মহাদেব সাহার কণ্ঠে একসময় ভেসে উঠেছিল এক গভীর আকুলতা– “করুণা করে হলেও চিঠি দিও, ভুলে গিয়ে ভুল করে একখানি চিঠি, দিও খামে।” যেন সেই একখানি চিঠিই ছিল অপেক্ষার সমস্ত মানে। হেলাল হাফিজও হারিয়ে যাওয়া দিনের দিকে ফিরে তাকিয়ে অনুনয়ের সুরে লিখেছিলেন– “এখন তুমি কোথায় আছো কেমন আছো, পত্র দিয়ো।” অক্ষর–ভেজা সেই পৃথিবীতে অপেক্ষা মানে ছিল ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি, আর প্রতিটি খাম খুলে পড়ত হৃদয়ের অদৃশ্য কম্পন। আজ সে সময় আর নেই–কাগজে ভেজা হাতের লেখা, মলিন খামের গন্ধ, কিংবা ভুল বানানের মাঝেও লুকোনো ভালোবাসার নিঃশব্দ ভাষা সবই হারিয়ে গেছে সময়ের দ্রুত স্রোতে।
তবু মানুষের যোগাযোগের ইতিহাস তো হঠাৎ করে শুরু হয়নি, কিংবা হঠাৎ করেই মিলিয়ে যায়নি। সুকান্তের সেই বিখ্যাত গান আজও কানে বাজে– “রানার ছুটেছে খবরের বোঝা হাতে, হাতে লন্ঠন, করে ঠনঠন তবু রানার ছোটে।” একদা খবর পৌঁছানোর জন্য মানুষ কত দূর ছুটেছে, কত রাত জেগেছে, কত ভয় আর ক্লান্তিকে জয় করেছে– সেই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় সংবাদ আর অনুভূতির বহমানতা কখনো থেমে থাকে না। আরও পেছনে গেলে মনে পড়ে কবি কালিদাসের অমর কাব্য ‘মেঘদূত’–যেখানে মেঘ হয়ে ওঠে দূত, আর আকাশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বিরহের ভাষা। ভাবা যায়, আজ থেকে প্রায় দু’হাজার বছর আগে এই ভারতবর্ষেই এক কবি কল্পনার ডানায় ভর করে মেঘের কাছে সঁপে দিয়েছিলেন তার প্রিয়ার উদ্দেশে সুখ–দুঃখের সমস্ত কথা!
আজ হয়তো আমাদের হাতে স্মার্টফোন, মুহূর্তেই পৌঁছে যায় বার্তা; কিন্তু সেই ধীর, গভীর অপেক্ষা–যেখানে যোগাযোগ মানেই ছিল ভালোবাসার পরীক্ষা–তা আর নেই। তবু কবিতা, গান আর স্মৃতির ভেতর দিয়ে সেই পুরোনো দিনের ডাক আজও ফিরে আসে–চিঠির ডাক, অপেক্ষার ডাক, মানুষের হৃদয় থেকে হৃদয়ে পৌঁছানোর নিঃশব্দ আকুল ডাক।
কালের বিবর্তন কখনো নিঃশব্দে আসে না, আবার কখনো এমন নিঃশব্দেই সবকিছু বদলে দেয় যে টের পাওয়া যায় অনেক পরে। একসময় যে চিঠি ছিল মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, আজ সে চিঠিই প্রায় বিলুপ্তপ্রায় এক স্মৃতি। হলুদ খাম, নীল খাম, পোস্টকার্ড–এসব শব্দ এখন নতুন প্রজন্মের কাছে প্রায় প্রত্নতাত্ত্বিক টার্ম। অথচ এক দশক আগেও বাংলাদেশে ডাক বিভাগ বছরে প্রায় ২২ কোটি চিঠি পরিবহন করত, যার বড় একটি অংশ ছিল ব্যক্তিগত হলুদ খামের চিঠি। আজ সেই সংখ্যার ধারেকাছেও নেই আমরা। ডিজিটাল বাংলাদেশের বাস্তবতায় চিঠি ধীরে ধীরে সরে গেছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে–কেবল প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে নয়, বদলে যাওয়া মানসিকতার কারণেও।
চিঠির যে মায়া, যে আবেগ, যে শারীরিক উপস্থিতি–তা এই প্রজন্ম কোনোদিন পুরোপুরি বুঝবে না। কারণ চিঠি ছিল কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ছিল অনুভবের এক পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা। একটি চিঠি লিখতে বসা মানেই সময় নেওয়া, নিজের ভেতরে ডুব দেওয়া, শব্দ বাছাই করা। হাতের লেখার ঢং, কালি চাপার ভঙ্গি, বানানের ভুল–সবকিছু মিলেই গড়ে উঠত একটি মানুষের স্বাক্ষর। আজকের প্রজন্মের কাছে যেখানে “ঝববহ” না হওয়াই উদ্বেগের কারণ, সেখানে একসময় দিনের পর দিন, মাসের পর মাস অপেক্ষা করাও ছিল ভালোবাসার অংশ। চিঠির সেই ধীরতা মানুষকে ধৈর্য শেখাত, অনুভব করতে শেখাত–যা দ্রুতগতির ডিজিটাল যোগাযোগে অনুপস্থিত।
আধুনিক যুগ যোগাযোগকে সহজ করেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। মোবাইল ফোন, এসএমএস, ইমেইল, ভিডিও কল–সব মিলিয়ে পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয়। প্রবাসে থাকা সন্তানের খবর নিতে আর মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয় না, প্রেমিক–প্রেমিকারাও আর ডাকপিয়নের পথ চেয়ে থাকে না। কিন্তু এই সহজতার আড়ালে হারিয়ে গেছে সম্পর্কের একটি গভীর স্তর। এখন কথা হয় বেশি, কিন্তু বলা হয় কম; বার্তা যায় দ্রুত, কিন্তু থেকে যায় না। চিঠির মতো করে আর কোনো মাধ্যম মানুষকে বসিয়ে রাখে না, ভাবতে বাধ্য করে না। ফলে যোগাযোগ থাকলেও অনুভূতির ভার কমে যাচ্ছে–এ যেন প্রযুক্তির সুবিধার সঙ্গে সঙ্গে এক নীরব মূল্য পরিশোধ।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান চিহ্ন হলো আমাদের চারপাশে পড়ে থাকা অব্যবহৃত ডাকবাক্সগুলো। শহরের অলিগলি, হাটবাজার কিংবা পুরোনো পাড়া– কোথাও কোথাও আজও দাঁড়িয়ে আছে মরিচা ধরা লাল ডাকবাক্স, যেন সময়ের কাছে পরাজিত এক নীরব সৈনিক। একসময় যেখানে মানুষ দূরদূরান্ত থেকে হেঁটে এসে চিঠি ফেলত, আজ সেখানে কেউ দাঁড়ায় না। ডাকপিয়নের সাইকেলের বেল, রানারের খবরের বোঝা–সবই হারিয়ে গেছে দৃশ্যপট থেকে। অনেক ডাকঘর আজ জরাজীর্ণ ভবনে কোনোমতে টিকে আছে; চিঠির অভাবে ব্যস্ততা কমেছে, সংকুচিত হয়েছে সেবাও। অথচ সারা দেশে এখনও প্রায় ৯ হাজার ৮৮৬টি ডাকঘর এবং প্রায় ৪০ হাজার কর্মকর্তা–কর্মচারী এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত–যারা এক হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যের ভার বহন করে চলেছেন।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়–সেই সোনালি স্মৃতিগুলো কীভাবে ভুলে থাকা সম্ভব? কীভাবে ভুলে যাই সেই দিনগুলোর কথা, যখন একটি চিঠি মানেই ছিল একটি ঘটনা? চিঠি আসবে কি না, কখন আসবে–এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই জমে উঠত গল্প, স্বপ্ন, আকুতি। ডাকবাক্স ছিল কেবল লোহার বাক্স নয়, ছিল মানুষের কল্পনার বাহন। একটি চিঠি ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই মনে হতো–এই তো, আমার কথা পৌঁছে গেল বহু দূরে, চোখের পলকে দেশ থেকে দেশান্তরে। আজ প্রযুক্তি আমাদের তাৎক্ষণিক ভ্রমণের সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু সেই কল্পনার উড়ান আর নেই।
চিঠি হয়তো এখন আর দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন নয়, কিন্তু মানুষের আত্মায় তার জায়গা অক্ষুণ্ন। চিঠি মানেই ছিল জীবন্ত শব্দ, ছোঁয়া যায় এমন ভালোবাসা, ধরে রাখা যায় এমন স্মৃতি। সময় বদলায়, প্রযুক্তি এগোয়–এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কিছু হারানো বিষয় কেবল হারিয়ে যায় না, তারা থেকে যায় স্মৃতির গভীরে, নস্টালজিক বেদনা হয়ে। তাই চিঠির কথা উঠলেই মন ভারী হয়, চোখের সামনে ভেসে ওঠে হলুদ খাম, নীল খাম, আর ডাকপিয়নের সেই হারিয়ে যাওয়া ডাক–যা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না, কিন্তু ভুলেও যাওয়া যাবে না।
আজকের প্রজন্মের কাছে একটুখানি থেমে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে–তোমরা কি কখনো অনুভব করেছো, যোগাযোগ মানে শুধু বার্তা পৌঁছানো নয়, বরং নিজের একটি অংশ কাউকে দিয়ে দেওয়া? তোমরা কি জানো, শব্দেরও ওজন থাকে, অপেক্ষারও একটি নিজস্ব ভাষা থাকে? যখন সবকিছু এক ক্লিকেই পাওয়া যায়, তখন কি আর অনুভবের গভীরতার প্রয়োজন পড়ে? ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কি আদৌ জানতে পারবে, ভালোবাসা কখনো কখনো ধীর হয়, দীর্ঘ হয়, অস্বস্তিকর অপেক্ষায় ভরা হয়–আর সেই অপেক্ষার মধ্যেই জন্ম নেয় সবচেয়ে টেকসই অনুভূতি? যদি একদিন প্রযুক্তি থেমে যায়, সার্ভার নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে, তখন তোমরা কীভাবে একে অন্যের কাছে পৌঁছাবে? কোন শব্দে লিখবে মনের কথা, কোন কাগজে রাখবে স্মৃতি? হয়তো তখনই বোঝা যাবে–চিঠি কেবল যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না, ছিল মানুষের আবেগ সংরক্ষণের এক অনন্য পদ্ধতি। প্রশ্নটা তাই শুধু চিঠির নয়, প্রশ্নটা আমাদের মানবিক উত্তরাধিকার নিয়ে–আমরা কী রেখে যাচ্ছি আগামী দিনের মানুষের জন্য?
