তারা অনেকেই আবার অপরাধে

স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা জলদস্যু

আজাদী প্রতিবেদন | বৃহস্পতিবার , ২৬ মে, ২০২২ at ১০:২৮ পূর্বাহ্ণ

স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আশ্বাসে সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধা নেওয়া জলদস্যুদের অনেকেই আবারো সাগরে অপরাধে জড়াচ্ছে। জেলেদের জিম্মি করে লাখ লাখ টাকা আদায় করছে তারা। ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সুন্দরবনকে ‘দস্যুমুক্ত সুন্দরবন’ ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর জলদস্যুদের বেশকিছু গ্রুপ দলপ্রধানের নেতৃত্বে আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু পরে দেখা যায়, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকটি গ্রুপ পুরনো পেশায় ফিরে গেছে; পাশাপাশি জলদস্যুদের নতুন একাধিক গ্রুপ সক্রিয় হয়েছে সাগরে।

র‌্যাবের তথ্যমতে, গত তিন বছরে তিন শতাধিক জলদস্যু আত্মসমর্পণ করেন। এদের মধ্যে যারা সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আবারও অপরাধে জড়িয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চলছে জানিয়ে র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল এম এ ইউসুফ জানান, গত ১৩ মে তিন বাহিনীর প্রধানসহ আট জলদস্যুকে আটক করে র‌্যাব। এদের মধ্যে কালু বাহিনীর প্রধান গুরা কালু ২০১৭ সালে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু পরে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
সম্প্রতি পটুয়াখালীর পাথরঘাটা এলাকায় একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে সাত জলদস্যুকে আটক করে র‌্যাবের বরিশাল ইউনিট। একই অভিযানে তিন জলদস্যু র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুক যুদ্ধে’ নিহত হয়। ওই সময় আটককৃতরা র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী বাঁশখালী, কুতুবদিয়া, সোনাদিয়া, শাহপরীর দ্বীপ, পেকুয়া ও চকরিয়া এখন জলদস্যুদের নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। এরপর ওই এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ায় র‌্যাব।

র‌্যাবের কাছে তথ্য রয়েছে, সমুদ্রে আধিপত্য বজায়কারী এসব জলদস্যু বাহিনীর লোকজন মাছ ধরার বোটগুলোতে হামলা চালিয়ে লুট করে নিয়ে যাচ্ছে আহরিত মাছ, জাল ও সঙ্গে থাকা বোট। একই সঙ্গে জেলেদের অপহরণ করে আদায় করছে মোটা অঙ্কের অর্থ। টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে অমানবিক কায়দায় নির্যাতন করে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিচ্ছে জেলেদের। জলদস্যুদের উৎপাত বৃদ্ধি পাওয়াতে মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত জেলেরা এখন রয়েছেন চরম আতঙ্কে। সংশ্লিষ্টরা জানান, সমুদ্র এখন মৎস্যজীবীদের জন্য আর নিরাপদ নয়। বেড়ে গেছে ডাকাতদের ক্রমাগত উৎপাত।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার কঙবাজারে জাহাজ ডাকাতির ঘটনায় ৫ জলদস্যুকে আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আটক করে র‌্যাব-৭। অভিযানে মো. আবু বক্কর (৫৫), মো. মোজাম্মেল হক (৫১), মাহমুদুল করিম (৪২), দিদারুল ইসলাম (৪৮) এবং মো. মিনারকে (২৯) আটক করা হয়। এসময় তাদের কাছ থেকে ৩টি ওয়ান শুটার গান উদ্ধার করে র‌্যাব।

