চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় দেশের একাদশ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে দুই দশক পর আবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিল বিএনপি। আর তিন দশক পর নতুন একজন রাজনীতিবিদকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পেল বাংলাদেশ। রেওয়াজ ভেঙে বঙ্গভবনের বদলে এবারের শপথ অনুষ্ঠান হয় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। গতকাল মঙ্গলবার বিকাল ৪টায় জাতীয় সংগীত এবং তারপর কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে শপথ অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রী পদে তারেক রহমানের নাম ঘোষণা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি।
তারেক রহমান নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছ থেকে প্রথমে সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের এবং তারপর গোপনীয়তার শপথ নেন। সব শেষে তিনি শপথের নথিতে স্বাক্ষর করেন। নতুন প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন জানানোর পর মন্ত্রিপরিষদে জায়গা পাওয়া নেতাদের নাম ঘোষণা করা হয় এবং শপথ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানানো হয়। এরপর নতুন মন্ত্রীদের পর্যায়ক্রমে শপথ এবং গোপনীয়তার শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সব শেষে প্রতিমন্ত্রীদের নাম ঘোষণা করে তাদেরকে শপথগ্রহণের জন্য আহ্বান জানিয়ে মঞ্চে ডাকেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। প্রতিমন্ত্রীদের শপথ এবং শপথে স্বাক্ষরের জন্য অনুষ্ঠান শেষ হয়। খবর বিডিনিউজের।
রাষ্ট্র পরিচালনায় তারেক রহমানের সঙ্গী হচ্ছেন ২৫ জন মন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর তারেক তার নতুন সরকার সাজিয়েছেন ৪০ জন নতুন মুখ নিয়ে। তাদের মধ্যে বিএনপির জোটের শরিক দুই নেতাও রয়েছেন। অনেকেই প্রথমবার এমপি হয়েই সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে গেছেন। তারেক রহমান নিজেও এবারই প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে এসেছিলেন তার মেয়ে দীনা আফরোজকে সঙ্গে নিয়ে। উপদেষ্টাদের মধ্যে আসিফ নজরুল, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, চৌধুরী রফিকুল আববারকেও শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে দেখা গেছে। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু, ভারতীয় লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা, পাকিস্তানের পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবাল, শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্য ও গণমাধ্যম বিষয়ক মন্ত্রী নালিন্দা জয়াসিতা, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দ শর্মাসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেন। অনুষ্ঠানে তারেক রহমানের স্ত্রী ড. জুবাইদা রহমান এবং তাঁদের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
তারেক রহমানের মন্ত্রিসভার বড় চমক খলিলুর রহমান, যিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিদেশি কোম্পানিকে বন্দর ইজারা দেওয়া এবং প্রস্তাবিত রোহিঙ্গা করিডোর নিয়ে বিতর্কের মধ্যে বিএনপির অনেকে তার অপসারণও চেয়েছিলেন। পররাষ্ট্র ক্যাডারের সাবেক কর্মকর্তা খলিল এমপি না হলেও দায়িত্ব পালন করবেন টেকনোক্র্যাট হিসেবে। তিনি পেয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব। টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন কুমিল্লা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ইয়াছিনও। এদিকে মন্ত্রিসভায় খলিলুর রহমানের যোগ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, এর মাধ্যমে খলিলুর অন্তর্বর্তী সরকারে থাকাকালে বিএনপির হয়ে কাজ করেছেন কিনা, সেই প্রশ্ন উঠবে।
