ডিজিটাল বাংলাদেশ, এই শব্দ দুটি এখন আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তার অংশ। সরকারি নথি, ব্যবসায়িক উপস্থাপনা, এমনকি ব্যক্তিগত আলোচনাতেও ডিজিটাল শব্দটি ঘুরে ফিরে আসে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বাড়ছে, মোবাইল অ্যাপের সংখ্যা বাড়ছে, অনলাইন সেবা বিস্তৃত হচ্ছে, সব মিলিয়ে বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় বাংলাদেশ দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সমাজের দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু এই অগ্রগতির ভেতরে ঢুকলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই ডিজিটাল রূপান্তর এখনো নামে হয়েছে, বাস্তবে নয়।
We Are Social -Gi Digital 2026 ; Bangladesh রিপোর্ট বলছে, দেশে বর্তমানে প্রায় ১৩৭ মিলিয়ন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৬৩ মিলিয়নের বেশি। তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডিজিটাল উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। কিন্তু একই রিপোর্ট এটাও দেখায় যে দেশের একটি বড় অংশ এখনো এই ডিজিটাল বাস্তবতার বাইরে। সংখ্যার বিচারে ডিজিটাল অগ্রগতি যেমন দৃশ্যমান, অভিজ্ঞতার বিচারে তা এখনো অসম।
এই অসমতার একটি বড় কারণ হলো, ডিজিটাল রূপান্তরকে আমরা প্রায়ই অবকাঠামো দিয়ে মাপি, ইন্টারনেট আছে কি না, অ্যাপ চালু হয়েছে কি না, ওয়েবসাইট খোলা হয়েছে কি না। কিন্তু ব্যবহারযোগ্যতা, দক্ষতা ও আস্থার প্রশ্নগুলো সেখানে আড়ালে থেকে যায়। অনেক সরকারি ও বেসরকারি সেবা কাগজে–কলমে ডিজিটাল হলেও বাস্তবে সাধারণ মানুষকে এখনো লাইনে দাঁড়াতে হয়, সহায়তা নিতে হয়, বা মাঝখানে দালালের ওপর নির্ভর করতে হয়। অর্থাৎ ডিজিটাল উপস্থিতি তৈরি হয়েছে, কিন্তু ডিজিটাল অভিজ্ঞতা হয়নি।
এই বাস্তবতা শহর ও গ্রামের ব্যবধানেও স্পষ্ট। শহরে যেখানে স্মার্টফোন, দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল পেমেন্ট সহজলভ্য, সেখানে অনেক গ্রামীণ এলাকায় এখনো নেটওয়ার্কের মান, ডিভাইস অ্যাফোর্ডেবিলিটি ও ডিজিটাল দক্ষতা বড় বাধা। ফলে ডিজিটাল সুযোগ কাগজে সবার জন্য থাকলেও বাস্তবে সবাই তা ব্যবহার করতে পারছে না।
নারীদের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান আরও প্রকট। Digital 2026 রিপোর্ট অনুযায়ী, ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো পুরুষদের তুলনায় কম। এর পেছনে প্রযুক্তির চেয়ে সামাজিক বাস্তবতাই বেশি কাজ করে, ডিভাইস ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ, অনলাইন হয়রানির ভয়, এবং নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশের অভাব। ডিজিটাল বাংলাদেশ যদি নারীদের জন্য নিরাপদ ও সহায়ক না হয়, তবে এই অগ্রগতি অসমই থেকে যাবে।
ডিজিটাল অর্থনীতির আরেকটি বড় স্তম্ভ হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উপস্থিতি বেড়েছে। কিন্তু এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য চোখে পড়ে, অনেকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আছে, কিন্তু ডিজিটালভাবে পরিচালিত নয়। অনলাইন পেজ আছে, কিন্তু ডেটা ব্যবহার নেই। বিজ্ঞাপন চলে, কিন্তু বিশ্লেষণ নেই। কনটেন্ট আছে, কিন্তু কৌশল নেই। ফলে ডিজিটাল সুযোগ থাকলেও তা থেকে প্রকৃত অর্থনৈতিক সুফল পাচ্ছে মূলত সীমিত একটি গোষ্ঠী।
