টুপটুপ রিসোর্টের মালিক দুজন,আসামি কেন একজন?

ইনানীতে ১০ পর্যটকের মৃত্যু

| বুধবার , ২১ অক্টোবর, ২০২৬ at ৯:১১ পূর্বাহ্ণ

কক্সবাজারের ইনানীতে আগুন লেগে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের করা মামলায় টুপটুপ রেস্তোরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টের দুই মালিকের মধ্যে কেবল একজনকে আসামি করা হলো কেন, সেই প্রশ্ন সামনে আসছে। রিসোর্টের ওয়েবসাইটে মালিক হিসেবে তানভীর সুলতান মিয়া ও নিয়াজ মোর্শেদের নাম রয়েছে। কিন্তু উখিয়া থানার মামলায় কেবল তানভীর মিয়ার নাম রয়েছে। তার সঙ্গে আসামি করা হয়েছে কয়েকজন কর্মচারীকে।

কক্সবাজার জেলা আদালতের আইনজীবী সেজান এহসান বলছেন, মালিকদের মধ্যে কেবল একজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি তার কাছে বোধগম্য হচ্ছে না। আসামির তালিকার পাশাপাশি যে ধারায় এ মামলা করা হয়েছে তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। খবর বিডিনিউজের।

উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান বলছেন, প্রথমে একজনের নাম জানতে পেরে তারা আসামি করেছেন। এখন আরেকজনের নাম আসছে। আরও নাম পাওয়া গেলে সেগুলো মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে রিসোর্টের সাবেক এক কর্মী বলেছেন, গ্রেপ্তার হওয়া মামলার চার নম্বর আসামি জাহিদ হোসেন সুমনের বাড়ির পাশে নিয়াজ মোর্শেদের বাড়ি বলে শুনেছেন তিনি। নিয়াজ চট্টগ্রামে ইন্টারনেটের ব্যবসা করেন বলেও জানান তিনি। এর বেশি কোনো তথ্য তার জানা নেই। গ্রেপ্তার সুমনের বাড়ি চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি গ্রামে। নিয়াজ মোর্শেদের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক রিমন ঘোষ বলেন, তদন্ত চলছে, এখনই কিছু বলা যাবে না।

অগ্নিকাণ্ডের পর দায়ের করা মামলায় অবহেলাজনিত মৃত্যু ও গুরুতর আঘাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে চারজনের নাম ছাড়াও অজ্ঞাত পরিচয় আরও ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাদের মধ্যে একজন ব্যবস্থাপককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের অবস্থান ও ভূমিকা তদন্ত করছে পুলিশ।

তবে রিসোর্টের ওয়েবসাইটে মালিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া দুজনের মধ্যে কার নাম এজাহারে কীভাবে এসেছে, কারো নাম বাদ পড়েছে কি না এবং প্রত্যেকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী, এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।

রিসোর্টের ওয়েবসাইট ও এজাহারে কী আছে : রিসোর্টের ওয়েবসাইটের ‘অ্যাবাউট’ অংশে তানভীর মিয়া ও নিয়াজ মোর্শেদের ছবি ও নাম রয়েছে। সেখানে তাদের ‘ওনার্স’ বা মালিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। ওয়েবসাইটে তাদের যৌথভাবে অতিথিদের স্বাগত জানানোর বক্তব্যও রয়েছে। তবে মামলার এজাহার সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী মো. তানভীর সুলতান মিয়া, প্রধান ব্যবস্থাপক সাঈদ আহাম্মেদ, ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সাঈদ এবং সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন সুমনের নাম রয়েছে।

এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর উখিয়া থানার মামলাটির করা হয়েছে। মামলায় দণ্ডবিধির ৩০৪এ, ৩৩৮ ও ৩৪ ধারা উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার বাদী উখিয়া থানার উপপরিদর্শক আশিষ সূত্রধর। তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে উপপরিদর্শক রিমন ঘোষের নাম পাওয়া গেছে।

