জ্বালানি নিরাপত্তায় সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে

| শুক্রবার , ১৩ মার্চ, ২০২৬ at ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ফিলিং স্টেশনে ভিড় করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই বলে মনে করেন। তিনি বলেন, মানুষের উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ আছে। তবে সরবরাহ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। মার্চে কোনো সরবরাহসংকট নেই। এপ্রিল ও মে মাসের সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রস্তুতি চলছে। এ ছাড়া আপাতত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই সরকারের। জ্বালানি তেলসংক্রান্ত সমসাময়িক বিষয় নিয়ে মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা বলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ফিলিং স্টেশনে মূলত পেট্রল ও অকটেনের জন্য ভিড় করছে। অথচ পেট্রল শতভাগ দেশে উৎপাদন হয়। অকটেনের সিংহভাগ দেশে উৎপাদন হয়। শিগগিরই সবার উৎকণ্ঠা কেটে যাবে। মোটরসাইকেল দিয়ে যারা রাইড শেয়ার করেন, তাদের ২০০ টাকার পরিবর্তে (দুই লিটার) তেল সরবরাহের সীমা পাঁচ লিটার করে দেয়া হয়েছে। অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, সরকার ইতিমধ্যে এপ্রিল ও মে মাসের পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিকল্প উৎস হিসেবে আফ্রিকা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল আমদানির বিষয়েও কাজ চলছে। বাংলাদেশে তেলের সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে ভারত সরকারকে অনানুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটি দেশের অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। অথচ সামপ্রতিক তথ্য বলছে, এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের মজুত সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, যেখানে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ৭৪ দিন, ভিয়েতনামে ৪৫ দিন কিংবা জাপানে ২৫০ দিনের জ্বালানি মজুত থাকে, সেখানে বাংলাদেশে এই মজুত মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ দিনের, যা কেবল দৈনন্দিন পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত হয়। আপৎকালীন সুরক্ষা হিসাবে একে কোনোভাবেই বিবেচনা করা যায় না। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২০ সালে করোনা মহামারিকালীন যখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম তলানিতে নেমেছিল, তখন তৎকালীন সরকার তেলের মজুত সক্ষমতা ৬০ দিনে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু বিগত ছয় বছরেও সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিপিসি বা বিতরণ কোম্পানিগুলোর কোনো কার্যকর আগ্রহ দেখা যায়নি। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং এর অধীনস্থ তিন বিতরণ কোম্পানিপদ্মা, মেঘনা ও যমুনার অদক্ষতা, অদূরদর্শিতা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতায় দেশ আজ সংকটের মুখে। তাঁরা বলেন, দেশের জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ পূরণ করা আমদানির মাধ্যমে। আর আমদানির বেশির ভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। বিশেষ করে বিশ্বের একতৃতীয়াংশ তেল এবং একপঞ্চমাংশ তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহ হয় হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে। চলমান যুদ্ধের জেরে ইরান যদি এ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম উদ্বেগজনক হারে বাড়বে এবং সরবরাহ সংকটও অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে যাবে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম ও আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যাবে।

আবার দেশ যেহেতু জ্বালানির ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর, তখন জ্বালানি ব্যয়ও বেড়ে যাবে। এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ব্যয়বহুল জ্বালানি আমদানির সক্ষমতা দেশের অর্থনীতির রয়েছে কিনা। বাস্তবতা হলো নেই। বিশেষ করে আরো উদ্বেগের বিষয় হলো আমদানির জন্য প্রয়োজন ডলার, যা উপার্জনের অন্যতম উৎস প্রবাসী আয়। কিন্তু প্রবাসীদেরও অধিকাংশ কর্মরত রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয়। সেখানে সংঘাতের কারণে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহও কমার আশঙ্কা রয়েছে। সব মিলিয়ে এ মুহূর্তে সরকারকে জ্বালানি নিরাপত্তায় সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা আরো বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে এক বিনিয়োগ স্থবির পরিবেশে, যেখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে কম। উল্টো মূল্যস্ফীতির চাপে স্বল্প আয়ের মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এ অবস্থা উত্তরণে ব্যবসাবাণিজ্যকে পুরোদমে সচল করতে হবে। তার জন্য যে কোনো মূল্যে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা প্রসঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি পণ্যের মজুদ রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হলে যে মজুদ রয়েছে তা দিয়ে বড়জোর দুইতিন সপ্তাহ পার করা যাবে। এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে আমদানি বৃদ্ধি ও অব্যাহত রাখা যাবে তা নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে