে এর ভালোমন্দ আর চ্যালেঞ্জ নিয়ে এত বিস্তারিত বলার প্রয়োজন তার হতো না। আমরাও অপেক্ষায় রইলাম দেশের প্রান্তিক জনগণের কল্যাণে ফ্যামিলি কার্ডের মতো একটা যুগান্তকারী প্রকল্প যেন সফল হয়, এর সুবিধা যেন সেই সুবিধা বঞ্চিতদের কাছে পৌঁছায়। তারেক রহমান আপনার সামনে চ্যালেঞ্জ হলো এটা প্রমাণ করা যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ যেন নিছক কথার কথা নয়। আমরাও আপনার মত আশাবাদী হতে চাই। দেখার অপেক্ষায় রইলাম, প্রতিশ্রুতি পূরণে জিয়া পরিবারের ঐতিহ্যের পুনরাবৃত্তি যেন আপনার মাধ্যমেই হয়।

লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ, বগুড়া

পূর্ববর্তী নিবন্ধএখানে লুকোচুরির কোনো ব্যাপার নাই
পরবর্তী নিবন্ধনারীদের জন্য সান্ধ্য বাস চালুর আশ্বাস জামায়াত আমিরের