জ্বালানি নিয়ে দুশ্চিন্তা নয়

পেট্রোল-অকটেনে সংকট নেই, ডিজেলও আসছে

হাসান আকবর | বুধবার , ১১ মার্চ, ২০২৬ at ৮:৩২ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) দেশের জ্বালানি তেলে রেশনিং চালাচ্ছে। এই রেশনিং তেলের সংকটের জন্য নয়, যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও যাতে দেশের মানুষ বেশিদিন তেল ব্যবহার করতে পারে তা নিশ্চিত করতে। কিন্তু রেশনিংয়ের কথা শুনে তেল নিয়ে প্যানিক ছড়ানো হলো। হাজার হাজার মানুষ মোটরসাইকেল এবং প্রাইভেট কার নিয়ে পেট্রোল পাম্পে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে পেট্রোল এবং অকটেন সংগ্রহ করতে লাগলেন। কোনো কোনো পেট্রোল পাম্পে গাড়ির লাইন এক কিলোমিটার দীর্ঘ হলো। পেট্রোল ও অকটেনের সাথে যুদ্ধের সম্পর্ক নেই। দেশে এই দুই ধরনের জ্বালানির কোনো সংকটও নেই। পেট্রোলঅকটেনের পুরোটা দেশে উৎপাদিত হয়। সামান্য পরিমাণে আমদানি করতে হয়। তবুও হুজুগে পড়ে মানুষ পেট্রোল ও অকটেনের জন্য লাইন ধরল।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় বা বিপিসি ডিজেল নিয়ে চিন্তায় আছে। পেট্রোলঅকটেনের ব্যাপারটি বিপিসির মাথায় ছিল না। বিপিসি রেশনিং শুরুর প্রথম দিন শুধুমাত্র ডিজেল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করেছে। পেট্রোলঅকটেন যে ডিপোর যা প্রয়োজন নিয়ে গেছে। কিন্তু ডিজেল রেশনিংয়ের খবর প্রকাশ হওয়ার পর দেশের প্রতিটি পেট্রোল পাম্প ঘিরে মানুষের ভিড় রেকর্ড ভঙ্গ করে। মাত্র ঘণ্টাকয়েকের মধ্যে পাম্পগুলোর সব তেল ফুরিয়ে যায়। পাম্প বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে যারা ‘পরে নেব’ ভেবে অপেক্ষা করছিল, তারাও গিয়ে পেট্রোল পাম্পে লাইন ধরল।

বিপিসি নানাভাবে বলার চেষ্টা করেছে, দেশে তেলের কোনো সংকট নেই। অবৈধ মজুদ ঠেকাতে এই রেশনিং। কিন্তু গাড়ির ট্যাংক ভরতি করার পর কেউ কেউ ড্রামও ভরতি করে। পরিস্থিতি দেখে বিপিসি পেট্রোল এবং অকটেনও রেশনিং শুরু করে এবং কোন ধরনের গাড়ি কী পরিমাণ তেল নিতে পারবে তার একটি সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দেয়। বিপিসি বলেছে, সবাই যাতে তেল পায় এবং কেউ যাতে অবৈধ মজুদের সুযোগ নিতে না পারে সেজন্য সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

বিপিসির সিনিয়র মহাব্যবস্থাপক মোরশেদ হোসেন আজাদ আজাদীকে বলেন, এই ধরনের পরিস্থিতিতে তেল ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি অনেক মৌসুমী ব্যবসায়ীও মাঠে থাকেন। তারা তেলের অবৈধ মজুদ গড়ে তোলেন। পরে বাড়তি দামে বিক্রি করেন। বিদ্যমান পরিস্থিতির সুযোগ যাতে কেউ নিতে না পারেন সেজন্য রেশনিং করা হচ্ছে। তিনি বলেন, যুদ্ধের প্রকৃত অবস্থা তো আমরা জানি না। কতদিন চলবে তাও জানি না। এই অনিশ্চয়তার মাঝে মানুষ যাতে দীর্ঘদিন জ্বালানি ব্যবহার করতে পারেন সেজন্যই আমরা রেশনিং করছি।

