জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তৎপরতা

১ লাখ টন ক্রুড অয়েলবাহী জাহাজটিকে দ্রুত দেশে আনার চেষ্টা । প্রয়োজনে পরিশোধিত তেল আমদানি বাড়ানো হবে । বাসাবাড়িতে পেট্রোল-অকটেনের মজুদ নয়

হাসান আকবর | বুধবার , ১৮ মার্চ, ২০২৬ at ৬:১৯ পূর্বাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আটকে পড়া বাংলাদেশের ১ লাখ টন ক্রুড অয়েলবাহী জাহাজটিকে দ্রুত দেশে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। সৌদি আরবের বন্দর থেকে ক্রুড অয়েল নিয়ে চট্টগ্রামের পথে যাত্রা করেও হরমুজ প্রণালির অন্তত ৩৫ নটিক্যাল মাইল দূরে এসে জাহাজটি আবার আটকা পড়েছে।

বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) জাহাজটিকে দ্রুত হরমুজ প্রণালি পার করানোর জন্য ইরানি কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। অপরদিকে দেশে ডিজেলের সরবরাহ অব্যাহত রাখার জন্য পাইপলাইনে থাকা জাহাজগুলোকে সিডিউল থেকে কিছুটা এগিয়ে দেশে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে আগামী ২৪ মার্চ সিঙ্গাপুর থেকে চট্টগ্রামে আসার সিডিউল থাকলেও জাহাজটিকে আগামীকাল ১৯ মার্চ চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হচ্ছে। বিপিসি বলেছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। হুড়োহুড়ি এবং বাসাবাড়িতে তেল সংরক্ষণ করার ফলে কিছুটা সংকট তৈরি হয়েছে। বাসাবাড়িতে অবৈধভাবে গড়ে তোলা পেট্রোল এবং অকটেনের মজুদ অনেক ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করে বিপিসি বলেছে, এগুলো যেকোনো সময় বিস্ফোরণ এবং বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটাতে পারে।

সূত্রে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় প্রণালির উভয় দিকে অসংখ্য জাহাজ আটকা পড়েছে। এর মধ্যে বিপিসির এক লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড অয়েল) বোঝাই নর্ডিক পল্যাঙ নামের একটি মাদার ভ্যাসেল সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দর থেকে চট্টগ্রামের পথে যাত্রা করেও যুদ্ধের জন্য আটকা পড়ে। যুদ্ধে কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় ইরান সেটি বন্ধ করে দিয়েছে।

রাস তানুরা বন্দর থেকে গত ২ মার্চ নির্ধারিত সময়ে জাহাজটি বাংলাদেশের পথে রওনা হওয়ার কথা থাকলেও সেটি আটকা পড়ে। এই জাহাজে থাকা ১ লাখ টন ক্রুড অয়েল দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত একমাত্র পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির অন্তত ২৫ দিনের কাঁচামাল। এই ক্রুড অয়েল রিফাইনড করে ইস্টার্ন রিফাইনারি ডিজেল, পেট্রোল ও জেট ফুয়েলসহ বিভিন্ন ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করে। ক্রুড অয়েলের জাহাজটি না পৌঁছায় ইস্টার্ন রিফাইনারি সচল থাকা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে। আগামী ১৫/১৬ দিনের মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধনযোগ্য ক্রুড অয়েল ফুরিয়ে যাবে। এর মধ্যে নতুন জাহাজটি চট্টগ্রামে না পৌঁছালে এই রিফাইনারি বন্ধ হয়ে যাবে। বিপিসিকে জাহাজ সরবরাহ করে বিএসসি। বিএসসি নর্ডিক পল্যাঙ জাহাজটি ভাড়া করে। জাহাজটি আটকা পড়ার পর থেকে বিপিসি ও বিএসসি হরমুজ প্রণালি পার করে জাহাজটি দেশে নিয়ে আসার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

সূত্র বলেছে, নর্ডিক পল্যাঙ নামের মাদার ট্যাংকারটি সৌদি আরব থেকে চট্টগ্রামের পথে যাত্রা করে। কথা ছিল হরমুজ পার হয়ে সেটি চট্টগ্রামে পৌঁছাবে। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় জাহাজটি আবুধাবির জেবল ধান্না বন্দরের অদূরে এসে পুনরায় আটকা পড়ে। হরমুজ প্রণালি থেকে ৩৫ নটিক্যাল মাইল দূরত্বে জাহাজটি অবস্থান করছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বিপিসি ও বিএসসি ইরানি দূতাবাসসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে বাংলাদেশমুখী জাহাজগুলোকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ অব্যাহত রেখেছে।

বিষয়টি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ে কাজ চলছে উল্লেখ করে বিপিসির শীর্ষ একজন কর্মকর্তা গত রাতে আজাদীকে জানান, জাহাজটিকে হরমুজ প্রণালি পার করিয়ে নিয়ে আসতে পারলে আমাদের সংকট বহুলাংশে কেটে যেত। জেবল ধান্না বন্দর থেকে আগামী ২২ মার্চ থেকে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে অপর একটি মাদার ট্যাংকারের চট্টগ্রামে আসার কথা রয়েছে। এই জাহাজটিও ঠিকভাবে রওনা হতে পারে কি না তা নিয়ে সংশয় ব্যক্ত করে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, ইরানি কর্তৃপক্ষ ছাড় না দিলে হরমুজ পার হয়ে আসা সম্ভব নয়। বিপিসির উক্ত কর্মকর্তা বলেন, আমাদের সব জাহাজকে ছাড় দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছি।

এদিকে বিপিসি পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ পূর্ব দিকের দেশগুলো থেকে। এসব দেশ থেকে চট্টগ্রামে জাহাজ চলাচলে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। তাই পূর্বদিকের জাহাজগুলোর সিডিউলে কিছুটা পরিবর্তন এনে দেশে জ্বালানির যোগান নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বিপিসি উদ্যোগ নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে ৩০ হাজার টন পরিশোধিত ডিজেল নিয়ে একটি জাহাজ আগামীকাল চট্টগ্রাম পৌঁছাচ্ছে। জাহাজটির ২৪ মার্চ পৌঁছার কথা ছিল। ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি বাড়ানো হবে বলে বিপিসির একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, দেশে জ্বালানির সংকট নেই। প্রচুর তেল এবং গ্যাসবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছেছে। পাইপলাইনেও রয়েছে। পেট্রোল ও অকটেন নিয়ে যেভাবে সবাই হুড়োহুড়ি করছেন তার কোনো দরকার নেই। দেশের চাহিদার অকটেন ও পেট্রোলের ৯০ শতাংশের বেশি উৎপাদিত হয় দেশে, গ্যাসক্ষেত্রের তলানি থেকে। হরমুজ বা যুদ্ধের সাথে এই তেলের কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ অনেকে গাড়ির পাশাপাশি ড্রামভর্তি করে বাসাবাড়িতে পেট্রোলঅকটেন সংরক্ষণ করেছেন। অবৈধ এই মজুদ ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এগুলো যেকোনো সময় বিস্ফোরণ ও বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের কারণ হতে পারে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধজ্বালানিবাহী একটি জাহাজ বহির্নোঙরে, আরেকটি বন্দরে ভিড়বে শুক্রবার