ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর এক মাস পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বমুখি দাম আর নিজের জনসমর্থনে ভাটার টানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সংকটের মুখোমুখি।
তাকে এখন বেছে নিতে হচ্ছে অত্যন্ত কঠিন দুটি বিকল্পের একটি: হয় তাকে একটি সম্ভাব্য ত্রুটিপূর্ণ চুক্তির মাধ্যমে দ্রুত এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে অথবা সামরিক শক্তি বাড়িয়ে এমন এক দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের ঝুঁকি নিতে হবে যা তার প্রেসিডেন্ট পদকেই গ্রাস করে নিতে পারে। গত এক সপ্তাহ ধরে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা সত্ত্বেও ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছাড়াতে থাকা সংকটকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খেয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ এই সামরিক অভিযানের মধ্যে আরও একটি সপ্তাহ পার করলেন। ইরান এখনো নমনীয় হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখায়নি, বরং তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে রেখেছে এবং অঞ্চলজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে। খবর বিডিনিউজের।
বিশ্লেষকদের মতে, এখন মূল প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প কি এই সংঘাতের ইতি ঘটাবেন, না একে আরও বড় যুদ্ধে পরিণত করবেন? যাকে সমালোচকরা বলছেন ‘ইচ্ছাকৃত যুদ্ধ’, যা ইতিমধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি সরবরাহ সংকট তৈরি করেছে আর যার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত হয়েছে।
হোয়াইট হাউজের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প তার উপদেষ্টাদের বলেছেন–তিনি একটি ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ এড়াতে চান এবং আলোচনার মাধ্যমে এই সংকট থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন। জনসমক্ষে তিনি এই লড়াই চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে শেষ করার কথা বললেও সেই সময়সীমা এখন বেশ ‘নড়বড়ে’ বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, আলোচনা ব্যর্থ হলে বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পাকিস্তানের মাধ্যমে একটি গোপন চ্যানেলে ইরানের কাছে পাঠানো ১৫ দফার এক শান্তি প্রস্তাবসহ ট্রাম্পের কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন মরিয়া হয়ে এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে। কিন্তু তেহরানের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা আছে কি না, তা অস্পষ্টই রয়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথন প্যানিকফ বলেন, যুদ্ধ শেষ করার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে এখন সব বিকল্পই বেশ দুর্বল। চ্যালেঞ্জের একটি অংশ হলো, সন্তোষজনক ফলাফল কী হবে, তা নিয়ে স্পষ্টতার অভাব। হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা জোর দিয়ে বলেছেন, কমান্ডার–ইন–চীফ যখন মনে করবেন আমাদের উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে, তখনই ইরান অভিযান শেষ হবে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে আরও হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করছেন। তিনি ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, দাবি না মানলে স্থলবাহিনী নামিয়ে হামলা আরও জোরদার করা হবে। তার দাবি মেনে না নিলে সম্ভবত স্থল বাহিনীও ব্যবহার করা হতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি হয়তো শক্তি প্রদর্শন করে ইরানের কাছ থেকে ছাড় আদায়ের একটি কৌশল হতে পারে, তবে এতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী স্থল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে যা মার্কিন ভোটারদের ক্ষুব্ধ করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে আরেকটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট হতে পারে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র অধীনে ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে একটি বড় ধরনের চূড়ান্ত বিমান হামলা চালানো। এরপর ট্রাম্প বিজয় ঘোষণা করে যুদ্ধ শেষ করে দেবেন। তবে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে না দেওয়া পর্যন্ত এই বিজয় দাবি করা হবে অন্তঃসারশূন্য। কারণ ইউরোপীয় মিত্ররা এই জলপথ পাহারায় যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানানোয় ট্রাম্প ইতিমধ্যে নিজের বিরক্তি প্রকাশ করেছেন।












