তরুণদের কাছে বিএনপির নীতি, পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি তুলে ধরলেন তারেক

দ্য প্ল্যান : ইয়ুথ পলিসি টক উইথ তারেক রহমান । ক্ষমতায় গেলে পাঁচ বছরে ৫০ কোটি গাছ লাগানো, ২০ হাজার কিমি খাল খনন, প্রতিবন্ধীদের জন্য ৫ শতাংশ কোটা, ছাত্রদের জন্য স্টুডেন্ট লোন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকঋণ

আজাদী প্রতিবেদন | সোমবার , ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ

বিএনপি ক্ষমতায় গেলে আগামী পাঁচ বছরে দেশে ৫০ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দেশের জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন। প্রতিবন্ধীদের জন্য ৫ শতাংশ কোটা রেখে বাকি নিয়োগ মেধার ভিত্তিতে করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, পাহাড় এবং সমতলে কোনো বৈষম্য থাকবে না। আমরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। সবাই সমান সুবিধা পাবে। ছাত্রদের জন্য স্টুডেন্ট লোন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও জানান। গতকাল রোববার সকালে নগরীর হোটেল রেডিসন ব্লু চিটাগং বে ভিউতে আয়োজিত ‘দ্য প্ল্যান : ইয়ুথ পলিসি টক উইথ তারেক রহমান’ শীর্ষক এক যুব সমাবেশে বক্তৃতা করছিলেন। অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের বিভিন্ন কলেজবিশ্ববিদ্যালয়ের সাড়ে ৪শ শিক্ষার্থী অংশ নেন। তারা তারেক রহমানকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি সেগুলোর উত্তর দেন। প্রশ্নোত্তর পর্বের এই পলিসি ডায়ালগে তরুণদের নানা প্রশ্নের উত্তরে বিএনপির নীতি, পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি পরিবেশ সুরক্ষা, চাঁদাবাজিদুর্নীতি, অভিবাসী শ্রমিকের দক্ষতা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা সংস্কার, পাহাড়সমতল বৈষম্য, ব্লু ইকোনমি, কৃষি সিন্ডিকেট, এনআইডিপাসপোর্টজন্মনিবন্ধনের হয়রানিসহ অনেক ইস্যুতে আসা প্রশ্নের উত্তর দেন।

এক শিক্ষার্থীর প্রশ্নের উত্তরে তারেক বলেন, দেশে ব্যাংকঋণ পাওয়া সহজ নয় এবং এক্ষেত্রে নানা জটিলতা আছে। তবে সব আইন রাতারাতি বদলানো সম্ভব না হলেও যতটুকু সংশোধন করা যায়। তা করে ছোট উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে তরুণ উদ্যোক্তারা যেন জামানতের কারণে পিছিয়ে না পড়েন, সেদিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার পরিকল্পনা নিয়েছি।

স্টুডেন্ট লোনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের পরিকল্পনায় আরেকটি বিষয় রয়েছে। এটি হলো বিদেশে পড়তে যেতে চাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য অর্থায়ন। বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী জাপান বা চীনের মতো দেশে পড়তে যেতে চাইলেও ভিসা ফি বা বিমানের টিকিটের খরচ জোগাতে না পেরে সুযোগ হারান। এজন্য উদ্যোক্তাদের মতো করেই বিদেশে পড়তে যেতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য ‘স্টুডেন্ট লোন’ চালু করা যায় কিনা, সে পরিকল্পনাও রয়েছে।

তারেক রহমান বলেন, একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি পার হয়ে বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একটি পরিবর্তন দেখেছে। সেই পরিবর্তনের পর দেশকে কোথায় নিয়ে যাব, এ প্রশ্নই এখন সামনে। শুধু ও খারাপ, ও মন্দ বলে সমাধান হবে না; বরং সমস্যাগুলো স্বীকার করে বেটার কিছু করার চেষ্টা দরকার।

পাহাড় ও সমতল প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পারমিতা চাকমা প্রশ্ন করেন, ‘আপনি দেশে আসার পর পাহাড়সমতলের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে দেশ গড়ার কথা বলেছেন। বাংলাদেশ বহু জাতিগোষ্ঠীর দেশ। আমি চাকমা নারী হিসেবে নিজেকে আদিবাসী পরিচয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। তাই জানতে চাই, আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভূমি অধিকার, পার্বত্য এলাকায় দীর্ঘদিনের ভূমিসংক্রান্ত টানাপোড়ন, উত্তেজনা ও নাগরিক নিরাপত্তার বিষয়ে আপনার দলের অবস্থান কী? রাষ্ট্রীয় অংশগ্রহণে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভূমিকা কীভাবে নিশ্চিত করবেন? পাশাপাশি পাহাড়ি তরুণদের শিক্ষা, চিকিৎসা, স্বাস্থ্য, সরকারি চাকরি ও দক্ষতা উন্নয়ন নিয়ে আপনাদের কী পরিকল্পনা আছে?’

