জমি সংক্রান্ত জটিলতায় দীর্ঘ সময় আটকে থাকার পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে স্বপ্নের বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট স্থাপনে অবশেষে গত ৩০ মার্চ চীনের সাথে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রী জাহিদ মালেক ও চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভলপমেন্ট কো–অপারেশন এজেন্সির ভাইস চেয়ারম্যান ডেং বুকিং–এর উপস্থিতিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে দুপক্ষের মাঝে এ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠিত হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব ড. মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার ও চীনের পক্ষে ঢাকাস্থ চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন চুক্তিতে সই করেন।
আনুষ্ঠানিক চুক্তির পর মাস দেড়েকের মধ্যেই দেড়শ শয্যার বিশেষায়িত এ বার্ন ইউনিটের নির্মাণ কাজ শুরুর আশাবাদের কথা জানিয়েছিলেন সংশ্লিষ্টরা। প্রকল্পের জন্য চূড়ান্ত করা জায়গাটিও কাজ শুরুর উপযোগী করে তোলা হয়। তবে চুক্তির পর সাড়ে তিন মাস পার হলেও এখনো প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শুরু হয়নি। সহসাই যে শুরু হচ্ছে, সে সম্ভাবনাও অনেকটা ক্ষীণ। যদিও সেপ্টেম্বরে প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শুরুর বিষয়ে চীনা দলের সাথে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চমেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহসান। তবে সেপ্টেম্বরে কাজ শুরুর বিষয়টি এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয় বলেও জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আনুষ্ঠানিক চুক্তির পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু বিষয় সামনে আসে। এর মধ্যে প্রকল্পের ডিপিপি (ডেভলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রফোজাল) প্রস্তুতের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। পরে একটি কমিটি গঠনের মাধ্যমে প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়নের কাজ শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরইমধ্যে ডিপিপির খসড়া প্রণয়নের কাজ শেষ হয়েছে। আগামী ২৫ জুলাই (মঙ্গলবার) এই খসড়া ডিপিপি চূড়ান্তকরণ সংক্রান্ত একটি বৈঠক ডাকা হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। চূড়ান্ত হলে সেটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে। সেখান থেকে প্রি–একনেক হয়ে সর্বশেষ ধাপ হিসেবে একনেকে অনুমোদনের জন্য যাবে। একনেকে এই ডিপিপি অনুমোদন প্রক্রিয়া শেষ হতে অন্তত কয়েকমাস সময় লাগতে পারে। এর আগ পর্যন্ত প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ শুরুর সম্ভাবনা কম বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ডিপিপি নিয়ে মঙ্গলবার মন্ত্রণালয়ে বৈঠকের তথ্য নিশ্চিত করে সারাদেশে বার্ন চিকিৎসা সম্প্রসারণে সমন্বয়কের দায়িত্ব পাওয়া ডা. সামন্ত লাল সেন আজাদীকে বলেন, বৈঠকে ডিপিপি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। তবে ডিপিপি অনুমোদন হওয়ার আগে নির্মাণ কাজ শুরু করা যাবে না, বিষয়টা তেমন না। এর আগেও প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শুরু হতে পারে।
যদিও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নির্মাণ কাজ শুরু করতে চীন থেকে প্রয়োজনীয় অধিকাংশ যন্ত্রপাতি আনা হবে চট্টগ্রামে। এসব যন্ত্রপাতি আনার ক্ষেত্রে ভ্যাট পরিশোধসহ আরো কিছু বিষয় রয়েছে। যা মীমাংসার ক্ষেত্রে ডিপিপির অনুমোদনের বিষয় সম্পৃক্ত।
চমেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহসান বলছেন, আমরা খুব করে চাই– সেপ্টেম্বরেই বিশেষায়িত বার্ন ইউনিটের নির্মাণ কাজ শুরু হোক। এ বিষয়ে চীনা দলের সাথে আমাদের আলোচনাও হয়েছে। তবে সেপ্টেম্বরে শুরু করা যাবে, এটি এখনো নিশ্চিত নয়।
এদিকে, প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শুরুর আগে চূড়ান্ত করা জায়গায় ফের ডিজিটাল সার্ভে করবে চীনা দল। এই ডিজিটাল সার্ভে পরিচালনায় চীন থেকে বেশ কিছু যন্ত্রপাতি চট্টগ্রামে আনা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এসব যন্ত্রপাতির শিপমেন্টও সম্পন্ন হয়েছে। এসব যন্ত্রপাতি এসে পৌঁছালে চীনের ৫ সদস্যের একটি টিম আসার কথা রয়েছে। তারাই নির্বাচিত জায়গাটির পুনরায় ডিজিটাল সার্ভে করবে। এক্ষেত্রেও কিছু সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন চমেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহসান।
চীনের সাথে সই করা চুক্তি অনুযায়ী– বিশেষায়িত এ বার্ন ইউনিট হবে দেড়শ শয্যার। এর মাঝে ১০টি আইসিইউ, শিশুদের জন্য ৫টিসহ মোট ২৫টি এইচডিইউ এবং অত্যাধুনিক তিনটি অপারেশন থিয়েটার থাকবে। জরুরি বিভাগের পাশাপাশি বর্হিঃবিভাগও থাকবে। প্রাথমিক ভাবে ৬ তলা ভবন নির্মাণের কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবনায়। তবে ভবনের ভিত্তি হবে ৮ তলা বিশিষ্ট। ভবনের প্রতি ফ্লোরে স্পেস থাকবে ১৬ হাজার বর্গফুট। বার্ন ইউনিটের ৬ তলা এই ভবনের পাশাপাশি ইক্যুইপমেন্ট (সরঞ্জাম) স্থাপনের জন্য একতলা বিশিষ্ট আলাদা আরেকটি ভবন নির্মাণ করা হবে। একতলা ভবনটিতে অঙিজেন প্ল্যান্ট, সাব–স্টেশন ও জেনারেটরসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য সরঞ্জাম স্থাপন করা হবে। প্রায় এক একর জায়গার উপর বিশেষায়িত এ বার্ন ইউনিট গড়ে তোলা হবে।
পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ২০ মিলিয়ন ইউএস ডলার (চীনা টাকায় প্রায় ১২০ মিলিয়ন ইউয়ান) ব্যয় নির্ধারণ করেছে চীনা কর্তৃপক্ষ। এর শতভাগই অনুদান সহায়তা। অর্থাৎ সম্পূর্ণ নিজেদের খরচে বিশেষায়িত এ বার্ন ইউনিট করে দেবে চীন। বার্ন ইউনিটের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতির সবই তারা দেবে।












