মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশে জ্বালানি নিয়ে উদ্বেগ, পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনের মধ্যে তেল সরবরাহে রেশনিং করা হলেও বর্তমানে জ্বালানি কিংবা বিদ্যুতের কোনো সংকট নেই বলে সরকারের তরফে আবারও তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকলেও সরকার এখনই জ্বালানি বা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কথা ভাবছে না বলেও জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে জ্বালানি তেলের সবশেষ পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের সামনে কথা বলেন তিনি। বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট শুরুর পর সরকার জনদুর্ভোগ কমাতে কাজ করছে। জ্বালানির দাম বাড়বে কি না–এমন প্রশ্নে অমিত বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দর বেড়েছে। এতে অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। তবে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সরকার এখনই দাম বাড়ানোর চিন্তা করছে না। আমরা আপাতত জ্বালানি কিংবা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চিন্তা করছি না। এই অবস্থান তিনি মার্চের শুরুতে যেমন বলেছিলেন, গতকাল তা আবার তুলে ধরেন। খবর বিডিনিউজের।
সরকার কতদিন দাম না বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামলাতে পারবে–এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, যতদিন সম্ভব ততদিন বাড়তি চাপ নিয়েই সরকার চলবে। একান্ত উপায় না থাকার আগে পর্যন্ত দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনের প্রসঙ্গ তুলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, গত সপ্তাহে পাঁচ দিনে স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি জ্বালানি সরবরাহ করা হলেও মানুষের উদ্বেগ পুরোপুরি কমেনি।
সরকারি হিসাবে মার্চে জ্বালানি নিয়ে কোনো সংকট দেখছে না সরকার। এপ্রিল ও মে মাসের সম্ভাব্য চাপ সামলাতেও প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বৈশ্বিক সংকট বাড়তে পারে। যে কারণে আগাম প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। তার ভাষ্য, এই অস্বাভাবিক চাহিদার পেছনে যৌক্তিক কারণের চেয়ে প্যানিক বায়িং ও উৎকণ্ঠাই বেশি কাজ করেছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার এটিকে অস্বাভাবিক হিসেবে না দেখে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। তার ব্যাখ্যা, আগের কয়েকদিনে বেশি তেল তোলায় অনেকের কাছেই বাড়তি মজুদ আছে ধরে নিয়ে এবার চাহিদা হিসাব করে সরবরাহে সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এর আগে মোটরসাইকেলে দিনে সর্বোচ্চ ২ লিটার, ব্যক্তিগত গাড়িতে ১০ লিটার, এসইউভি, জিপ ও মাইক্রোবাসে ২০ থেকে ২৫ লিটার, পিকআপ ও লোকাল বাসে ৭০ থেকে ৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও কন্টেইনারে ২০০ থেকে ২২০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি দেওয়ার সীমা ঠিক করে। গতকাল রাইড শেয়ারিংয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের জন্য সেই সীমা বাড়িয়ে দিনে ৫ লিটার করা হয়েছে।
সচিবালয়ের প্রতিমন্ত্রী অমিত বলেন, রাইড শেয়ার চালকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ২ লিটার তেল নিয়ে কার্যত কাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়ছিল। সে কারণে যেসব এলাকায় রাইড শেয়ারিং কার্যক্রম চালু আছে, সেসব ক্ষেত্রে পরিচয়পত্র দেখিয়ে তারা ৫ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি নিতে পারবেন। পাম্পে যে বড় লাইন দেখা যাচ্ছে, তার বেশির ভাগই মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির, যেগুলোর প্রধান চাহিদা অকটেন ও পেট্রোল।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, অকটেন ও পেট্রোলে কার্যত কোনো সংকট নেই। কারণ এর বড় অংশ দেশেই পরিশোধিত হয়। বাংলাদেশের আমদানি নির্ভরতা মূলত ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলে বেশি। পাম্পে যে চাপ দেখা যাচ্ছে, সেটি প্রকৃত ঘাটতির চেয়ে আতঙ্ক ও সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা থেকে তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি আমদানি নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পাইপলাইন চুক্তির আওতায় প্রতি মাসে ১৫ হাজার টন জ্বালানি আসার কথা। এর একটি অংশ ইতোমধ্যে এসেছে, বাকি অংশও ধারাবাহিকভাবে আসছে। অতিরিক্ত সরবরাহের বিষয়েও বাংলাদেশ অনানুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছে।
বিকল্প উৎস নিয়ে সরকারের কাজ শুরুর তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল এলেও অপরিশোধিত তেলের একটি অংশ বাংলাদেশ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো থেকে নেয়। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়ার বাইরে আফ্রিকার কিছু দেশের সঙ্গেও এখন কথা হচ্ছে।
এলএনজির বিকল্প উৎস নিয়ে সরকারের কাজ শুরুর তথ্য দিলেও বিস্তারিত বলতে চাননি তিনি। জ্বালানি মজুদ বাড়ানোর বিষয়েও কাজ হচ্ছে বলে জানান অমিত। বলেন, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের নিজস্ব স্টোরেজ সক্ষমতা ব্যবহার করা যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। দেশবাসীকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রোজা ও ঈদের সময়ে জনদুর্ভোগ এড়াতে সরকার সর্বোতভাবে সচেষ্ট রয়েছে। সময়ের সঙ্গে মানুষের উদ্বেগ কমে গেলে পাম্পে চাপও স্বাভাবিক হয়ে আসবে।