চিঠির বিদায় যে কেবল স্মৃতির দীর্ঘশ্বাস না হয়ে সময়ের কঠিন বাস্তবতা–তার এক গভীর প্রতীক হয়ে উঠেছে ডেনমার্ক। প্রায় চার শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে যে দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে মানুষের ঘরে ঘরে চিঠি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে, সেখানে ৩০ ডিসেম্বর শেষবারের মতো চিঠি যাবে মানুষের দরজায়। ১৬২৪ সাল থেকে শুরু হওয়া এই ঐতিহ্যের অবসান হতে শুরু করেছে। প্রযুক্তির সর্বগ্রাসী বিস্তারে চিঠির প্রয়োজন সেখানে এতটাই কমে গেছে যে, ডাক বিভাগকে বিদায় জানাতে হচ্ছে হাজারের বেশি কর্মীকে, আর শহরের রাস্তা থেকে তুলে নেওয়া হচ্ছে শত শত নয়–হাজার হাজার লাল পোস্টবক্স। যে পোস্টবক্সগুলো একসময় ছিল অপেক্ষা, আশ্বাস আর আশার নীরব বাহক, সেগুলো আজ নিলামে বিক্রি হচ্ছে স্মারক হয়ে। ডিজিটাল সমাজ হিসেবে পরিচিত ডেনমার্কের এই সিদ্ধান্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয়–চিঠি হারিয়ে যাওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি এক বৈশ্বিক প্রবণতা, যেখানে ধীরে ধীরে মানুষের আবেগের বাহন জায়গা করে দিচ্ছে প্রযুক্তির নিরাবেগ দক্ষতাকে। চিঠির জায়গা নিচ্ছে পার্সেল, শব্দের জায়গা নিচ্ছে ডেটা, আর অপেক্ষার জায়গা নিচ্ছে তাৎক্ষণিকতা। ডেনমার্কের এই বিদায় যেন ভবিষ্যতের এক পূর্বাভাস–যেখানে চিঠি থাকবে ইতিহাসে, স্মৃতিতে, কিন্তু আর মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নয়।
সভ্যতা এগোয়, সেটাই স্বাভাবিক; কিন্তু প্রতিটি অগ্রগতির সঙ্গে কিছু না কিছু হারিয়েও যায়–আর সব হারানো জিনিসের ক্ষত সহজে ভরে না। চিঠি ছিল এমন এক মাধ্যম, যেখানে সময়, মন আর অনুভব একসঙ্গে বসবাস করত। আজ হয়তো আমরা আর চিঠি লিখি না, ডাকবাক্সের সামনে দাঁড়াই না, ডাকপিয়নের পথ চেয়ে থাকি না–কিন্তু চিঠির স্মৃতি আমাদের ভেতরে রয়ে গেছে এক অদৃশ্য উত্তরাধিকার হয়ে। সেই স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ শুধু দ্রুত যোগাযোগের যন্ত্র নয়; মানুষ আসলে গল্পের প্রাণী, অনুভবের ধারক। হয়তো কোনো একদিন, কোনো এক সন্ধ্যায়, কেউ আবার কলম হাতে নেবে–একটি চিঠি লেখার জন্য নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া মানবিকতার সঙ্গে নতুন করে কথা বলার জন্য। সেই আশাতেই চিঠি আজও মরে যায়নি; সে বেঁচে আছে আমাদের স্মৃতিতে, আমাদের দীর্ঘশ্বাসে, আমাদের নীরব আকুলতায়।











