ড. মইনুল ইসলামের কলাম

| বৃহস্পতিবার , ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৭:৫০ পূর্বাহ্ণ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর ৮ আগস্ট প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। ইতোমধ্যেই ঘোষিত নির্বাচন তফশিল অনুসারে আগামী ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে অন্তর্বর্তী সরকার পদত্যাগ করার কথা রয়েছে। নির্বাচন যদি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হয় তাহলে সেটাই অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে ঐতিহাসিক সাফল্য বিবেচিত হবে। একইদিনে প্রস্তাবিত বিবিধ সাংবিধানিক সংস্কার ও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার সংক্রান্ত ‘জুলাই সনদ’ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য কিনা সেটা নির্ধারণের জন্য হ্যাঁ/না গণভোট অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। ঐ গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হলে পরবর্তী নির্বাচিত সংসদে ঐ প্রস্তাবগুলো গ্রহণের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হবে। এই দুটো পদক্ষেপই অন্তর্বর্তী সরকারের ঐতিহাসিক মিশন, যার ফলে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে ভবিষ্যতে স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশংকা অনেকখানি দূর হয়ে যাওয়ার কথা। তবুও বলতে হবে, এই দুটো পদক্ষেপ বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূসের আন্তরিকতা সম্পর্কে জনমনে দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টি হলেও দেশের প্রধান কয়েকটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না দেয়ায় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ থেকেই যাবে। অন্তর্বর্তী সরকার এই ইস্যুটাকে যথাযথ ভাবে মীমাংসা করতে পারেনি প্রধানত গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দানকারী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছাত্রছাত্রীদের চরম বিরোধিতার কারণে। এসব ছাত্রদের মধ্যে অধিকাংশই ইসলামী ছাত্র শিবিরের ক্যাডার বলে ইতোমধ্যেই চিহ্নিত হয়েছে। অতএব, এই ইস্যুতে জামায়াতে ইসলামীর বিরোধিতা প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে বিরাজমান। একইসাথে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব যে কোন মূল্যে নিজের কাছে ধরে রাখতে পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনাও মরিয়া তৎপরতা অব্যাহত রাখায় তাঁর বিরুদ্ধে গিয়ে অন্য কোন নেতানেত্রী আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের দায়িত্ব নিতে সাহস পাননি। সেজন্য, বিষয়টি অমীমাংসিত রয়েই গেলো।

এই দুটো বিষয় ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য বিবেচিত হবে সরকারের নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করার জন্য অধ্যাদেশ প্রণয়ন। এই ব্যাপারটাতে সদ্যঅবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমদের ঐতিহাসিক অবদানকে জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। এটর্নি জেনারেল ঠিকই বলেছেন, তিনি ছিলেন এব্যাপারে গ্রীকপূরাণের ‘প্রমিথিউসের’ মত দৃঢ়চেতা ও লক্ষ্যপূরণে একাগ্র। অবসর গ্রহণের মাত্র কয়েকদিন আগে তিনি বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠার কাজটি সম্পন্ন করে বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতার রক্ষাকবচটি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। এর আগে বিচার বিভাগে বিচারকদের নিয়োগ, পদোন্নতি, চাকুরিপরিবর্তন ও ট্রান্সফারের পুরো ক্ষমতা তিনি নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করে গেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৪ বছরে কোন সরকারই এই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাটি বাস্তবায়ন করে যায়নি। ভবিষ্যতেও যাতে কোন সরকার আমলাতন্ত্রের ফাঁদে পড়ে আবার বিচার বিভাগকে কুক্ষিগত করার অপতৎপরতা চালাতে না পারে সে ব্যাপারে জাতিকে সদাজাগ্রত থাকতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের জন্য প্রফেসর ইউনূস ও উপদেষ্টাদেরকে অভিনন্দন।

