জ্বালানি সংকটে হাজার হাজার নৌকা-ট্রলার

কমে গেছে মাছ আহরণ, প্রভাব বাজারে, জেলেদের জীবনে পেট্রোল পাম্পগুলো খোলা তেল না দেওয়ায় তেল পাচ্ছি না : জেলে

হাসান আকবর | বুধবার , ১ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:১৭ পূর্বাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পর অস্থিতিশীলতার মাঝে মৎস্যখাতে নিয়োজিত হাজার হাজার নৌকা ও ট্রলার জ্বালানি সংকটে পড়েছে। সমুদ্রে যেতে না পারায় অধিকাংশ নৌকা ও ট্রলার ঘাটে অলস পড়ে আছে। কমে গেছে মাছ আহরণ। এর প্রভাব পড়েছে মাছের বাজারে, বাড়ছে বাজারদর। এতে একদিকে জেলেরা পড়েছেন আর্থিক সংকটে, অন্যদিকে ভোক্তাদের গুণতে হচ্ছে বাড়তি দাম। তবে বড় স্টিল বডির ফিশিং ভ্যাসেলগুলো চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছে। গভীর সাগরে মাছ শিকারে নিয়োজিত এসব ভ্যাসেল পড়েছে প্রাকৃতিক সংকটে। সাগরে জেলি ফিশের দাপট এবং বৃষ্টি না হওয়ায় লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় মাছের পরিমাণও কমে গেছে।

বাংলাদেশের জলসীমার আয়তন প্রায় ১ লক্ষ ৬৬ হাজার বর্গকিলোমিটার, যা বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের চেয়ে বড়। টেকনাফ থেকে সাতক্ষীরা পর্যন্ত ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং সাগরের দিকে ২০০ নটিক্যাল মাইলের বিশাল এই জলসীমায় চারটি ফিশিং জোন রয়েছে। এগুলো হচ্ছে সোয়াস অব নো গ্রাউন্ড, সাউথ অব সাউথ প্যাসেজ, সাউথ প্যাসেজ ও মিডল গ্রাউন্ড। বঙ্গোপসাগরের এই বিস্তৃত এলাকা থেকে কয়েক লাখ টন মৎস্য শিকার করা হয়। এগুলোর মধ্যে ইলিশ, পোয়া, রূপচান্দা, দাতিনা, ছুরি, চউখ্যা, কাঁটা মাছ, লাক্ষ্মা, কামিলা, রূপবান, রাঙা চউখ্যা, লাল মাছ, মাইট্টা, লইট্টা, আইল্যা, বাগদা, চাগা, বাগাচামা, হরিণা, লইল্যা, নুইল্যা, নূয়া চাই, কাঁকড়া, স্কুইড ইত্যাদি আহরিত হয়। দেশীয় কয়েক হাজার ট্রলার ও নৌকা ছাড়াও সর্বাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে ১৭০টির মতো জাহাজ গভীর সাগরে মাছ শিকার করে। এসব মাছ স্থানীয় বাজারে বিক্রির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি হয়। কিন্তু ট্রলার থেকে জাহাজসবগুলো পরিচালনা করতে লাগে জ্বালানি।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার মৎস্যখাতে নিয়োজিত হাজার হাজার নৌকা ও ট্রলার জ্বালানি সংকটে পড়েছে। দিনের পর দিন অলস সময় কাটাচ্ছে শত শত নৌকা ও ছোট ট্রলার। প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের অভাবে তারা সাগরে যেতে পারছে না।

নগরীর ফিশারিঘাট, পতেঙ্গা, সীতাকুণ্ড ও সন্দ্বীপসহ উপকূলীয় এলাকায় খবর নিয়ে জানা গেছে, প্রয়োজনীয় জ্বালানির অভাবে নৌকা ও ছোট ট্রলারগুলোর কার্যক্রম মূলত বন্ধ হয়ে পড়েছে। জেলেরা বলছেন, তেল পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কোথাও চোরাই তেল ম্যানেজ করে বাড়তি দামে কিনলেও সাগরে পর্যাপ্ত মাছ না পাওয়ায় তাদের পোষাচ্ছে না। এই অবস্থায় তারা অলস সময় কাটাচ্ছেন।

