২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ডঃ আহসান মনসুরকে তাঁর নিয়োগ চুক্তি বাতিলের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বিএনপি সরকারের সবচেয়ে খারাপ সিদ্ধান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে এটি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতনের পর ৮ আগস্ট ক্ষমতাসীন প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১৪ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ডঃ আহসান মনসুর। আইএমএফ এর অবসরপ্রাপ্ত উচ্চ–পদের কর্মকর্তা ড. মনসুরের গভর্নর নিয়োগ সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছিল। ঐ সময় অর্থনীতি অত্যন্ত বড় বিপর্যয়ের গিরিখাতে পতনের আশংকা সৃষ্টি হয়েছিল। বিশেষত ফাইনেন্সিয়াল সেক্টর প্রায় ‘মেল্টডাউনের’ পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২৩ সালের আগস্টে যেখানে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল সেখান থেকে বেধড়ক্ লুটপাটের শিকার হয়ে বিপজ্জনকভাবে কমতে কমতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মাত্র ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে গিয়েছিল। ডলারের বাজার দর ২০২২ সালে ছিল এক ডলার ৮৭ টাকা, সেখান থেকে দ্রুত ডেপ্রিসিয়েশনের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এক ডলারের দাম দাঁড়িয়েছিল ১২৫ টাকা। দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ১১টি ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল। দেশের প্রাইভেট সেক্টরের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশও এই ১১টি পতনোম্মুখ ব্যাংকের অন্যতম ছিল, কারণ এই ব্যাংকসহ দেশের সাতটি ব্যাংকের মালিকানা তুলে দেওয়া হয়েছিল চট্টগ্রামের কুখ্যাত ব্যাংক–লুটেরা এস আলমের হাতে। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার–গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির গবেষণা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে এস আলম এই সাতটি ব্যাংক থেকে প্রায় দুই লক্ষ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করে দিয়েছে। শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি তাদের গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য–উপাত্ত হাজির করে দাবি করেছে যে শেখ হাসিনার সাড়ে পনেরো বছরের লুটপাটতন্ত্রের শিকার হয়ে দেশের অর্থনীতি থেকে প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার করে মোট ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়ে গেছে।
পতিত স্বৈরশাসক হাসিনার সাড়ে পনেরো বছরের শাসনামলে সবচেয়ে বেশি লুন্ঠনের শিকার হয়েছিল ব্যাংকিং খাত। দেশে ৬১টি ব্যাংকের প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও হাসিনার খামখেয়ালি সিদ্ধান্তে তাঁর আত্মীয়–স্বজন, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা এবং হাসিনার পৃষ্ঠপোষকতায় অলিগার্ক ব্যবসায়ী ও ‘রবার ব্যারনে’ পরিণত হওয়া লুটেরাদেরকে পুঁজি–লুন্ঠনের অবিশ্বাস্য সুযোগ করে দেওয়ার জন্য এতগুলো ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান করেছিল স্বৈরশাসক হাসিনা। ব্যাংক–লুটেরা এস আলম কর্তৃক লুন্ঠিত নিচে উল্লিখিত সাতটি ব্যাংক অন্তর্ভুক্ত ছিল: ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, এসআইবিএল, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, কমার্স ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক এবং আল–আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। একজন ব্যক্তিকে সাতটি ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করতে দেওয়ার দ্বিতীয় নজির বিশ্বের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ইসলামী ব্যাংক ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রধানত জামায়াত–শিবিরের নিয়ন্ত্রিত ব্যাংক ছিল। ঐ সময় ওটা ছিল দেশের প্রাইভেট সেক্টরের ব্যাংকগুলোর মধ্যে বৃহত্তম ব্যাংক। দেশে আসা প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রায় ৩০ শতাংশ আসত ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে। এরকম একটা শক্তিশালী ব্যাংককে এস আলমের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয় স্বৈরশাসক হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় ও মদদে। ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সাত বছরে এস আলম বিভিন্ন কায়দায় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ থেকে লুট করে নিয়েছে প্রায় সত্তর হাজার কোটি টাকা, যার ফলে ব্যাংকটি দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল। পতিত সরকারের ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী লুটে নিয়েছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংককে। শেখ হাসিনার শিল্প ও বেসরকারী বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান রহমানের মালিকানার প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে খেলাপিঋণ রেখে গেছে পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