অন্তর্বর্তী সরকারের আরেকটি বড় সাফল্য হতে পারত পুলিশ কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত। কিন্তু ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা হলো, প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশনে আমলাতন্ত্র ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সরকারের কর্তাব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণের নানা ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে ওটাকে অনেকখানি ক্ষমতাহীন করার অপতৎপরতা চালানো হয়েছে। অতএব, আগামী দেড় মাসের মধ্যে এই প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশটিকে পুনরায় ঝালাই করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য। স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা দেশের পুলিশ বাহিনীকে তাঁর আজ্ঞাবহ লাঠিয়াল বাহিনীতে রূপান্তরিত করে ফেলায় তাঁর সরকারের পতন ঠেকানোর জন্য পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালিয়ে প্রায় দেড় হাজার মানুষকে হত্যা করেছে এবং প্রায় কুড়ি হাজার মানুষকে আহত, পঙ্গু ও অন্ধ করে ফেলেছে। (শেষের দিকে পুলিশ বাহিনীকে বলা হতো ‘গোপালী বাহিনী’)। এহেন হত্যাযজ্ঞ এদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কলংকজনক অধ্যায় রচনা করে ফেলেছে। উপরন্তু, পুলিশ কর্মকর্তাকর্মচারীদের মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশ ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজ বলে বদনাম দৃঢ়মূল হয়ে রয়েছে জনমনে। এই ব্যাপারটির কোন সুরাহার রাস্তা দেখাতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার, যা তাদের একটি বড়সড় ব্যর্থতা।