কর্ণফুলী নদীর তীরে শত শত নৌকা ও ছোট ট্রলার নোঙর করে রাখা হয়েছে। জেলেরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। কেউ কেউ জাল মেরামত করে সুদিনের অপেক্ষা করছেন। জ্বালানি তেলের যোগান থাকলে তারা সাগরে গিয়ে মাছ ধরে আনতেন বলেও জানান।

সীতাকুণ্ড সমুদ্র উপকূলে ৪ হাজার জেলে পরিবারও সংকটে পড়েছে। জ্বালানির অভাবে জেলেরা সাগরে যেতে পারছেন না। আর্থিক সংকটের মাঝে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ভাটিয়ারীর মাছবাজারটি গত কয়েকদিন ধরে অনেকটা মাছশূন্য। এলাকার শত শত জেলে আগে প্রতিদিন এই বাজারে সন্দ্বীপ চ্যানেল এবং বঙ্গোপসাগরের উপকূল থেকে শিকার করে আনা মাছ বিক্রি করতেন। জ্বালানির অভাবে সাগরে যেতে না পারায় শত শত জেলে অলস সময় কাটাচ্ছেন।

সীতাকুণ্ড উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মুতাসিম বিল্লাহ বলেন, সীতাকুণ্ড উপকূলে দেড় হাজারের অধিক নৌকা রয়েছে। যেগুলো সাগরে মাছ ধরতে যায়। নৌকাগুলোতে ডিজেল সরবরাহ না পাওয়ায় তারা সাগরের মাছ শিকার করতে যেতে পারছে না।

ভাটিয়ারীর জেলেপাড়ার বাদল জলদাস বলেন, আগে আমরা ড্রামে বা বোতলে করে তেল নৌকায় নিয়ে যেতাম। এখন পেট্রোল পাম্পগুলো খোলা তেল সরবরাহ না দেওয়ায় আমরা কোনো তেল পাচ্ছি না। ফলে নৌকাগুলো বন্ধ রয়েছে। একজন জেলেও সাগরে যেতে পারছেন না বলে জানান তিনি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা না গেলে মৎস্যখাতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় ও খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে। এ অবস্থায় জেলেদের জন্য ভর্তুকি, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং বিকল্প সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। না হয় চট্টগ্রামের মৎস্যখাতের এই সংকট আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে বড় বড় ফিশিং জাহাজগুলোতে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন একাধিক জাহাজের মালিক। তারা বলেছেন, আমরা চাহিদামতো তেল পাচ্ছি। তবে সাগরে গিয়ে মাছ পাচ্ছি না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফিশিং ভ্যাসেলের একজন মালিক বলেন, সাগরে জেলিফিশের উৎপাত শুরু হয়েছে। জাল ফেললেই ভরে যাচ্ছে জেলিফিশে। অথচ এই জেলিফিশের কোনো দাম নেই। তাছাড়া বৃষ্টি না হওয়ায় সাগরে লবণাক্ততা বেড়েছে। তাই মাছের পরিমাণ কমে গেছে। এতে করে জ্বালানি পুড়িয়ে সাগরে গিয়ে পোষাচ্ছে না। জ্বালানি খরচও উঠছে না। তাই অনেক জাহাজ গত দুইতিন দিনে ফেরত এসেছে বলে জানান তিনি। আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে ৫৮ দিনের জন্য সাগরে মাছ ধরা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এখন মাছ শিকারের ভর মৌসুম। কিন্তু জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি সাগরে মাছের যে অবস্থা তাতে দেশের মৎস্য রপ্তানিসহ সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবন্দরে ভিড়ল ২৭ হাজার ৩০০ টন ডিজেলবাহী জাহাজ
পরবর্তী নিবন্ধগণভোটের প্রতি সম্মান দেখাতে সরকারের প্রতি আহ্বান জামায়াত আমিরের