তারেক রহমানের ক্যারিশমাটিক নেতৃত্বে বিএনপি’র ভূমিধস বিজয়

শাহেদ আলী টিটু | বৃহস্পতিবার , ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে শুরু থেকেই একরকম সন্দেহ দেশের মানুষের মনে জাগিয়ে তোলা হয়েছিল। নির্বাচন নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র, অনিশ্চয়তা এবং ক্রমাগত মিথ্যাচার করে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শেষ পর্যন্ত একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচন আয়োজন করে সকল মিথ্যাচারের জবাব দিয়েছেন। যা দেশেবিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অত্যন্ত পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রেখেছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন দেশের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে। শত অপপ্রচার সত্ত্বেও ৫৯.৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা ভোটারদের মধ্যে লক্ষ্য করা গেছে। কোন অপ্রীতিকর ঘটনা এই নির্বাচনে ঘটেনি। যা বাংলাদেশে নির্বাচনী ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত।

দেশে ফেরার আগে কেউ কেউ বলেছেন তারেক রহমান দেশে আসবেন না। তারেক রহমান দেশে এসেছেন, নির্বাচন প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন। নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নিজ দলকে জিতিয়ে এনেছেন। তাঁর ক্যারিশমাটিক লিডারশিপের কারণে এটা সম্ভব হয়েছে।

২৫ ডিসেম্বর ১৭ বছর পর দেশের মাটিতে পা রেখেই তারেক রহমান দেশের মাটির ছোঁয়া নেন। এতে দীর্ঘদিন দেশের মাটিতে থাকতে না পারার যে আকুতি তা প্রকাশ পায়। বিমান বন্দরে নেমে তিনি যে বিশেষ বাসটিতে করে ঢাকায় তাঁর জন্য নির্ধারিত ৩০০ ফিট এলাকায় সংবর্ধনাস্থলে যান তা ছিল এক ব্যতিক্রমী আয়োজন। পূর্বে কোন রাজনৈতিক নেতানেত্রীকে এ ধরনের বাস যাত্রায় জনতার অভিবাদনে সিক্ত হতে দেখা যায়নি। এয়ারপোর্ট থেকে ৩০০ ফিটে যাবার পুরোটা সময় তিনি বাসের সম্মুখভাগে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে জনতার অভিবাদনের জবাব দিয়েছেন। দলীয় প্রতীক ধানের শীষ, জিয়াউর রহমানখালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের ছবি সম্বলিত সাজানো বাসটি ছিল প্রচারণার নতুন কৌশল। নতুনত্ব ছিল তাঁর প্রথম ভাষণে। তিনি মার্টিন লুথার কিং এর ভাষণের একটি উদ্বৃতি ও I have a dream উল্লেখ করে বলেন ও I have a plan. কিন্তু সেই সময় নির্বাচনী প্রচারণা শুরু না হওয়ায় তিনি তাঁর প্লেন এর কথা বিস্তারিত বলতে পারেননি। ২২ জানুয়ারি থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারপ্রচারণা শুরু হলে তাঁর প্ল্যানগুলো জনসভায় বিস্তৃতভাবে উল্লেখ করেন যা জনগণের মধ্যে উদ্দীপনা তৈরি করে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর সরাসরি অংশ গ্রহণ কখনও ছিল না। তিনি কখনও কোন নির্বাচনে প্রার্থী হননি। এবারই তিনি প্রথম সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। বেগম জিয়ার মৃত্যুর পর তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। দলের চেয়ারম্যান হিসেবে প্রথমবারের মত তিনি সরাসরি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এটা তাঁর জন্য অনেক চ্যালেঞ্জিং ছিল। আওয়ামী লীগের মত শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলেও গত ১৭ বছরে দলের বহু নেতাকর্মী মামলাহামলা, গুম খুনের শিকার হয়েছেন। মামলাহামলায় অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। ৫ আগস্ট পরবর্তীতে নির্যাতিত নিপীড়িত দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করে তাদেরকে নির্বাচনমুখী করা ছিল তাঁর বড় চ্যালেঞ্জ।

দীর্ঘ ১৭ বছর পর বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দলকে কে পরিচালিত করবে, কার নেতৃত্বে দল চলবে তা নিয়ে নেতাকর্মীরা দ্বিধান্বিত ছিল। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে নেতাকর্মীদের মধ্যে চাঙাভাব ফিরে এসেছে। তাঁর ক্যারিশমাটিক নেতৃত্বে দলকে তিনি সুসংগঠিত করে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। অনেকেই দ্বিধান্বিত ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া নেতৃত্ব দিয়ে ৯১ সালে এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে যেভাবে দলকে সফলতার দিকে নিয়ে গেছেন তারেক রহমান সেটা পারবেন কিনা। কিন্তু নির্বাচনী জনসভাগুলোতে ভাষণে তিনি পূর্বের সব প্রথা ভেঙে দিয়েছেন। নির্বাচনী ভাষণে চমক দেখিয়েছেন। পূর্বে আমরা রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্বকে জনসভাগুলোতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করতে দেখেছি। তিনি পুরো স্টেজে হেঁটে ওয়াকিং স্পীচ দিয়েছেন। তিনি তাঁর জন্য নির্ধারিত চেয়ারেও বসেননি। জনগণের মধ্য থেকে কয়েকজনকে ডেকে নিয়েছেন স্টেজে। জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হলে এলাকায় কী কী কাজ করতে হবে জেনেছেন। তাদের দাবি দাওয়াগুলো শুনেছেন। এটাতো কোন রাজনৈতিক নেতাকে আগে করতে দেখা যায়নি। তাঁরা জনসভায় একটি নির্দিষ্ট পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রেখে চলে যেতেন। জনসভায় আগত জনগণের অভাব অভিযোগ শোনা হতো না। তিনি দিনমজুর, শিক্ষক, গৃহিণী, শিক্ষার্থী সকলের দাবি দাওয়া সরাসরি জানতে চেয়েছেন। এটা ছিল ব্যতিক্রমী। তিনি যে জেলায় জনসভা করেছেন সেখানকার সম্ভাবনাময়ী শিল্প ও উন্নয়ন নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি রাজশাহীর আম, দিনাজপুরের কাঁঠাল, চাল, লিচু নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। জনগণকে নির্বাচনে উদ্বুদ্ধ করার জন্য তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য স্লোগান ছিল ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।’ এ স্লোগানে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের স্বার্থে, দেশের জন্য কাজ করার স্পৃহা ছিল। দেশের অর্ধেক ভোটার নারী, সেজন্য তিনি গৃহিণীদের স্বাবলম্বী করার জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রবর্তনের কথা বলেছেন। যা ব্যাপক নারী ভোটারকে ভোটদানে উৎসাহিত করেছে। অপরদিকে কৃষকদের জন্য ‘কৃষি কার্ড’ ও ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত যাদের কৃষি ঋণ রয়েছে সেগুলো সুদসহ মওকূফ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এবার তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল লক্ষ্যণীয়। যারা গত ১৭ বছরে ভোট দিতে পারেনি, এবার প্রথম ভোট দিয়েছে। এসব তরুণ ভোটারকে লেখাপড়া শেষ করে চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত বেকার ভাতা প্রদানের কথা বলেছেন।

মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খতিবের জন্য এবং অন্যান্য ধর্মের ধর্মগুরুদের জন্য মাসিক ভাতার কথা বলেছেন। নারীদের এইচএসসি পর্যন্ত শিক্ষাকে ফ্রি করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে ২৫০০ টাকা পর্যন্ত টাকা অথবা সমপরিমাণ টাকার চাল, ডাল, তেল দেওয়ার কথা বলেছেন। কৃষক কার্ড এর মাধ্যমে কৃষকরা কৃষি ঋণ, বীজ, সার কীটনাশক সরাসরি সরকারের কাছ থেকে সহায়তা হিসেবে পাবে। গ্রামের মানুষের কাছে ঘরে ঘরে চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতে ১ লক্ষ হেলথ কেয়ারার নিয়োগ করার কথা বলেছেন। যশোরে জনসভায় ফুল চাষ শিল্প করার কথা বলেছেন। ফুল শিল্পকে আরো বিস্তৃত করে বিদেশে গার্মেন্টস শিল্পের মতো ফুল রপ্তানীর কথা বলেছেন। যশোরে প্রচুর আখ চাষ হয়। তাই চিনিকলগুলো চালু করার কথা বলেছেন। রংপুরে কৃষি প্রধান এলাকা। রংপুর মঙ্গাপীড়িত এলাকা আর থাকবে না। তিনি যে এলাকায় জনসভা করেছেন সেই এলাকার সম্ভাবনা ও সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন। এতে উক্ত এলাকার ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

নির্বাচনী প্রচারাভিযানে তাঁর ভাষণ শুনে মানুষ মুগ্ধ হয়েছে। বিরোধীয় পক্ষের প্রতি কোন বিষোদগার ছিল না। শুধু নিজ দল ক্ষমতায় গেলে দেশের মানুষের জন্য যেসব কাজ করা হবে তার ফিরিস্তি দিয়েছেন। তাই তাঁর ভাষণে মানুষ আস্থা রেখেছেন। মানুষের আস্থা অর্জন করায় ছিল তাঁর ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং। যা তিনি নির্বাচনোত্তর দেশীবিদেশী সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেছেন।

লেখক : গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও উপসচিব, সিসিসিআই।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ড্রাইভিং ফোর্সে
পরবর্তী নিবন্ধপবিত্র রমজান: আত্মশুদ্ধির আহ্বান ও মানবিক পুনর্জাগরণ