বিপিসির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে সংকট হলে ডিজেলের হবে, কিন্তু পেট্রোলঅকটেনের সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই। পেট্রোল ও অকটেন যে পরিমাণ মজুদ আছে বা যে পরিমাণ দেশে উৎপাদিত হয় তা দিয়ে জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে। বিপিসি পেট্রোলঅকটেন সামান্য পরিমাণে আমদানি করে। এই দুই ধরনের তেলের প্রায় পুরোটাই উৎপাদিত হয় গ্যাসক্ষেত্রের তলানির কনডেনসেট দিয়ে। যেগুলো দেশের বেসরকারি রিফাইনারিগুলো উৎপাদন করে বিপিসির মাধ্যমে বাজারজাত করে। তাছাড়া বর্তমানে পরিশোধিত তেল আসছে সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে। পূর্ব দিকে সমুদ্রপথে কোনো সমস্যা নেই, তাই পরিশোধিত তেল নিয়ে আরো কিছু সময় পাওয়া যাবে।

দেশে এখন পর্যন্ত জ্বালানি তেলের অভাব নেই। এর মধ্যে সংকটের সমাধান বা বিকল্প খুঁজতে সরকার নানাভাবে চেষ্টা করছে।

এদিকে দেশের পাম্পগুলোকে কেন্দ্র করে যত অশান্তি তা করছেন পেট্রোল ও অকটেন গ্রাহকেরা। অথচ মূল সংকট ডিজেলে। দেশে ব্যবহৃত প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানির ৬৭ শতাংশ ডিজেল। মাত্র ৬ শতাংশ পেট্রোল ও অকটেন। ডিজেলের পুরোটাই আমদানি করতে হয়। পেট্রোলঅকটেনের ৯০ শতাংশের বেশি পাওয়া যায় দেশীয় উৎস থেকে।

বিপিসি বলেছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। ডিজেল, পেট্রোল এবং অকটেনসহ সব ধরনের জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। হুট করে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পাম্পগুলোতে তেলের সাময়িক সংকট হয়েছে। এটি সামলে নেওয়া হচ্ছে। সরকার ডিজেল আমদানি নিরবচ্ছিন্ন রাখতে নানাভাবে চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে ভারত থেকে ৫ হাজার টন ডিজেল কিনেছে, যা গতকাল দেশে এসে পৌঁছেছে। গতকাল ও আগের দিন দুটি জাহাজে প্রায় ৫৫ হাজার টন ডিজেল চট্টগ্রামে এসে পৌঁছেছে। আগামী ১৫ মার্চের মধ্যে আসছে ৯০ হাজার টন ডিজেল নিয়ে আরো তিনটি জাহাজ। এভাবে ক্রমাগত জাহাজ আসতে থাকবে। পূর্বমুখী দেশ থেকে পরিশোধিত তেল আমদানির ফলে হরমুজ প্রণালি কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান পরিস্থিতির প্রভাব আপাতত এতে পড়ছে না।

পেট্রোল ও অকটেন নিয়ে বিরাজমান পরিস্থিতির প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, হুড়োহুড়ি করে পেট্রোল পাম্পের সামনে লাইন না ধরলে এসব হতো না। তারা বলেন, একজন পাম্প মালিক সকালে হয়তো এক ভাউজার (৯ হাজার লিটার) অকটেন ডেলিভারি এনেছেন। তিনি হিসেব কষেছেন, এই তেল দিয়ে একদিন ক্রেতাদের চাহিদা মেটানো যাবে। কিন্তু ওই পাম্পের সামনে শত সহস্র মানুষের লাইন মাত্র ঘণ্টাদুয়েকের মধ্যে নয় হাজার লিটার তেল শেষ করে দেয়। ফলে তৈরি হয় সংকট। এই সংকটকে পুঁজি করে অবৈধ মজুতদারি বা বাড়তি দাম হাঁকানোর সুযোগ তৈরি হয়। দেশে তেলের সংকট নেই, তাই হুড়োহুড়ি করে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করলে ভুগতে হবে। তেলের সংকটে যদি সত্যিই পড়ি, তাহলে ৫/১০ লিটার বা ৫০ লিটার তেলে কি শেষরক্ষা হবে?

পূর্ববর্তী নিবন্ধজ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চিন্তা নেই : প্রতিমন্ত্রী
পরবর্তী নিবন্ধযুদ্ধবিরতির প্রশ্নে অনড় ইরান