আরও নাম এলে মামলায় অন্তর্ভুক্ত হবে : মামলায় দুই মালিকের নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমানের সঙ্গে কথা হয়। মালিকের সংখ্যা ও তাদের নাম নিয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, প্রথমে আমরা একজনের নাম পেয়েছি, এখন আরেকজনের নাম আসছে। আরও নাম পাওয়া গেলে সেগুলো মামলায় অন্তর্ভুক্ত হবে।

রিসোর্টের আরেক মালিকের ঠিকানা জানতে চাইলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি। গ্রেপ্তার ব্যবস্থাপক সুমনকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ হলে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

ওসি বলেন, অগ্নিকাণ্ডে রিসোর্টের কাগজপত্র পুড়ে যাওয়ায় ট্রেড লাইসেন্সসহ নথি সংগ্রহে সমস্যা হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে নথি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।

মামলা করার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন আইনজীবীর : মামলার এজাহার পর্যালোচনা করে আইনজীবী সেজান এহসান আসামি নির্বাচন ও অভিযোগের ধারা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার ভাষ্য, ঘটনাটিকে কেবল অবহেলাজনিত মৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করা যথেষ্ট কি না, তা আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। তিনি বলেন, রিসোর্ট নির্মাণ ও পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা এবং পরিবেশগত বিধি মানা হয়েছিল কি না এসব প্রশ্ন তদন্তের কেন্দ্রে থাকা উচিত। তার অভিযোগ, এত মানুষের মৃত্যুর পরও এজাহারে মালিকদের ভূমিকা ও কর্মীদের দায় নির্ধারণের বিষয়টি যথেষ্ট স্পষ্ট নয়।

তিনি বলেন, এজাহার দেখে তার মনে হয়েছে, কর্মীদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে আসামি করা হয়ে থাকতে পারে, অথচ মালিকদের মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার নয়। তার মতে, তদন্তে প্রকৃত দায়িত্ব নির্ধারণ করে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

মামলায় দণ্ডবিধির ৩০৪এ ধারায় অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যু ঘটানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। একইসঙ্গে গুরুতর আঘাতের অভিযোগে ৩৩৮ ধারা এবং একাধিক ব্যক্তির অভিন্ন অভিপ্রায়ের ক্ষেত্রে ৩৪ ধারা উল্লেখ করা হয়েছে।

সেজান এহসান বলেন, দণ্ডবিধির ৩০৪এ ধারায় এমন বেপরোয়া বা অবহেলামূলক কাজের কারণে মৃত্যু ঘটানোর কথা বলা হয়েছে; যা অপরাধমূলক নরহত্যার পর্যায়ে পড়ে না। অন্যদিকে, ৩০৪ ধারায় অপরাধমূলক নরহত্যার জন্য আলাদা শর্ত রয়েছে, যার মধ্যে মৃত্যুর অভিপ্রায় বা মৃত্যু ঘটতে পারে এমন জ্ঞান থাকার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

আইনজীবীর মত, রিসোর্টের নিরাপত্তা ও অনুমোদনসংক্রান্ত বিধি জেনেশুনে অমান্য করা হয়ে থাকলে অভিযোগের প্রকৃতি আরও গুরুতর হতে পারে। তবে কোন ধারা প্রযোজ্য হবে, তা নির্ধারণে শুধু প্রাণহানির সংখ্যা বা অনুমোদনের ঘাটতিই যথেষ্ট নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাজ, জ্ঞান, অভিপ্রায় ও অবহেলার সঙ্গে মৃত্যুর সম্পর্কের প্রমাণ বিবেচনা করতে হবে।

গত শনিবার সকালে উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্তোরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগার পর সেখান থেকে উদ্ধার হয় ১০টি দেহাবশেষ। স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১১ জনের নিখোঁজ থাকার কথা জানিয়েছে প্রশাসন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
পরবর্তী নিবন্ধ‘শেষবার ফোনে মেয়ে বলেছিল, দুই মাস পর বাড়ি ফিরবে’