ডঃ আহসান মনসুরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ করার পর দেড় বছরে ব্যাংকিং খাতে বেশ কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসলেও খেলাপিঋণ সমস্যার কোন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করা যায়নি। বরং, ডঃ মনসুরের সময় আগের মত খেলাপিঋণ লুকিয়ে ফেলার অপতৎপরতা না থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত ক্লাসিফাইড লোনের অনুপাত বাড়তে বাড়তে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৩৬ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলেও পুনর্তফশিলীকরণের নিয়মনীতি শিথিল করায় তা ডিসেম্বরে আবার ৩১ শতাংশে নেমে এসেছে। খেলাপিঋণের এই ৩৬ শতাংশ অনুপাত ছিল শুধু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নয়, এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও সর্বোচ্চ। আরো গুরুতর হলো, বাংলাদেশের খেলাপিঋণের সিংহভাগই বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। পাচারকৃত খেলাপিঋণের কোন অংশই ব্যাংকে ফেরত আসবে না, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে এক টাকাও ফেরত আসেনি। এতদ্সত্ত্বেও ডঃ আহসান মনসুর দেড় বছরে ব্যাংকিং খাতের এই বিপর্যস্ত অবস্থাকে অনেকখানি সফলভাবে সামাল দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় ডঃ মনসুরের অপসারণের তারিখ, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ৩৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছিল। ডলারের বাজার দর গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ১২২ টাকায় স্থিতিশীল রাখতে পেরেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিপর্যস্ত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ আবার ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকও বিপর্যয় অনেকখানি কাটিয়ে উঠেছে। দেউলিয়াত্বের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকও সফলভাবে কার্যক্রম শুরু করতে পেরেছে। ব্যাংকের মোট আমানত আবার আঠারো লক্ষ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। ব্যাংকের ঋণের হারও ১১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে চলমান ২০২৫–২০২৬ অর্থ–বছরে। ঋণের সুদহার কমানোর জন্য প্রবল চাপ থাকলেও ডঃ মনসুর মূল্যস্ফীতির হার কমানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের স্বার্থে ঐ চাপে নতি স্বীকার করেননি। (অবশ্য, স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার শাসনের সর্বশেষ অর্থ–বছর ২০২৩–২০২৪ এ দেশের মূল্যস্ফীতির হার যেখানে প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল সেখান থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেও মূল্যস্ফীতির হারকে ৮ শতাংশে নামাতে সক্ষম হয়নি অন্তর্বর্তী সরকার)। দেশে প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্স ২০২৫ সালে ৩১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছিল। ২০২৬ সালের ৩০ জুন তারিখে শেষ হতে যাওয়া ২০২৫–২০২৬ অর্থ–বছরে তা প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যাবে বলে আশাবাদ সৃষ্টি হলেও ইরান বনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার আশংকা সৃষ্টি হয়েছে। দেশের ব্যালেন্স অব পেমেন্টসের চলতি একাউন্টে শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষ তিন বছর ধরে সৃষ্টি হওয়া মারাত্মক ঘাটতি অবস্থার পরিবর্তে ২০২৬ সালে আবারো উদ্বৃত্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, ফাইনেন্সিয়াল একাউন্টের বিপজ্জনক ঘাটতি পরিস্থিতির অবসান হয়েছে। উপরে বর্ণিত তথ্য–উপাত্তগুলো সাক্ষ্য দিচ্ছে যে দেশের ফাইনেন্সিয়াল সেক্টর স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার লুটপাটতন্ত্র কাটিয়ে গত দেড় বছরে আবার স্থিতিশীল অবস্থায় উপনীত হয়েছে। অবশ্য, দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি এখনো খুবই নাজুক অবস্থায় রয়ে গেছে। বৈদেশিক বিনিয়োগে স্থবিরতা গেড়ে বসে রয়েছে। দেশীয় বিনিয়োগ–জিডিপি’র অনুপাত শেখ হাসিনার শাসনের শেষদিকে যেখানে ২৪ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছিল সেখান থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের ২০২৪–২০২৫ অর্থ–বছরে তা ২২ শতাংশে নেমে গেছে। বরং, বৈদেশিক ঋণের সুদাসলে কিস্তি–পরিশোধ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে। আগামী পাঁচ থেকে সাত বছর কিস্তি–পরিশোধ এভাবে বাড়তেই থাকবে শেখ হাসিনার খামখেয়ালিপনার কারণে বৈদেশিক ঋণ ১১২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যাওয়ার কারণে। অন্তর্বর্তী সরকারও বৈদেশিক ঋণ গ্রহণে বেশ কিছুটা অসংযমের পরিচয় দিয়েছে বলা চলে।
এমতবস্থায়, দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন বৃদ্ধির জন্য প্রণীত বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধনী প্রস্তাবটি অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ–উপদেষ্টা আটকে দিয়েছেন। একইসাথে, আটকে দিয়েছেন অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধনের প্রস্তাব ও ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের প্রস্তাব। তাঁর এহেন অবস্থানের পক্ষে কোন জোরালো যুক্তি না থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূস প্রস্তাবগুলো অনুমোদনের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পক্ষে প্রভাব খাটাননি। তাঁদের এই বিরোধিতা খুবই নিন্দনীয়। দেশ একটি বিশাল সুযোগ হারালো তাঁদের এই অযৌক্তিক বিরোধিতার কারণে। খেলাপি ব্যাংকঋণ সংকটটির সমাধানের কিছু যুক্তিগ্রাহ্য পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন ডঃ মনসুর, যা বানচাল হয়ে গেল। কেন যেন মনে হচ্ছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলের শেষের দিকে গভর্নর ডঃ মনসুরের সাফল্য জনগণের কাছে ফুটে ওঠার ব্যাপারটি মাননীয় অর্থ–উপদেষ্টার ঈর্ষার কারণ হয়ে উঠেছিল। এটা তো মানতেই হবে যে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দায়িত্ব পাওয়া সকল নীতি–নির্ধারকের মধ্যে সচেতন জনগণের কাছে সবচেয়ে বেশি প্রশংসনীয় হয়ে উঠেছিলেন গভর্নর ডঃ আহসান মনসুর, যার তুলনায় অর্থ–উপদেষ্টার ভূমিকা অতোখানি উজ্জ্বল মনে হয়নি। কিন্তু, এজন্য ডঃ মনসুরের ভালো প্রস্তাবগুলো আটকে দেওয়াকে সমীচীন বলা যাবে? বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের ইস্যুটি কোন রাজনৈতিক সরকার কি মেনে নেবে? এই সুযোগটি জাতি হারালো অর্থ–উপদেষ্টার অপরিণামদর্শী বিরোধিতার কারণে!
