ওবায়দুল্লাহ খান ছিলেন খুবই সদালাপী মানুষ। তিনি চট্টগ্রামের ডিসি হয়ে এসেছিলেন ৬০ এর দশকে। আমাদের পত্রিকা থাকায় বিভিন্ন কারণে মাঝেমধ্যে তাঁর কাছে যেতে হতো। তিনি আমাকে আপন করে নিয়েছিলেন। আমাদের বয়সের ব্যবধান ছিল। তাই বন্ধুত্ব বলব না, তাঁর সাথে আমার বেশ সখ্য গড়ে উঠেছিল। সময় সুযোগ পেলেই তিনি আজাদী অফিসে ফোন করে আমাকে খুঁজতেন। বলতেন– চলে আসুন, চা খাই। প্রায়ই যেতাম। সাহিত্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়েই আলাপ হতো।
সে সময় চট্টগ্রামের ডিসি মানে অনেক বড় ব্যাপার। ডিসির অনেক ক্ষমতা– ‘রাজার’ মত। কারণ শহরে যত সরকারি সংস্থা ছিল তার বেশিরভাগই ডিসির অধীনে ছিল। একদিন ওবায়দুল্লাহ খান সাহেবের ফোন পেয়ে গেলাম ডিসি অফিসে। কিছু কথাবার্তার পর হঠাৎ তিনি বললেন– আমি জানি, আপনার গাড়ি আছে। তাতেই আসেন। জানতে চাইলেন, আমি ড্রাইভিং জানি কিনা? বললাম, না এখনো ড্রাইভিং শিখিনি।
সে সময় হাতে চালানো কলিং বেল ছিল। এখনকার মত সুরের মূর্ছনা ছড়ানো মিউজিক্যাল ইলেকট্রিক বেল ছিল না। ওবায়দুল্লাহ খান সাহেব বেল বাজালে একজন পিওন বা সহকারী এসে হাজির হলেন। তাকে বললেন মোটর ভেহিক্যাল ডিপার্টমেন্টের প্রধানকে ডেকে আনতে। একটু পর তিনিও এলেন। তাকে আমার নাম পরিচয় জানালেন। বললেন, মালেক সাহেবকে একটা ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়ে দেন। ভদ্রলোক একটু অবাক হলেন। হয়ত বিস্ময় নিয়ে ভাবলেন– টেস্ট ড্রাইভ, পরীক্ষা এগুলোর কী হবে? যাহোক, ডিসি সাহেবের নির্দেশ। তিনি চলে গেলেন। কিছু সময় পর ফিরে এসে একটি কাগজ দিলেন ডিসি সাহেবের হাতে। ডিসি সাহেব সেটা এক নজর দেখে আমার হাতে তুলে দিলেন।
কাগজটি হাতে নিয়ে দেখলাম আমার নামধাম লেখা একটি ড্রাইভিং লাইসেন্স। সত্যিই বিস্মিত হলাম। এবং আনন্দিতও। ধন্যবাদ জানালাম ডিসি সাহেবকে। বললাম, আপনি যে আমাকে লাইসেন্স দিয়ে দিলেন– আমি যদি গাড়ি চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটাই তাহলে কী হবে?
ডিসি সাহেব সামান্য হাসলেন। তারপর যে উত্তর দিলেন তা এখনো আমি ভুলিনি। তিনি বললেন, আপনাকে কেন লাইসেন্স দিয়েছি জানেন? কারণ– You are the person on earth to have a driving license because you don’t know how to drive.
বিশ্বাস করুন, এরপর আমি ড্রাইভিং শিখলাম, ৫০ বছরেরও বেশি সময় গাড়ি চালিয়েছি। মহান আল্লাহতালার অপার কৃপায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটাইনি।
বহু বছর আগের একটি ঘটনা। বায়েজিদ রোড ধরে যাচ্ছিলাম গাড়ি নিয়ে। এক লোক রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। তাকে সতর্ক করার জন্য হর্ন দিলাম। হর্ন শুনেই সে দিল দৌড়। একেবারে এসে পড়ল গাড়ির সামনে। সজোরে ব্রেক কষলাম। তাকে কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম– কিরে ভাই, আপনি তো ঠিকই হাঁটছিলেন। হর্ন শুনে উল্টো দিকে দৌড় দিলেন কেন? আরেকটু হলে তো আপনিও যেতেন। আমারও দফারফা হয়ে যেত। সে হতচকিত চেয়ে রইল। বললাম, আপনি হয়ত ভেবেছিলেন– গাড়ি চলে গেলে রাস্তাও চলে যাবে। দেখুন, রাস্তা কিন্তু চলতে জানে না। গাড়ি চলে গেলেও রাস্তা যেখানে আছে সেখানে থেকে যাবে। ভবিষ্যতে এ কাজটি করবেন না। অন্যকে বিপদে ফেলবেন না।
গত ১৫ বছর গাড়ি চালাই না। কিন্তু গাড়ি নিয়ে আমার আগ্রহ, কৌতূহল কমেনি। সেই ১৯০৪ সালের হেনরি ফোর্ডের টি মডেল থেকে ইলন মাস্কের টেসলা– গাড়ির বিবর্তনের ইতিহাস পড়তে আমার ভালো লাগে। পড়ি। আমরা জানি– ফোর্ডের Model Tছিল সস্তা ও সাধারণ মানুষের জন্য তৈরি পেট্রোলচালিত প্রথম গাড়ি। এর মাধ্যমেই সূচনা হয় হয় গাড়ি উৎপাদন শিল্পের।। কিন্তু উনি এর নাম Model T কেন রেখেছিলেন? না, এই ঞ কোনো শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ নয়। হেনরি ফোর্ড যখন গাড়িকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসার অনবরত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তার প্রচেষ্টাগুলোর নাম দিয়েছিলেন ইংরেজি বর্ণমালার ক্রমানুসারে। অর্থাৎ Model A, Model