জবাবে তারেক রহমান বলেন, ধন্যবাদ। আমি বিষয়টা এভাবে দেখি, ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন করার যুদ্ধ যখন হয়েছিল, তখন কে কোন ধর্মের, এটা কেউ দেখেনি। কে সমতলের আর কে পাহাড়ের, সেটাও কেউ দেখেনি। ঠিক একইভাবে ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময়ও মানুষ কে কোন ধর্মের, কে পাহাড়ের বা কে সমতলেরএসব বিবেচনা করে রাস্তায় নামেনি। আপনি বাংলাদেশি হলে, অ্যাজ লং অ্যাজ ইউ আর বাংলাদেশি; আপনার অধিকার, সুযোগসুবিধা সমান হওয়ার কথা। একজন সমতলের তরুণ যে সুবিধা পাবে, পাহাড়ি অঞ্চলের একজন তরুণও সেই একই সুবিধা পাবে তার যোগ্যতার ভিত্তিতে।

কোটা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্দোলন শুরু হয়েছিল কোটাব্যবস্থার প্রশ্ন থেকে। আমরা আগেও বলেছি, কিছু বিশেষ পরিস্থিতির মানুষ, যেমন প্রতিবন্ধী বা ভিন্নভাবে সক্ষমদের জন্য সীমিত আকারে, ধরা যাক ৫ শতাংশের মতো কোটা রাখা যেতে পারে। কিন্তু বাকি সব ক্ষেত্রে নিয়োগ বা সুযোগসুবিধা মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই হওয়া উচিত। সেটা সমতলের হোক বা পাহাড়েরসবার জন্যই একই নীতি।

খাল খনন, ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জ, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা, বিশুদ্ধ বাতাসের সংকট ও মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, পরিবেশ নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা আছে। জলাবদ্ধতা কমানো ও পানি ধরে রাখাএ দুটিকে বেসিক অগ্রাধিকার হিসেবে রেখেছি।

তারেক রহমান বলেন, খাল খনন করলে পানির ধারণক্ষমতা বাড়ে, জলাবদ্ধতা কমে এবং ভূগর্ভস্থ পানি ধীরে ধীরে রিচার্জ হয়। আমাদের সারা দেশে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, প্রায় ২০ কোটি মানুষের দেশে যানবাহন চলাচল থেকে দূষণ তৈরি হয়। একদিনে সব বন্ধ করা যাবে না। কারণ এতে মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে ধাপে ধাপে এসব যান নিয়ন্ত্রণ, মানোন্নয়ন ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, বছরে ২০ থেকে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা আছে; পাঁচ বছরে লক্ষ্য ৫০ কোটি। এত চারা আসবে কোথা থেকে, সেটি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্ষায় চারা রোপণ হয়, বাকি ৮ থেকে ৯ মাস চারা উৎপাদন করা যায়। সরকারিবেসরকারি নার্সারির সক্ষমতা পরিকল্পিতভাবে বাড়ালে লক্ষ্য পূরণ সম্ভব। কোথায় ছোট ছোট বন হবে তা স্যাটেলাইট ইমেজ দিয়ে শনাক্ত ও মনিটরিং করা হয়েছে।

এক শিক্ষার্থী প্রশ্ন করেন, নীতির কথা কি কেবল প্রতিশ্রুতি হয়ে থাকবে? বাস্তবায়ন কীভাবে নিশ্চিত হবে? জবাবে তারেক রহমান বলেন, রাজনীতিতে জবাবদিহি ভোটের মাধ্যমেই। আজ প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরে না করলে মানুষ সমর্থন সরিয়ে নেবেএটাই রাজনীতির বাস্তবতা। চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে বলেন, এ দুই ইস্যু অ্যাড্রেস না করলে কোনো পরিকল্পনাই সফল হবে না। চাঁদাবাজিতে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ বেকারত্বের কারণে, কেউ প্রফেশনাল ক্রিমিনালদুই ধরনের। প্রফেশনাল অপরাধীদের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ করা হবে। তিনি বলেন, সরকারের মেসেজ খুব গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ ‘উই উইল নট টলারেট’এমন কঠোর অবস্থান নিলেই সমস্যা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমে যেতে পারে। এরপর ব্যবস্থা, মনিটরিং ও প্রয়োগ ধাপে ধাপে করা হবে।

