বাংলাদেশে সামপ্রতিক বছরগুলোতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে একটি বাক্য খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, সেটি হলো ‘ডিজিটাল হতে হবে’। ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না, বিক্রি কম কিংবা নতুন গ্রাহক আসছে না; প্রায় সব সমস্যার সমাধান হিসেবে ডিজিটাল হওয়ার কথাই এখন বেশি শোনা যায়। এর ফলে লাখ লাখ এসএমই এখন অনলাইনে এসেছে। তারা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খুলেছে, হোয়াটসঅ্যাপে অর্ডার নিচ্ছে, ইনস্টাগ্রামে ছবি পোস্ট করছে এবং সিংহভাগ উদ্যোক্তাই নিয়মিত বিজ্ঞাপনও দিচ্ছে।
We Are Social–এর Digital ২০২৬: Bangladesh রিপোর্ট অনুযায়ী দেশে এখন প্রায় ১৩৭ মিলিয়ন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং ৬৩ মিলিয়নের বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী রয়েছে। অর্থাৎ গ্রাহক যে অনলাইনে আছে সেই বাস্তবতায় কোনো সন্দেহ নেই। তবুও বাস্তবতা হলো ডিজিটাল হওয়ার পরও বিপুলসংখ্যক এসএমই প্রত্যাশিত ফল পাচ্ছে না। অনেকের বিক্রি বাড়েনি, অনেকের গ্রাহক ধরে রাখা যাচ্ছে না আবার অনেক ব্যবসা কয়েক মাসের মধ্যেই অনলাইন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে যে ডিজিটাল কি আসলেই কাজ করে না নাকি আমরা ডিজিটাল মার্কেটিং বিষয়টিকে ভুলভাবে বুঝছি?
এই বিভ্রান্তির শুরুটা হয় ডিজিটাল হওয়ার সংজ্ঞা নিয়ে। অনেক এসএমই উদ্যোক্তার কাছে ডিজিটাল মানে স্রেফ একটি কাজ যেমন পেজ খোলা, পোস্ট দেওয়া এবং বুস্ট করা। কিন্তু ডিজিটাল কোনো এককালীন কাজ নয় বরং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। ডিজিটাল ব্যবসা মানে শুধু অনলাইনে পণ্য বিক্রি নয় বরং এর মানে হলো গ্রাহককে বোঝা, তার প্রয়োজনের ভাষায় কথা বলা, ধারাবাহিকভাবে বিশ্বাস তৈরি করা এবং সময়ের সাথে সেই সম্পর্ককে আরও শক্ত করা।
Digital ২০২৬ রিপোর্টে দেখা যায় যে বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা দৈনিক গড়ে ৩ ঘণ্টার বেশি সময় অনলাইনে কাটায়। অর্থাৎ মানুষ সময় দিচ্ছে ঠিকই তবে সেই সময়কে কাজে লাগানোর মতো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনেক এসএমই উদ্যোক্তার নেই। ফলে অনলাইন উপস্থিতি তৈরি হলেও সঠিক প্রভাব তৈরি হয় না এবং খুব দ্রুত সেই যাত্রা থেমে যায়।
এর একটি বড় কারণ হলো কৌশলের অভাব। অফলাইনে ব্যবসা শুরু করার আগে যেমন জায়গা নির্বাচন, ক্রেতা বিশ্লেষণ কিংবা পণ্যের দাম নির্ধারণ নিয়ে ভাবা হয়, অনলাইনে আসার সময় অনেক এসএমই উদ্যোক্তা এসব কিছুই পরিকল্পিতভাবে করেন না। কারা আমার প্রকৃত গ্রাহক, তারা কেন আমার কাছ থেকে পণ্য কিনবে, আমার সেবাটি অন্যদের থেকে আলাদা কোথায় কিংবা কেমন ধরনের কনটেন্ট তারা দেখে; এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না থাকলে ডিজিটাল উপস্থিতি অর্থহীন হয়ে পড়ে। ফলে নিয়মিত পোস্ট দেওয়া হয় এবং এডস বা বুস্টিং চললেও কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না। তখন উদ্যোক্তার মনে হয় যে ডিজিটাল প্রযুক্তি বুঝি কাজই করে না।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বর্তমান প্রতিযোগিতা এত বেশি যে শুধু ভালো পণ্য দিয়ে টিকে থাকা কঠিন। এখানে আলাদাভাবে চেনা যাওয়ার জন্য একটি স্পষ্ট ব্র্যান্ড পরিচয় প্রয়োজন। কিন্তু অধিকাংশ এসএমই প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সেই স্বকীয় পরিচয় অনুপস্থিত। একই ধরনের ছবি, একই ধরনের ভাষা আর একই ধরনের অফার যেন সব ব্যবসাকে একে অপরের ছায়ায় পরিণত করেছে। এই অবস্থায় গ্রাহক সিদ্ধান্ত নেয় শুধু পণ্যের দামের ভিত্তিতে। আর দামভিত্তিক এমন প্রতিযোগিতা এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।