বাঁশখালী, পেকুয়া ও কুতুবদিয়ায় গত ১৩ মে শুক্রবার থেকে ৪৮ ঘণ্টা টানা অভিযান চালিয়ে তিন জলদস্যু বাহিনীর তিন প্রধান আজিজুল হক প্রকাশ আজিজ (৪৬), কালু প্রকাশ গুরা কালু (৪০) এবং সাহাব উদ্দিন প্রকাশ সাহাবসহ (৪৭) আট জলদস্যুকে আটক করেছে র‌্যাব। এদের মধ্যে আজিজ বাহিনীই সবচেয়ে দুর্ধর্ষ বলে জানিয়েছে র‌্যাব। র‌্যাব-৭ এর উপ-অধিনায়ক মেজর মোস্তফা জামান জানান, তিনটি বাহিনীই কঙবাজারের মহেশখালী-কুতুবদিয়া এবং বাঁশখালীতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। চট্টগ্রাম ও কঙবাজারের উপকূলীয় অঞ্চলে এ তিনটি বাহিনীর সদস্যরা কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকার পর আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সময় উপকূলে বসবাসকারী সাধারণ লবণ চাষি ও সাগরে জেলেদের উপর অত্যাচার, চাঁদাবাজি এবং অপহরণের কাজ করে। জলদস্যু দলের নেতাদের মধ্যে গুরা কালুর বিরুদ্ধে ১০টি, আজিজের বিরুদ্ধে ৩টি এবং সাহাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে ৬টি মামলা রয়েছে।

চকরিয়া থেকে জলদস্যু জিকু বাহিনীর প্রধান জিয়াবুল হক ওরফে জিকুকে গত ১২ মে আগ্নেয়াস্ত্রসহ আটক করে র‌্যাব। এ ব্যাপারে র‌্যাব জানায়, বঙ্গোপসাগরের দুঃসাহসী জলদস্যু এই জিকু। এছাড়াও তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত জলদস্যু। সম্প্রতি জিকু বিভিন্ন জলদস্যু গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে এবং তার জলদস্যু দলকে সংঘটিত করে আগের ব্যবসা শুরু করেছে। জলদস্যু দলের জন্য বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের দায়িত্বও ছিল তার।

চট্টগ্রাম-হাতিয়া চ্যানেলে জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি জলদস্যু কামাল বাহিনীর প্রধান কামালসহ ৫ জনকে আটক করে র‌্যাব-৭। নগরীর ইপিজেড থানার আকমল আলী রোডের একটি ভবন থেকে তাদের আটক করা হয়। দীর্ঘদিন কামাল বাহিনী চট্টগ্রাম-হাতিয়া চ্যানেলের জেলেদের অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ে জেলেদের জিম্মি করতো; মুক্তিপণ না পেলে জেলেদের হত্যা করত বলে জানান র‌্যাব-৭ চট্টগ্রামের সিনিয়র সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) মো. নুরুল আবছার।

৪ ফেব্রুয়াারি পেকুয়ায় গহীন জঙ্গলে অস্ত্র তৈরির কারখানায় অভিযান চালিয়ে ৮টি দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্রসহ তিনজনকে আটক করে র‌্যাব। র‌্যাব-৭ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এমএ ইউসুফ জানান, উপকূলের শীর্ষ জলদস্যু পেকুয়ার কবির আটক হওয়ার পর তার কাছ থেকে জানা যায়, টৈটংয়ের পাহাড়ি এলাকা ঝুমপাড়ায় ডাকাত আবদুল হামিদের নেতৃত্বে একটি অস্ত্র কারখানা রয়েছে। যেখানে অস্ত্র তৈরি ও বেচা-কেনা হয়। পরে ওই এলাকায় ১১টি পাহাড়ে অভিযান চালানো হয়। এর মধ্যে ২টি পাহাড়ে এই বাহিনীর আস্তানা পাওয়া যায়।

এর আগে ২২ জানুয়ারি পেকুয়া ও কুতুবদিয়া থেকে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্রসহ জলদস্যু বাহিনীর প্রধান নূরুল কবীর ও তার সেকেন্ড ইন কমান্ড মামুনকে আটক করে র‌্যাব। এসময় তাদের আরও ১১ সহযোগীকে আটক করা হয়। র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ ইউসুফ জানান, গত ১৪ জানুয়ারি ১৭ জন জেলে মাছ ধরার জন্য সাগরে গেলে কবীর বাহিনী মাছ ধরার বোটসহ তাদেরকে অপহরণ করে। এরপর জেলেদেরকে জিম্মি করে মারধর করে ও নির্যাতন চালায়। বোট মালিকের কাছে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। পরবর্তীতে মালিক ২ লাখ টাকা দিলে জেলেদের ধরা ২ হাজার ইলিশ মাছ লুট করে নিয়ে যায়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাঙ্গুনিয়ায় পুকুরে গোসলে নেমে প্রাণ গেল যুবকের
পরবর্তী নিবন্ধগাফফার চৌধুরীর মরদেহ আসছে শনিবার