শিক্ষা প্রসঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ, কাজভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও ভাষাশিক্ষাবিদেশগামী শ্রমিকদের বড় অংশ আনস্কিল্ড এবং সে তুলনায় রেমিট্যান্স কম। এক্ষেত্রে পরিকল্পনার বিষয়ে বলেন, ভোকেশনাল ইনস্টিটিউশন আছে, কিন্তু ঠিকভাবে কাজ করে না। এগুলো রিডিজাইন করা হবে। চট্টগ্রামের মানুষ বেশি যান মধ্যপ্রাচ্যে। তাই ওই অঞ্চলের কাজের চাহিদা অনুযায়ী ট্রেনিং সাজানো, অপ্রয়োজনীয় সাবজেক্ট বাদ দেওয়া ও আরবি ভাষা কোর্সে যুক্ত করা হবে। দক্ষতা ও ভাষা জানলে বিদেশে কাজের ভ্যালু অ্যাড বাড়বে।

তারেক বলেন, অতীতে স্কুলে অডিওসুবিধায় রেডিওর মাধ্যমে পাঠ দেওয়ার ধারণাকে আধুনিক প্রযুক্তিতে ফিরিয়ে আনা হবে। অডিওভিজ্যুয়াল কানেকশনে শিক্ষকেরা এক জায়গা থেকে বহু জায়গায় পড়াতে পারবেন। প্রাইমারিসেকেন্ডারি শিক্ষকদের ট্যাব দিয়ে ট্রেনিং, ক্লাস পরিচালনায় সহায়তার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, তৃতীয় ভাষা জানলে চাকরি পাওয়া সহজ হতে পারে। পাশাপাশি কিছু সাবজেক্ট থেকে নম্বর নিয়ে আর্টকালচার ও খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করা হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা বহুমাত্রিক দক্ষতায় গ্লোবাল কম্পিটিটিভ হতে পারে। স্বাস্থ্যখাতের প্রসঙ্গে বলেন, ইউরোপে প্রিভেনশনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমরাও প্রিভেনশনভিত্তিক ব্যবস্থা চাই। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর তুলনায় সুযোগসুবিধা কম। তাই চাপ কমাতে হলে মানুষকে কম অসুস্থ হতে হবে। অর্থাৎ ‘লেস নম্বর অব পিপল’ হাসপাতালে যাবে। তিনি জানান, ধাপে ধাপে এক লাখ হেলথ কেয়ার কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা আছে, যারা গ্রামে গ্রামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বেসিক স্বাস্থ্যসেবা ও পরামর্শ দেবেন। এর মধ্যে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ নারীকর্মী নিয়োগ করা হবে। তারা কী করলে একজন মানুষ সুস্থ থাকবেন তা শিখাবেন।

কৃষকের ক্ষতি ও সিন্ডিকেট নিয়ে এক শিক্ষার্থীর প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে জমি, মালিকানা ও ফসলের ডেটাবেজ তৈরি করা হবে উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে। এতে কোন কৃষক কী চাষ করছেন জানা যাবে, সহায়তা ‘টার্গেটেড’ করা যাবে। আবহাওয়া দেখে কৃষক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এমন একটি অ্যাপ নিয়ে কাজ হয়েছে। দুর্যোগ হলে স্যাটেলাইট দিয়ে ক্ষতি শনাক্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের কাছে সহায়তা পৌঁছানো সহজ হবে। অর্থনীতির স্বাভাবিক সাপ্লাই চেইন বাধাগ্রস্ত করলে উল্টো ক্ষতি হতে পারে। তবে যেসব জায়গায় অনৈতিকভাবে কিছু মানুষ দাম বাড়ায়, তাদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারি সেবা প্রসঙ্গে বলেন, নাগরিক সেবা সহজ করতে পুরো সিস্টেমকে ডিজিটালাইজড করা হবে, যাতে মানুষ ঘরে বসে এনআইডি বা পাসপোর্ট সংশোধন করতে পারেন। খাদ্যে ভেজাল ও অতিরিক্ত ফরমালিন রোধে সরকারি তদারকি বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

এক ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের জবাব দেন তারেক রহমান। কখনো দাঁড়িয়ে, কখনো চেয়ারে বসে কথা বলেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনারীদের জন্য সান্ধ্য বাস চালুর আশ্বাস জামায়াত আমিরের
পরবর্তী নিবন্ধ৭৮৬