অন্তর্বর্তী সরকারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে প্রায় দেউলিয়াত্বের গিরিখাতে উপনীত ব্যাংকিং সিস্টেমকে স্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে আসার মাধ্যমে। পতিত স্বৈরশাসক হাসিনার সাড়ে পনেরো বছরের শাসনামলে সবচেয়ে বেশি লুন্ঠনের শিকার হয়েছিল ব্যাংকিং খাত, যার ফলে ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ১১টি ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল। দেশে ৬১টি ব্যাংকের প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও হাসিনার খামখেয়ালি সিদ্ধান্তে তাঁর আত্মীয়স্বজন, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা এবং হাসিনার পৃষ্ঠপোষকতায় অলিগার্ক ব্যবসায়ী ও ‘রবার ব্যারনে’ পরিণত হওয়া লুটেরাদেরকে পুঁজিলুন্ঠনের অবিশ্বাস্য সুযোগ করে দেওয়ার জন্য এতগুলো ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান করেছিল স্বৈরশাসক হাসিনা। এই এগারটি ব্যাংকের মধ্যে চট্টগ্রামের কুখ্যাত ব্যাংকলুটেরা এস আলম কর্তৃক লুন্ঠিত নিচে উল্লিখিত সাতটি ব্যাংক অন্তর্ভুক্ত ছিল: ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, এসআইবিএল, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, কমার্স ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক এবং আলআরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। একজন ব্যক্তিকে সাতটি ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করতে দেওয়ার দ্বিতীয় নজির বিশ্বের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত এস আলম তার নিয়ন্ত্রণাধীন সাতটি ব্যাংক থেকে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা লুটে নিয়ে বিদেশে পাচার করে দিয়েছে। পতিত সরকারের ভূমি মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী লুটে নিয়েছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংককে। পতিত হাসিনার উপদেষ্টা সালমান রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন ব্যাংকে খেলাপিঋণ পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকারও বেশি। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, দেশের বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে এই সমস্যার কোন কূলকিনারা পেতে হলে অবিলম্বে প্রত্যেক ব্যাংকের শীর্ষ দশ ঋণখেলাপিকে দ্রুত বিচারের আওতায় নিয়ে আসার জন্য তিন/চারটি ‘খেলাপিঋণ ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কারণ, ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে আপিল করা যায় না, যার ফলে বছরের পর বছর মামলাগুলোকে ঝুলিয়ে রাখা যায় না। এব্যাপারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মহোদয়ের দ্বিধা ও নিষ্ক্রিয়তা দুর্বোধ্য ও অগ্রহণযোগ্য। যেসব রাঘববোয়াল ঋণখেলাপি বিদেশে পালিয়েছে তাদের খেলাপিঋণ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে আদায় করার ব্যাপারে আমি মোটেও আশান্বিত নই। কিন্তু, ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠিত হলে দ্রুত তাদের এদেশে থাকা কলকারখানাসহায়সম্পদ সরকার ক্রোক করে নিতে পারবে। উপরন্তু, অদূর ভবিষ্যতে দেশে নতুন করে ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’ হওয়ার প্রবণতা দূরীভূত হয়ে যাবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতা। দেশে মবসন্ত্রাস গত ষোল মাসেও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি সরকার। মবসন্ত্রাসে সবচেয়ে ভয়ংকর তান্ডব চালাচ্ছে জামায়াতশিবির। তাদেরকে দমনের কোন উল্লেখযোগ্য তৎপরতাই চালাচ্ছে না সরকার, এই সরকারের সবচেয়ে অযোগ্য উপদেষ্টা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। পুলিশ বাহিনী প্রায়শই নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে চলেছে। তারপরের অবস্থানে রয়েছে দুর্নীতি দমনে সরকারের ব্যর্থতা। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাগ্রহণের কয়েকদিনের মধ্যেই অনেকগুলো সংস্কার কমিটি গঠন করে, যেগুলোকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে সরকারের কাছে প্রতিবেদন প্রদানের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। ঐ সংস্কার কমিটিগুলোর মধ্যে দুর্নীতি দমনে সরকারের করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ প্রদানের দায়িত্ব প্রদান করা হয় ড: ইফতেখারুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন কমিটিকে। যেহেতু ড: ইফতেখারুজ্জামান বেশ কয়েক বছর ধরে দুর্নীতিবিরোধী গবেষণা সংস্থা ‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের’ নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন তাই আমরা খুবই আশ্বস্ত হয়েছিলাম যে তার নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশগুলো খুবই কার্যকর প্রমাণিত হবে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যখন কমিটির সুপারিশমালা সরকারের কাছে প্রদান করা হয়েছিল তখন সুপারিশগুলো সম্পর্কে বেশ কিছুটা আশাহত হয়েছিলাম, কারণ আমার মনে হয়েছিল যে কমিটি সমস্যাটার সমাধানে খুব সাহসী সুপারিশ প্রণয়নে ব্যর্থ হয়েছিল। তবুও সরকার সুপারিশগুলোর বাস্তবায়নে নিষ্ঠার সাথে এগিয়ে যাবে বলে আশা করেছিলাম। কিন্তু, রিপোর্ট প্রদানের এক বছর পার করে এসে এখন আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে সরকার এব্যাপারে ডাহা ফেল্‌ মেরেছে। ২০০১ সাল থেকে ২০০৫ সাল বাংলাদেশ বার্লিনভিত্তিক দুর্নীতিগবেষণা সংস্থা ‘ট্রান্সপারিন্সি ইন্টারন্যাশনাল’ কর্তৃক প্রণীত ‘করাপশান পার্সেপশান ইনডেক্সে’ পরপর পাঁচবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ঘোষিত হয়েছিল। ২০২৪ সালেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তানের পর সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বাংলাদেশ। অতএব, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার মিশনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া সমীচীন ছিল দুর্নীতিদমন। কিন্তু, জনমনে ইতোমধ্যেই ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে সরকার সাংবিধানিক সংস্কার কিংবা নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কারে যতখানি আন্তরিক তার তুলনায় দুর্নীতি দমনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে অনীহা দেখিয়ে চলেছে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার আমলে বেধড়ক দুর্নীতি, পুঁজিলুন্ঠন ও পুঁজিপাচারের সংস্কৃতি চালু হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা থেকে উৎখাত হয়ে প্রাণভয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া পর্যন্ত সাড়ে পনেরো বছরের স্বৈরশাসন হাসিনাকে সুযোগ করে দিয়েছিল বেলাগাম লুটপাট করতে। শেখ হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের একটি শ্বেতপত্রের দাবি করা হয়েছে যে ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিস্তৃত শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনামলে বাংলাদেশ থেকে মোট ২৩৪ বিলিয়ন ডলার লুন্ঠিত হয়ে বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি লুন্ঠিত হয়েছে ব্যাংকিং খাত, এরপর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত, ভৌত অবকাঠামো খাত এবং তথ্য প্রযুক্তি খাত। বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের ২৩৪০ শতাংশ পর্যন্ত নাকি লুটপাট হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং, ভারত এবং কয়েকটি ‘ট্যাক্স হেভেন’ সবচেয়ে বেশি অর্থপাচারের সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কমপক্ষে আগামী এক দশক ধরে দেশের অর্থনীতির অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে হাসিনার আমলের এই দুর্নীতির কারণে। হাসিনার শাসনামলে একের পর এক অপ্রয়োজনীয় ও স্বল্পপ্রয়োজনীয় মেগাপ্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পাশাপাশি সারা দেশে বেলাগামভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে শত শত উন্নয়ন প্রকল্প। মেগাপ্রকল্পসহ সকল প্রকল্পে প্রকৃত ব্যয়ের তিনচার গুণ বেশি ব্যয় দেখানোর মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা, যেজন্য এসব প্রকল্পের ব্যয় ‘বিশ্বের সর্বোচ্চ’ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। হাসিনার পতিত স্বৈরাচারী সরকার ‘ডেটা ডক্টরিং’ এর মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু জিডিপি প্রশংসনীয় গতিতে বাড়ার গল্প সাজিয়ে দেশটাকে লুটেপুটে ছারখার করে দিয়েছে, যে অর্থের সিংহভাগই বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। এই পুঁজিলুন্ঠনের কেন্দ্রে ছিল হাসিনাপুত্র জয়, রেহানাকন্যা টিউলিপ ও রেহানাপুত্র রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকী ববি, শেখ ফজলুল করিম সেলিম ও তার পুত্র শেখ ফাহিম, শেখ হেলাল, তাঁর ভাই শেখ জুয়েল ও তাঁর পুত্র শেখ তন্ময়, সেরনিয়াবাত হাসনাত আবদুল্লাহ ও তাঁর পুত্র সাদিক আবদুল্লাহ, শেখ তাপস, শেখ পরশ, লিটন চৌধুরী ও নিক্সন চৌধুরী এবং হাসিনার অন্যান্য আত্মীয়স্বজন। আর ছিল এস আলম, সালমান রহমান, সামিটের আজিজ খান, বসুন্ধরার আকবর সোবহান, ওরিয়ন গ্রুপের ওবাইদুল করিম ও নাসা গ্রুপের নজরুল ইসলাম মজুমদারের মত লুটেরা অলিগার্ক ব্যবসায়ী এবং হাজার হাজার লুটেরা রাজনীতিবিদ ও দুর্নীতিবাজ আমলা।