এই অবস্থায় সামনে যে পরিবর্তনটি সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে, তা হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI। HubSpot–এর সাম্প্রতিক গ্লোবাল রিপোর্টগুলো দেখাচ্ছে, AI ইতিমধ্যে মার্কেটিং, কাস্টমার সার্ভিস ও কনটেন্ট ব্যবস্থাপনায় বড় ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। স্বয়ংক্রিয় কনটেন্ট তৈরি, ডেটা বিশ্লেষণ, গ্রাহকের আচরণ পূর্বাভাস, এসব এখন আর ভবিষ্যতের কথা নয়, বর্তমানের বাস্তবতা।
বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বড় প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো AI–ভিত্তিক টুল ব্যবহার করে কাজের গতি ও দক্ষতা বাড়াচ্ছে। কিন্তু এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন একটি ব্যবধান। যাদের ডিজিটাল ভিত্তি শক্ত, তারা অও গ্রহণ করতে পারছে। আর যাদের ডিজিটাল যাত্রাই এখনো অসম্পূর্ণ, তাদের জন্য অও আরও দূরের বিষয় হয়ে উঠছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে, ডিজিটাল বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে ‘AI–র বাংলাদেশ’ হয়ে উঠবে, যেখানে একটি ছোট অংশ প্রযুক্তির পূর্ণ সুবিধা নেবে, আর বড় অংশ শুধু দর্শক হয়ে থাকবে? যদি ডিজিটাল শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অ্যাক্সেস নিশ্চিত করা না হয়, তাহলে অও এই বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এখনো ডিজিটাল রূপান্তরকে অনেকাংশে প্রকল্পভিত্তিকভাবে দেখা হয়। একটি সেবা চালু হলো, একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি হলো, এতেই সাফল্য মাপা হয়। কিন্তু ডিজিটাল রূপান্তর প্রকল্প নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক ও কাঠামোগত পরিবর্তন। ব্যবহারকারীকে কেন্দ্র করে ডিজাইন না হলে, ডিজিটাল সেবা কেবল একটি নামফলকে পরিণত হয়।
বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের মুখোমুখি। একদিকে ডিজিটাল সুযোগ দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে সেই সুযোগ গ্রহণের সক্ষমতা সবার সমান নয়। এই ব্যবধান যদি এখনই গুরুত্ব দিয়ে না দেখা হয়, তাহলে ডিজিটাল অগ্রগতি সমাজে নতুন বিভাজন তৈরি করবে।
ডিজিটাল বাংলাদেশের সাফল্য নির্ধারিত হবে কেবল কতজন অনলাইনে এসেছে দিয়ে নয়, বরং কতজন কার্যকরভাবে অংশ নিতে পারছে দিয়ে। কতজন শিখছে, কতজন কাজ পাচ্ছে, কতজন নিজের জীবনমান উন্নত করতে পারছে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই প্রকৃত অগ্রগতির মাপকাঠি।
অও, অটোমেশন এবং ডেটা–নির্ভর সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের অর্থনীতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে। সেই ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে হলে এখনই আমাদের ডিজিটাল ভিত্তিকে শক্ত করতে হবে। নইলে ডিজিটাল বাংলাদেশ নামের যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, তা বাস্তবে পরিণত হবে কেবল সীমিত কয়েকজনের জন্য।
দিনের শেষে তাই প্রশ্নটি খুব স্পষ্ট, আমরা কি একটি নামমাত্র ডিজিটাল বাংলাদেশে সন্তুষ্ট থাকব, নাকি এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাইব, যেখানে ডিজিটাল ও অও সত্যিকার অর্থেই অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের হাতিয়ার হবে? এই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, কারা এগোবে আর কারা পিছিয়ে পড়বে।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক; লীড বাংলাদেশ লিঃ, চিফ ক্রিয়েটিভ অফিসার ও প্রতিষ্ঠাতা; লীড মার্কেটিং ইনকর্পোরেশন; কানাডা।