আমার দুঃখ হচ্ছে যে এহেন প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জনকারী গভর্নর ডঃ মনসুরকে ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে বিদায় নিতে হল সরকারের সাথে তাঁর চুক্তির মেয়াদ আরো দু’বছরের বেশি বাকি থাকা সত্ত্বেও তাঁর সাথে কোন আলাপ–আলোচনা ছাড়াই হঠাৎ করে ঐ চুক্তি বাতিল করার কারণে। ডঃ মনসুর ঐদিন দুপুরেও মিডিয়ার সাথে সংবাদ সম্মেলন করেছেন, তখনো তিনি ঘুর্ণাক্ষরেও জানতেন না যে তাঁকে অপসারণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। সাংবাদিকদের কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন ত্যাগ করার পর বিকেল চারটায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের আদেশ–বিজ্ঞপ্তিটি জারি করা হয়। অবশ্য, বিএনপি–সমর্থক কিছু নেতৃস্থানীয় কর্মকর্তা তাঁর পদত্যাগ দাবি করে কিছুদিন যাবত আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন। ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে তারা কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছিল। তাঁদের তিনজনকে ঢাকার বাইরে ট্রান্সফার করার আদেশ জারি করেছিলেন ডঃ মনসুর। নূতন গভর্নর দায়িত্ব নিয়েই ২৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ঐ আদেশ বাতিল করায় বোঝা যাচ্ছে যে বিএনপি–সমর্থক ঐ মহলটির লবিং ডঃ মনসুরের অপসারণের জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ী। নব–নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার তাঁদের পছন্দসই ব্যক্তিবর্গকে সরকারের বিভিন্ন পদে বসাবে—এতে কোন অস্বাভাবিকত্ব নেই। কিন্তু, ডঃ মনসুরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থনীতির বিপর্যয় যেভাবে সফলভাবে মোকাবেলা করেছে তাঁকে এভাবে অপসারণ কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না । তাঁর সাথে সৌজন্যমূলক আলাপ–আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি বাতিল করলে ব্যাপারটা নিন্দনীয় হতো না। ডঃ মনসুর হয়তো কর্মকর্তাদের কায়েমী স্বার্থ মোকাবেলায় দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেননি। কিন্তু, অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের গিরিখাতে পড়তে দেননি তিনি, যেজন্য জাতির কাছে তাঁর এই অবদান স্বীকৃতি পেলে সেটাই যথার্থ হতো। যেভাবে তাঁকে অপমানজনকভাবে বিদায় করে একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর নিয়োগ করা হলো তার মাধ্যমে প্রমাণ করা হলো যে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর ধামাধরা হওয়া গভর্নরের প্রধান বৈশিষ্ট্য হতেই হবে। এটা অর্থনীতির জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষত, খেলাপি ব্যাংকঋণের ব্যাপারে নতুন গভর্নরের দৃষ্টিভঙ্গি বেশি নমনীয় হলে তা ব্যাংকিং খাতে আবারো বিপর্যয় ডেকে আনবে। (জনাব মোস্তাকুর রহমানের মালিকানাধীন সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে প্রায় ৮৯ কোটি টাকার ব্যাংকঋণ রয়েছে)। অতীতে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার শাসনামলের বাংলাদেশ ব্যাংকের দু’জন গভর্নর ফজলে কবির এবং আবদুর রউফ তালুকদারের দুর্বল ভূমিকার কারণেই দেশের ব্যাংকিং খাতে লুটপাটতন্ত্র শক্তিশালী হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক হলো ফাইনেন্সিয়াল সেক্টরের নীতি–নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, তাই ব্যাংকগুলোকে স্বাধীনভাবে ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারে গভর্নরের ভূমিকা সবসময় সরকারের পছন্দসই না হওয়াই স্বাভাবিক। ডঃ মনসুর বিএনপি সরকারের আজ্ঞাধীন হবেন না বুঝতে পেরেই হয়তো তাঁকে এভাবে বিদায় করা হলো!
লেখক : সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়