অন্তর্বর্তী সরকারের আরেকটি ক্ষতিকর ব্যর্থতা এসেছে সরকারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জামায়াতশিবির ও তাদের ক্যাডারদের পদ দখলের মাধ্যমে। এটা পুরো দেশটিকে ক্রমশ জামায়াতে ইসলামীর তালেবানমার্কা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাবে। আগামী নির্বাচনে যদিও বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীরা জয়লাভ করে তবুও জামায়াতশিবির তাদের বিরুদ্ধে সহিংস তৎপরতা চালিয়ে সরকারকে ব্যর্থ করার মিশনে নেমে পড়বে। সম্প্রতি জামায়াতশিবিরের সন্ত্রাসীরা প্রথম আলো, ডেইলী স্টার, ছায়ানট ও উদীচীর বিরুদ্ধে ভাঙচুর ও অগ্নিসন্ত্রাসের যে ভয়াবহ তান্ডব চালিয়েছে তার মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়ে গেছে এদেশকে ‘তালেবানি আফগানিস্তান’ বানানোর তৎপরতা থেকে পিছু হটবে না তারা। সাধু সাবধান!

লেখক : সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

পূর্ববর্তী নিবন্ধক্রমশ বিলুপ্তির পথে সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠনগুলোর কার্যক্রম!
পরবর্তী নিবন্ধশিক্ষার্থীদের মেধা-মননের বিকাশই শহীদ লিয়াকত স্মৃতি সংসদের লক্ষ্য