B, Model C… এভাবেই আসে Model T– যেখানে তিনি সফল হন। এ রকম আরেকটি নাম Volkswagen. এটি জার্মান শব্দ। এর অর্থ জনগণের গাড়ি। আর ইলন মাস্ক তার ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (ইভি)-এর নাম ঞবংষধ দিয়েছেন বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলার নাম থেকে– যিনি অল্টারনেটিং কারেন্ট (AC Current) উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বহু আগে একবার জার্মানি গিয়েছিলাম। সরকারি উদ্যোগে আমাদের স্টুটগার্ট শহরের অদূরে সিন্ডেলফিঙেন নামক স্থানে মার্সিডিজ–বেঞ্জের কারখানা দেখাতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মার্সিডিজ গাড়ি দেখে আমার মনে হলো– এ রকম একটি গাড়ি আমার থাকলে ভালো হতো। মনে হলো মানে এখনই পেতে হবে এ রকম কোনো কথা নেই। এটি বিপজ্জনক চিন্তা। এর ৪০ বছর পর আমার মার্সিডিজ–বেঞ্জ গাড়ি হয়েছে। আমি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কিনতে পারতাম। সে পথে হাঁটিনি। নিজে উপার্জন করে সে গাড়ি কিনেছি।
মার্সিডিজ প্রসঙ্গ এলে বেঞ্জের প্রসঙ্গও আসে। কার্ল বেঞ্জ। জার্মান প্রকৌশলী। তার সম্পর্কে দুয়েকটা কথা বলেই লেখাটা শেষ করছি। আমরা সকলেই জানি– পেট্রোলচালিত গাড়ির উদ্ভাবন করেন তিনি। সেটা ১৮৮৫ সাল। পরের বছর এর পেটেন্ট নেন। যান্ত্রিক যানবাহনের নতুন যুগের সূচনা ঠিক তখন থেকেই। তার প্রথম উদ্ভাবিত গাড়িটি ছিল তিন চাকার। গাড়িতো বানালেন, কিন্তু এটি রাস্তায় বের করতেই শুরু হলো নতুন বিপত্তি। এর বিকট আওয়াজ, পেট্রোল পোড়া অসহনীয় গন্ধ আর ধোঁয়ায় অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন স্থানীয় লোকজন। তারা এটিকে বিপজ্জনক মনে করে অভিযোগ জানালেন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে। বেঞ্জ সাহেবও ছুটলেন সেখানে। বোঝালেন তার এ আবিষ্কারের মাহাত্ম্য। সব শুনে কর্তৃপক্ষ তাকে একটি লিখিত অনুমতি দিলেন– কোন কোন রাস্তা দিয়ে এ গাড়ি চালানো যাবে। সেখানে এটাও উল্লেখ করে দেয়া হলো এ গাড়ি চালাতে গিয়ে কোনো ঘটনা–দুর্ঘটনা ঘটনা ঘটলে তার দায়দায়িত্ব তার নিজেরই। এই লিখিত অনুমতিপত্রকেই বলা হয় পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম ড্রাইভিং লাইসেন্স।
পুরনো একটি প্রবাদ আছে– Behind every great man there’s a great woman. কার্ল বেঞ্জ যান্ত্রিক যান আবিষ্কার করলেন বটে, কিন্তু তার স্ত্রী বার্থা বেঞ্জ–এর সাহসিকতা ও সহায়তার কথাটিও আলোচনা দরকার। আমরা জানি, ‘He’ এর আগে একটি ‘S’ বসালে ‘She’ হয়। এই ‘S’ অক্ষর দিয়ে অনেক শব্দ লেখা যায়। আমার মতে এক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ প্রাসঙ্গিক শব্দটি হচ্ছে– ‘Success’. ‘He’ এর ‘Success’ এর পেছনে যার অনন্য অবদান থাকে তিনিই ‘She’. কার্ল বেঞ্জ এই গাড়ি আবিষ্কার করতে গিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়ে যান, তখন বার্থা তার নিজের গহনা বিক্রি করে স্বামীকে অর্থ সহায়তা দেন। গাড়ি তো আবিষ্কার হলো, কিন্তু এর কথাতো স্থানীয় গণ্ডীর বাইরে ছড়িয়ে পড়লো না। বার্থা এক সাহসী সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৮৮৮ সালের এক সকালে স্বামীকে কিছু না জানিয়ে বার্থা গাড়ি নিয়ে বের হয়ে পড়েন। সাথে তার দুই সন্তান। ১০৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছলেন আরেক শহরে। পথে গাড়ি বিগড়ে যায়। তিনি নিজেই মেরামত করলেন। মানে তিনিই হলেন পৃথিবীর প্রথম গাড়ি মেকানিক। জ্বালানি ফুরিয়ে গেল। তখন তো পেট্রোল পাম্প নেই। পেট্রোল পাওয়া গেল এক ফার্মেসিতে। সেই ফার্মেসিই পরবর্তী ইতিহাসে স্বীকৃতি পেল প্রথম পেট্রোল স্টেশন হিসাবে। বার্থার এই যাত্রাই বিশ্বে প্রথম লং–ডিস্ট্যান্স ড্রাইভ হিসেবে ইতিহাসে প্রবেশ করে। গাড়িটির কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা সাধারণ মানুষের কাছে প্রমাণিত হয়। স্ত্রীর এক সাহসী সিদ্ধান্তে কার্ল বেঞ্জের আবিষ্কার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়।










