দেশের জ্বালানি তেল সেক্টরে বিরাজিত অস্থিরতার মাঝে সরবরাহ চেইন ঠিক রাখতে প্রধান স্থাপনা ও ডিপো থেকে জ্বালানি তেল ছাড় করার নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। একইসাথে প্রতিটি পেট্রোল পাম্পে নিয়োগ দেয়া হয়েছে ট্যাগ অফিসার। জ্বালানি তেল পাচার বা অবৈধ মজুদদারি ঠেকাতে মোতায়েন করা হয়েছে বিজিবি। বিদ্যমান পরিস্থিতি উত্তোরণে সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে উল্লেখ করে বিপিসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেছেন, দুয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) নিয়ন্ত্রণাধীন কোম্পানিগুলোর প্রধান স্থাপনা ও ডিপো থেকে জ্বালানি সরবরাহ কার্যক্রম সকাল ৭টায় শুরু হয়ে বিকেল ৩টায় শেষ হবে। গতকাল শনিবার বিপিসি এই সময়সীমা নির্ধারণ করেছে।
বিপিসি বলেছে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বিপিসির নির্দেশনায় বিপণন কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে সারা দেশে নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহ চালু রয়েছে। এই সরবরাহ কার্যক্রম আরও সুশৃঙ্খল করতে ডিপো থেকে জ্বালানি ছাড়ার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশব্যাপী ফিলিং স্টেশন, প্যাকড পয়েন্ট ডিলার ও পাম্পে সঠিকভাবে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও বিপিসি জানিয়েছে। এর পাশাপাশি ফিলিং স্টেশন, ‘প্যাকড পয়েন্ট’ ডিলার ও পাম্পগুলোকে দৃশ্যমান স্থানে ‘ব্ল্যাক বা হোয়াইট বোর্ডে’ জ্বালানি গ্রহণের তথ্য প্রদর্শনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিপিসি বলেছে, সেখানে অন্তত চার ধরনের তথ্য দেখাতে হবে। সেগুলো হল, জ্বালানি পণ্যের নাম, গেল বছরের মার্চ মাসে প্রাপ্তির দৈনিক গড়, চলতি মার্চ মাসে প্রাপ্তির দৈনিক গড় এবং অদ্য প্রাপ্তির পরিমাণ। অর্থাৎ, প্রতিটি স্টেশন বা পাম্পে বর্তমান সরবরাহকে আগের বছরের একই সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখানোর পাশাপাশি প্রতিদিন কত জ্বালানি পাওয়া গেছে, সেই তথ্যও প্রকাশ করতে হবে।
বিপিসি বলেছে, গতকাল দুপুর ১২টা থেকে এই নির্দেশনা কার্যকর করতে তাদের অধীন বিপণন কোম্পানিগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার মধ্যে দেশে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে চাপ বাড়ার পর সরকার একের পর এক তদারকি পদক্ষেপ নিয়েছে। এর আগে জেলায় জেলায় ‘ভিজিলেন্স টিম’ গঠন, তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ, সব পেট্রোল পাম্পে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগের সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন জেলায় অভিযান চালানোর তথ্য জানানো হয়।
সরকারি হিসাবের উদ্বৃতি দিয়ে বিপিসির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে একদিনে ৬২ জেলায় ২৯৩টি অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৭৮টি মামলা দায়েরের পাশাপাশি ৩ লাখ ১৫ হাজার ৫৫০ টাকা জরিমানা আদায়ের কথাও জানানো হয়। মাঠপর্যায়ে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে প্রশাসনের পদক্ষেপের উদাহরণও মিলছে। মজুদ থাকা সত্ত্বেও গ্রাহকদের কাছে তেল বিক্রি না করে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগের সত্যতা পেয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানাসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলায় ‘তেল নেই’ লিখে বিক্রি বন্ধ রাখায় একটি ফিলিং স্টেশনে প্রায় ১০ হাজার লিটার জ্বালানির মজুদ পেয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ ঘটনায় পাম্প মালিককে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ প্রেক্ষাপটে ডিপো থেকে জ্বালানি সরবরাহের নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া এবং পাম্পগুলোতে প্রাপ্তির তুলনামূলক তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা এনে সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও স্বচ্ছতা ও নজরদারি বাড়াতে চাইছে বলেও উল্লেখ করেছেন বিপিসির কর্মকর্তারা।
জ্বালানি ডিপোতে বিজিবি মোতায়ন করা হয়েছে। অস্থায়ী বেইজ ক্যাম্প স্থাপন করে তারা দায়িত্ব পালন করছেন। জ্বালানি তেলের মজুদ ঠেকানোর পাশাপাশি বিপণনে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতে দেশের ৯ জেলার ১৯ ডিপোতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বুধবার বিজিবি মোতায়েন করা হয় বলে বাহিনীর সদর দপ্তরের এক বার্তায় জানানো হয়েছে।
এতে বলা, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সংকট ও দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় অননুমোদিতভাবে জ্বালানি তেল মজুদের ‘অপচেষ্টা’ পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ অবস্থায় ডিপোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিজিবি সদর দপ্তরের তত্ত্বাবধানে বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন।
ইউনিট সদর থেকে দূরবর্তী স্থানে দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে নিরাপদ স্থানে অস্থায়ী বেইজ ক্যাম্প স্থাপন করে বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন বলে বার্তায় জানানো হয়েছে।
গেল বুধবার সকাল থেকে সর্বমোট ৯টি জেলায় ১৯টি ডিপোতে বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন বলেও জানানো হয়েছে।
এর মধ্যে ঢাকা জেলায় ১টি, কুড়িগ্রামে ২টি, রংপুরে ৩টি, রাজশাহীতে ৩টি, সিলেটে ২টি, মৌলভীবাজারে ৩টি, কুমিল্লায় ৩টি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১টি এবং সুনামগঞ্জে ১টি ডিপো রয়েছে।
বিজিবি সদস্যরা অস্থায়ী বেইজ ক্যাম্পে একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে নিয়মিত তদারকি, প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কঠোর বাস্তবায়নে দায়িত্ব পালন করছে।
বিজিবি বলছে, যেকোনো অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার, অবৈধ জ্বালানি মজুদ ও বিক্রি প্রতিরোধ এবং নাশকতা প্রতিরোধে তারা তাৎক্ষণিক ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। ডিপো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করার কথা জানিয়ে বিজিবি বলছে, ডিপো এলাকায় বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতির মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি জনমনে আস্থা ফেরানো হচ্ছে।
সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি তেল পাচার প্রতিরোধে অতিরিক্ত টহল পরিচালনা, নৌ টহল জোরদার, চেকপোস্ট স্থাপন করে তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালনা এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর কথাও জানিয়েছে বিজিবি। বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তবর্তী আইসিপি ও এলসিপিগুলোতে নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানি–রপ্তানিতে ব্যবহৃত ট্রাক–লরিসহ বিভিন্ন যানবাহন নিয়মিতভাবে তল্লাশি করা হচ্ছে।












