লোহাগাড়া ও সাতকানিয়া উপজেলাকে বিভক্ত করেছে টংকাবতী নদী। দুই উপজেলার মানুষের যাতায়াত সহজ করতে আমিরাবাদ ইউনিয়নের উত্তর–পশ্চিম আমিরাবাদের তিন খালের মুখ এলাকায় টংকাবতী নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। তবে প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় এক বছর আগে। অথচ এখনো নির্মাণ কাজ অসম্পূর্ণ। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আবার কাজ শুরু করলেও অগ্রগতি নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। সেতু নির্মাণ কাজ শেষ না হওয়ায় প্রতিদিন দুই উপজেলার হাজারো মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
জানা যায়, লোহাগাড়া–সাতকানিয়ার সীমান্তবর্তী স্থানে টংকাবতী নদীটি ডলু নদীর সাথে মিশেছে। টংকাবতীর সাথে আবার বোয়ালিয়া খালের স্রোতও মিশে একাকার। এই স্থানটি ‘তিন খালের মুখ’ বা ‘টর মুখ’ হিসেবে খ্যাত। স্মরণাতীতকাল থেকে লোহাগাড়া–সাতকানিয়ার অধিবাসীরা প্রতিকূল অবস্থায় যাতায়াত করে আসছেন। স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে নদী পারাপারের জন্য বহু বছর যাবত টর মুখে কাঠের সাঁকো তৈরি করে আসছেন। বর্ষাকালে পানি বেড়ে গেলে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতে হয়। অনেক সময় দুর্ঘটনাও ঘটে। এখানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। সেতু নির্মাণ হলে ঘুরপথে লোহাগাড়া সদর ও সাতকানিয়া সদরের সাথে দূরত্ব কমে যাবে। মানুষের সৌভাগ্যের সুবর্ণ রেখা প্রসারিত ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে। সেতুটি হবে সাতকানিয়া– লোহাগাড়ার মানুষের অন্যতম সেতুবন্ধন। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতার কারণে টংকাবতী নদীর উপর নির্মাণাধীন সেতুর কাজ দীর্ঘদিনেও শেষ হচ্ছে না।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, প্রোগ্রাম ফর সাপোর্টিং রুরাল ব্রিজেস কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এ ব্রিজ হচ্ছে। উত্তর–পশ্চিম আমিরাবাদ টংকাবতীর মুখ হতে কেয়াজুপাড়া, ভায়া উপজেলা হেড কোয়ার্টার দরবেশহাট জিসি, পুটিবিলা ইউপি এবং এম.চর হাট জিসি সড়কের (দরবেশ হাট ডিসি সড়ক) চেইনেজ শূন্য মিটারে ৯০.৯২ মিটার আরসিসি গার্ডার সেতু নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। প্রকল্পের ঠিকাদার মেসার্স নুর সিন্ডিকেটের স্বত্বাধিকারী নুর মোহাম্মদ। ব্যয় ধরা হয় ৮ কোটি ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৩৯৩ টাকা। চুক্তি অনুযায়ী কাজ শুরু তারিখ ২০২৩ সালের ২০ আগস্ট। আর কাজ শেষ করার সময় ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি। ২০২৩ সালের ২২ মার্চ ব্রিজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন সংসদ সদস্য প্রফেসর ড. আবু রেজা মুহাম্মদ নেজাম উদ্দিন নদভী। তবে নির্ধারিত সময়ে নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। এরপর একবার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু ওই মেয়াদেও কাজ শেষ হয়নি।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, দীর্ঘদিন পর পুণরায় শুরু করা হয়েছে টংকাবতী নদীর উপর নির্মাণাধীন সেতুর কাজ। সেতুর পশ্চিম পাশে অস্থায়ীভাবে টিন ও গাছ ব্যবহার করে একটি সাঁকো নির্মাণ করা হয়েছে। এই অস্থায়ী সাঁকো দিয়ে দুই উপজেলার মানুষকে ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে দেখা গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, বর্ষায় নদীতে পানি বাড়লে অস্থায়ী সেতুটি বিলীন হয়ে যাবে। সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে যোগাযোগ। তাই তারা দ্রুত নির্মাণাধীন সেতুর কাজ শেষ করে নিরাপদ ও নিরিবচ্ছন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় মোজাম্মেল হকসহ একাধিক কৃষক জানান, উত্তর আমিরাবাদের বিস্তৃর্ণ অঞ্চলে বর্তমানে প্রচুর রবিশষ্য উৎপাদিত হয়। ধান চাষাবাদ হয়। অপরদিকে, টংকাবতীর অপর পাড়ে বারদোনাসহ সাতকানিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে রবিশষ্য উৎপাদিত হয়। এলাকাবাসী এসব পণ্য যথাসময়ে বাজারজাত করতে পারেন না বলে ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। টংকাবতী নদীর উপর নির্মাণাধীন সেতুর কাজ কবে শেষ হবে তা প্রশাসনের কাছে জানতে চান তারা।
আবদুল হাকিমসহ একাধিক বিচারপ্রার্থী জানান, বর্তমানে সাতকানিয়া চৌকিতে উচ্চ আদালতের চৌকি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া সাতকানিয়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও লোহাগাড়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চট্টগ্রাম জেলা সদর হতে সাতকানিয়া উপজেলা সদরে স্থানান্তর করা হয়েছে। আদালতে যাতায়াত করতে হলে দক্ষিণ–পূর্ব লোহাগাড়ার লোকজনকে লোহাগাড়া বটতলী হতে যানবাহনে প্রথমে সাতকানিয়ার রাস্তার মাথা অতিক্রম করে ডলু ব্রিজ পর্যন্ত যেতে হয়। ফলে সময়ের অপচয় হয়। দুর্ভোগ বাড়ে। অনেক সময় বিচারপ্রার্থী দুর্ঘটনায় পতিত হন। যথাসময়ে আদালতে উপস্থিত হতে পারেন না। দ্রুত সেতুটি নির্মাণ হলে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ কমবে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে সেতু নির্মাণ কাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা জিয়াবুল হোসেন জানান, ঠিকাদার নুর মোহাম্মদ রাউজান উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার আন্দোলনে সরকার পতনের পর ঠিকাদার বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। তাই দীর্ঘদিন সেতুর নির্মাণ কাজ বন্ধ ছিল। সম্প্রতি পুনরায় কাজ শুরু করা হয়েছে।
লোহাগাড়া উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয়ের উপ–সহকারী প্রকৌশলী হামিদ হোসেন আজাদ জানান, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ঠিকাদার সেতুর নির্মাণ কাজ পুনরায় শুরু করেছেন। আশা করছি দ্রুত বাকি নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়ে যাবে।