Digital ২০২৬ রিপোর্টে দেখা যায় যে একজন অনলাইন ব্যবহারকারী একসঙ্গে একাধিক পেজ ও ব্র্যান্ড অনুসরণ করেন। অর্থাৎ গ্রাহকের সামনে বিকল্পের অভাব নেই। এই বাস্তবতায় নিজস্ব পরিচয়হীন ব্যবসাগুলো খুব সহজেই হারিয়ে যায়। ডিজিটালে এসএমইদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো অতিরিক্ত বিক্রিমুখী আচরণ। প্রায় প্রতিটি পোস্টেই অর্ডারের আহ্বান, ছাড়ের ঘোষণা কিংবা কেনার তাগাদা দেওয়া হয়। কিন্তু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মূলত মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগের জায়গা। গ্রাহক এখানে শুধু কিনতে আসে না বরং সে জানতে চায়, বুঝতে চায় এবং বিশ্বাস করতে চায়। যে ব্যবসা গ্রাহকের সমস্যার কথা বলে কিংবা নিয়মিত অভিজ্ঞতা শেয়ার করে তার প্রতি আস্থা তৈরি হয়। আর যে ব্যবসা শুধু বিক্রি করতে চায় সে খুব দ্রুতই গ্রাহকের চোখে বিরক্তিকর হয়ে ওঠে।
ডিজিটাল ব্যবসায় কনটেন্ট হলো ব্র্যান্ডের কণ্ঠস্বর। কিন্তু অনেক এসএমই কনটেন্ট তৈরির বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয় না। তাড়াহুড়ো করে তোলা ছবি, অনলাইন থেকে সংগৃহীত ছবি কিংবা অস্পষ্ট ও উদ্দেশ্যহীন লেখা দিয়ে তারা কোনো ধারাবাহিকতা ছাড়াই পোস্ট করতে থাকে। ফলে গ্রাহক বুঝতে পারে না এই ব্যবসা আসলে কী বলতে চায়। ভালো কনটেন্ট মানে কেবল সুন্দর ছবি নয় বরং ভালো কনটেন্ট মানে পরিষ্কার বার্তা এবং মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করার সক্ষমতা।
Digital ২০২৬ রিপোর্টে দেখা যায় যে বাংলাদেশের অনলাইন ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশ নতুন ব্র্যান্ড সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয় মূলত কনটেন্ট দেখেই। অথচ কনটেন্টের মানের প্রশ্নে অনেক এসএমই এখনও বেশ উদাসীন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ডেটা। কে দেখছে, কে সাড়া দিচ্ছে কিংবা কোন ধরনের কনটেন্ট কাজ করছে তার সবকিছুই জানা সম্ভব। কিন্তু বেশিরভাগ এসএমই এই ডেটা ব্যবহার করে না অথবা অনেকেই জানে না যে ডেটা কীভাবে সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হয়। সোশ্যাল এডসের পেছনে টাকা খরচ করে যদি সেটার সঠিক বিশ্লেষণ না করা হয় তবে কেন কাজ হলো না বা কী করলে আরও ভালো রেজাল্ট আসবে তা বোঝা যায় না। ডেটা ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া মানে হলো অনুমানের ওপর ব্যবসা চালানো যা ডিজিটালে কখনোই টেকসই নয়।
অনেকে ডিজিটালকে দ্রুত ফল পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখেন। এক বা দুই মাসে ভালো পরিমাণে বিক্রি না এলে তাদের মাঝে হতাশা কাজ করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ডিজিটাল একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। Digital ২০২৬ রিপোর্ট অনুযায়ী একজন ব্যবহারকারী কোনো ব্র্যান্ডে আস্থা রাখতে একাধিকবার সেই ব্র্যান্ডের কনটেন্ট ও অনলাইন উপস্থিতি দেখতে চায়। এই বিশ্বাস তৈরি হতে সময় লাগে। ডিজিটাল ব্যবসা এখন আর একক দক্ষতার বিষয় নয় বরং কনটেন্ট, গ্রাহক সেবা, বিজ্ঞাপন এবং বিশ্লেষণ মিলিয়ে একটি সমন্বিত দক্ষতার প্রয়োজন। কিন্তু অনেক এসএমই উদ্যোক্তা নিজেরাই সবকিছু করতে গিয়ে কোথাও সঠিক মান বজায় রাখতে পারেন না। আবার অনেকে অদক্ষ লোকের হাতে ডিজিটাল দায়িত্ব দিয়ে নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন।
অনলাইনে ব্যবসা করা মানেই আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা। সময়মতো ডেলিভারি না দেওয়া, অস্পষ্ট তথ্য প্রদান কিংবা দুর্বল গ্রাহক সেবা প্রদানের মতো বিষয়গুলো এসএমইদের বিশ্বাসযোগ্যতা দ্রুত নষ্ট করে দেয়। ডিজিটালে সুনাম গড়ে তুলতে দীর্ঘ সময় লাগে তবে সেই সুনাম নষ্ট হতে মোটেও সময় লাগে না।
পরিশেষে বলা যায় এসএমই উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল ব্যর্থতা আসলে প্রযুক্তির ব্যর্থতা নয়। এটি মূলত সঠিক বোঝাপড়ার ব্যর্থতা, কৌশলের ঘাটতি এবং ধৈর্যের চরম অভাব। ডিজিটাল হওয়া কোনো শর্টকাট রাস্তা নয় বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি যাত্রা যেখানে সঠিক পরিকল্পনা এবং সম্পর্ক গড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যে এসএমই এই বাস্তবতা বুঝে এগোতে পারবে সে অনলাইনে টিকে থাকবে। আর যারা ডিজিটালকে শুধু ট্রেন্ড বা দ্রুত লাভের পথ হিসেবে দেখবে তারা হতাশ হয়েই ফিরে আসবে।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক; লীড বাংলাদেশ লিঃ, চীফ ক্রিয়েটিভ অফিসার ও প্রতিষ্ঠাতা; লীড মার্কেটিং ইনকর্পোরেশন; কানাডা।