১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের সদস্য ইয়াছিন এবার কুমিল্লা–৬ (সদর) আসনে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তবে ওই আসনে দলের মনোনয়ন পান দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মনিরুল হক চৌধুরী। ইয়াছিন তখন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিলেও গত ১৯ জানুয়ারি তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ক্রীড়া সম্পাদক ও ঢাকা উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক সাবেক ফুটবলার মো. আমিনুল হকও টেকনোক্র্যাট প্রতিমন্ত্রী হিসেবে সরকারে জায়গা পেয়েছেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা–১৬ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন আমিনুল। তবে তিনি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আবদুল বাতেনের কাছে হেরে যান। আমিনুলকে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নতুন মুখের ছড়াছড়ির মধ্যে বিএনপির অভিজ্ঞ ও পুরনো নেতাদের অনেকেরই সরকারে জায়গা হয়নি। তাদের মধ্যে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পরিষদ স্থায়ী কমিটির সদস্যদের পাশাপাশি ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টামণ্ডলীর নেতারাও রয়েছেন। বিএনপির চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বাদ পড়া সিনিয়রদের মধ্যে কেউ কেউ পরে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেতে পারেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান মন্ত্রিপরিষদের জায়গা পাননি। তাদের চারজনই বিএনপির প্রয়াত নেতা খালেদা জিয়ার কেবিনেটে ছিলেন। স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার, সাবেক প্রতিমন্ত্রী সেলিমা রহমান এবং বিএনপির এবারের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান নজরুল ইসলাম খানও সরকারে আসতে পারেননি।
বিএনপির সাবেক মন্ত্রীদের মধ্যে মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, বরকত উল্লাহ বুলুর নাম আলোচনায় থাকলেও তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় তাদের নাম নেই। সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও আমান উল্লাহ আমানকেও তিনি নতুন সরকারে রাখেননি। বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুন নবী খান সোহেল টেকনোক্র্যাট হিসেবে মন্ত্রিসভায় আসতে পারেন বলে শোনা গিয়েছিল, তবে তা বাস্তবে ঘটেনি।
শরিক দলের নেতাদের মধ্যে নির্বাচনে জয়ী গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন যারা : মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ, হাফিজ উদ্দিন আহমদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, ড. খলিলুর রহমান (টেকনোক্র্যাট), আব্দুল আউয়াল মিন্টু, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, মিজানুর রহমান মিনু, নিতাই রায় চৌধুরী, খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, আরিফুল হক চৌধুরী, জহির উদ্দিন স্বপন, মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ইয়াছিন (টেকনোক্র্যাট), আফরোজা খানম (রিতা), মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, আসাদুল হাবিব দুলু, মো. আসাদুজ্জামান, জাকারিয়া তাহের, দীপেন দেওয়ান, আ ন ম এহছানুল হক মিলন, সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, ফকির মাহবুব আনাম ও শেখ রবিউল আলম।
প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন যারা : প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, মো. শরিফুল আলম, শামা ওবায়েদ ইসলাম, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, কায়সার কামাল, ফরহাদ হোসেন আজাদ, মো. আমিনুল হক (টেকনোক্র্যাট), মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, হাবিবুর রশিদ, মো. রাজীব আহসান, মো. আব্দুল বারী, মীর শাহে আলম, মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি (জোনায়েদ সাকি), ইশরাক হোসেন, ফারজানা শারমিন, শেখ ফরিদুল ইসলাম, মো. নুরুল হক নুর, ইয়াসের খান চৌধুরী, এম ইকবাল হোসেইন, এম এ মুহিত, আহম্মদ সোহেল মঞ্জুর, ববি হাজ্জাজ ও আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম।
সংসদ সচিবালয়ের গণসংযোগ শাখার পরিচালক মো. এমদাদুল হক বলেন, শপথ অনুষ্ঠানে বিএনপির ২০৮ জন, জামায়াতের ৬৮ জন, এনসিপির ৬ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন, খেলাফত মজলিসের একজন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ২ জন, জাতীয় পার্টি বিজেপির একজন, গণসংহতি আন্দোলনের একজন, গণঅধিকার পরিষদের একজন ও স্বতন্ত্র ৭ জন শপথ নিয়েছেন। শপথ শেষে রীতি অনুযায়ী নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ বইয়ে স্বাক্ষর করেন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ২৯৭ আসনের ফল গেজেট আকারে ঘোষণা করা হয়েছে। এবারের নির্বাচনে বিজয়ীদের মধ্যে প্রায় ১৫০ জন এর আগে কখনো সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হননি।











