জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে

| মঙ্গলবার , ২১ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:০৬ পূর্বাহ্ণ

সরকার অবশেষে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, চার ধরনের তেলের নতুন দর লিটারপ্রতি আগের চেয়ে সর্বনিম্ন ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দাম বাড়ানোর কথা জানিয়েছে, যা শনিবার মধ্যরাত থেকে কার্যকর হয়েছে। ডিজেলের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০, পেট্রোল ১৩৫ এবং কেরোসিন ১৩০ টাকা। এতে করে লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম বেড়েছে ১৫ টাকা (আগের দর ১০০ টাকা), অকটেন বেড়েছে ২০ টাকা (আগের দর ১২০), পেট্রোল বেড়েছে ১৯ টাকা (আগের দর ১১৬) এবং কেরোসিন বেড়েছে ১৮ টাকা (আগের দর ১১২)। এর আগে বেশ কয়েক মাস ধরে এ চার ধরনের তেলের দাম প্রায়ই একই রকম ছিল। সবশেষ এপ্রিলেও তা অপরিবর্তিত রাখা হয়। আর এর আগের কয়েক মাসের মধ্যে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে সমন্বয় করতে বাড়ানো বা কমানো হলেও তা এক দুই টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজার চড়তে থাকার কারণে এবার এক লাফে তা ১০ শতাংশের বেশি বাড়ানো হল।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ঘটনায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে পাম্প মালিক সমিতি। তবে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব জীবনযাত্রার অন্যান্য খাতেও পড়বে এবং এতে সামগ্রিক ব্যয় আরও বেড়ে যাবে।

কেউ কেউ বলছেন, তেলের দাম বাড়ায় সবকিছুরই দাম বেড়ে যাবে। যার প্রভাব জীবনযাত্রার অন্যান্য খাতেও পড়বে।

গ্রাহকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, তেলের দাম ৫ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়ত সহনীয় ছিল, কিন্তু একবারে ২০ টাকা বাড়ানো ঠিক হয়নি। এতে গণপরিবহনের ভাড়া বেড়ে যাবে। অন্যান্য পণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়বে। অনেকেই অভিযোগ করছেন, দেশে পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও ভোক্তাদের বেশি দাম দিতে হচ্ছে। তাঁরা বলেন, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী সমপ্রতি বলেছেন দেশে এখন সর্বোচ্চ মজুত রয়েছে। তাহলে আমরা যে বাড়তি টাকা দেবো, সেটা কোথায় যাবে? এতে তো মজুতদাররাই লাভবান হবে, সাধারণ মানুষ ভুগবে। তবে কেউ কেউ মনে করছেন, দাম সমন্বয় আগেই করা উচিত ছিল। তাঁরা বলেন, এটা যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। দাম বাড়ানোর ফলে পাম্পে দীর্ঘ লাইন কমে যাবে, সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।

পাম্প মালিক সমিতি বলেছে, এর ফলে মজুতের প্রবণতা কমবে এবং বিক্রিতে স্বচ্ছতা আসবে। এক বার্তায় সমিতি নেতৃবৃন্দ জানান, বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে দেশের বাজারে দাম সমন্বয় করায় সরকারকে সাধুবাদ জানাচ্ছি। এর ফলে জ্বালানি তেলের মজুত প্রবণতা কমবে, বিক্রিতে আরও স্বচ্ছতা আসবে বলে আমরা মনে করি।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির বহুমুখী প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। একে একে বেড়ে যাবে পরিবহন ভাড়া, বিদ্যুৎ, পানি, বিভিন্ন পণ্য এবং সেবার মূল্য। সব মিলিয়ে রীতিমতো নাভিশ্বাস উঠবে সীমিত আয়ের মানুষের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রার ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। বহু লোক বিপর্যস্ত হয়েছেন, অনেকের ব্যবসাবাণিজ্যও বন্ধ হয়ে গেছে। আয় কমে এসেছে একটি বড় অংশের। সেই বিরূপ প্রভাব কাটিয়ে ওঠার চেষ্টার মধ্যেই জ্বালানি তেলের এ মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাপনে নেমে আসবে বিপর্যয়। কেননা সরকার একটি পণ্যের দাম বাড়ালেও ভোক্তাকে বহন করতে হয় সংশ্লিষ্ট অনেক পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ভার।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, তেলের দাম বৃদ্ধির বহুমুখী প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। বিশেষ করে এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষি খাতে। সামনের মৌসুমে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়বে। একইভাবে বাড়তে পারে কৃষিপণ্যের দামও।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি কোনো একক পণ্যের দাম বৃদ্ধি নয়। শুধু পরিবহনই নয়, এটার বহুমুখী প্রভাব রয়েছে এবং পুরোটাই নেতিবাচক প্রভাব। এই যেমন কারখানার উৎপাদন খরচ বাড়বে, পরিবহন ভাড়া বাড়বে, বাসাবাড়িতে জেনারেটর চলে সেখানেও খরচ বাড়বে। বিশেষ করে কৃষি ক্ষেত্রে সেচ দিতে ডিজেলের প্রয়োজন হয়, কৃষকেরও উৎপাদন খরচ বাড়বে। আমরা তো এমনিতেই কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য দিতে পারি না। সেখানে তাদের খরচ আরও বাড়িয়ে দিলাম। আবার পণ্য পরিবহনেও খরচ বাড়বে। এমনকি সমুদ্রপথে জাহাজে যে পণ্য আসে সেখানেও খরচ বাড়বে। তাই জ্বালানির দাম বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরও ভাবা উচিত ছিল। এখনো সরকারের হাতে সময় আছে, এটা পুনর্বিবেচনা করার মতো। অন্যথায় দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে