বিগত কয়েক দশকে বাজারের পরিবর্তন এবং ভোক্তাদের আচরণে যে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে, তা নির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যণীয়। আধুনিক ভোক্তারা কেবল পণ্য বা সেবা কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; তারা এখন ব্র্যান্ডের মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে বর্তমানের তরুণ প্রজন্ম, যা জেনারেশন ত নামে পরিচিত। জেনারেশন ত তাদের জীবনযাপনে এবং ক্রয়বিবেচনায় নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ব এবং পরিবেশের প্রতি যত্নশীল হতে চায়। তাই, ব্র্যান্ডগুলোর জন্যও ‘Purpose Driving Marketing’ বা উদ্দেশ্য–চালিত মার্কেটিং একটি নতুন গুরুত্বপূর্ণ ধারা হয়ে উঠেছে।
Purpose Driving Marketing বলতে বোঝায় এমন এক মার্কেটিং কৌশল, যা কেবল পণ্য বিক্রির উদ্দেশ্য নিয়েই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সামাজিক, পরিবেশগত, এবং মানবিক সমস্যা সমাধানে ব্র্যান্ডগুলোর সম্পৃক্ততা তৈরি করে। এই ধরনের মার্কেটিং জেনারেশন ত–এর সাথে ব্র্যান্ডকে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়তে সহায়ক হয়েছে।
জেনারেশন Z কারা?
জেনারেশন Z সাধারণত ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত। তারা ডিজিটাল যুগের সন্তান, যারা প্রযুক্তি এবং ইন্টারনেটের মধ্যে বড় হয়েছে। তাদের জীবনযাপনের বিভিন্ন দিক আধুনিক প্রযুক্তি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এই প্রজন্মটি সোশ্যাল মিডিয়ায় যেমন সচেতন তেমনি বৈশ্বিক সমস্যাগুলোতেও ব্যাপক সংবেদনশীল। জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার, লিঙ্গ সমতা, এবং ন্যায়সঙ্গত ব্যবসায়িক নীতিমালার মতো বিষয়গুলো তাদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পায়।
কেন জেনারেশন Z–এর জন্য মূল্যবোধ গুরুত্বপূর্ণ?
জেনারেশন ত–এর সদস্যরা শুধু একটি পণ্য কিনে খুশি হয় না; তারা চায় সেই পণ্যটি যে ব্র্যান্ড থেকে এসেছে, তা সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হোক। তারা জানতে চায়, একটি ব্র্যান্ডের কার্যক্রম পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, সেই ব্র্যান্ডটি কীভাবে তার কর্মীদের প্রতি দায়বদ্ধ, এবং তারা সমাজের উন্নয়নে কী ভূমিকা রাখছে। এটি জেনারেশন Z–কে আলাদা করেছে অন্যান্য প্রজন্মের তুলনায়, বিশেষ করে যাদের মধ্যে মূলত অর্থনৈতিক সুবিধা সর্বাধিক গুরুত্ব পেত।
উদ্দেশ্য–চালিত মার্কেটিংয়ের উদাহরণ:
বেশ কয়েকটি বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ইতিমধ্যে জেনারেশন ত–এর চাহিদা এবং মূল্যবোধকে সম্মান জানিয়ে উদ্দেশ্য–চালিত মার্কেটিং কৌশল গ্রহণ করেছে। তাদের কিছু উল্লেখযোগ্য উদাহরণ:
১. প্যাটাগোনিয়া (Patagonia) : পরিবেশগত টেকসইতার জন্য বিশ্বব্যাপী বিখ্যাত এই আউটডোর পোশাক কোম্পানি। প্যাটাগোনিয়া তাদের প্রতিটি পণ্য উৎপাদনে পরিবেশ–বান্ধব প্রযুক্তি এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহার করে। এর পাশাপাশি তারা জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সক্রিয় আন্দোলন করছে। তাদের স্লোগান ‘We’re in business to save our home planet’ জেনারেশন Z–এর সাথে বিশেষভাবে সম্পর্ক তৈরি করেছে।
২. নাইকি (Nike) : নাইকি অনেক বারই সামাজিক ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। নাইকির ‘Just do it’ প্রচারণায় সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ, লিঙ্গ সমতা, এবং মানবাধিকার রক্ষার বার্তা প্রচার করেছে, যা তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করেছে।
৩. বেন অ্যান্ড জেরিস (Ben & Jerry’s) : বেন অ্যান্ড জেরিসের আইসক্রিম শুধুমাত্র স্বাদেই জনপ্রিয় নয়, তাদের নৈতিক দায়িত্ববোধের কারণেও। এই ব্র্যান্ডটি জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসী অধিকার, এবং বর্ণবৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে কাজ করে। তাদের উদ্দেশ্য–চালিত মার্কেটিং জেনারেশন ত–এর সাথে একটি বিশেষ সংযোগ স্থাপন করেছে।
কীভাবে জেনারেশন Z ব্র্যান্ডের মূল্যবোধকে পুনর্গঠন করছে:
জেনারেশন ত তাদের চাহিদা এবং চিন্তাভাবনার মাধ্যমে ব্র্যান্ডগুলোর ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। তারা বিশ্বাস করে যে, একটি ব্র্যান্ড যদি উদ্দেশ্যপূর্ণ কাজ করে, তবে সেই ব্র্যান্ডের প্রতি তাদের আনুগত্য আরও দৃঢ় হয়। এর ফলে ব্র্যান্ডগুলো কেবল তাদের পণ্য প্রচারণায় নয়, বরং সামাজিক ও পরিবেশগত উদ্যোগেও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হচ্ছে।
১. নৈতিকতা এবং স্বচ্ছতা : জেনারেশন Z এর ভোক্তারা ব্র্যান্ড থেকে স্বচ্ছতা চায়। তারা জানতে চায় ব্র্যান্ডের ব্যবসায়িক নীতিমালা এবং চেইন অব প্রোডাকশন সম্পর্কে। শ্রমিকদের অধিকার, কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা, এবং মজুরির ন্যায্যতা সম্পর্কে স্বচ্ছ থাকা একটি ব্র্যান্ডকে এই প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
২. সামাজিক ন্যায়বিচার এবং বৈশ্বিক সমস্যা : জেনারেশন Z–এর অন্যতম প্রধান চিন্তা হলো সামাজিক ন্যায়বিচার এবং বৈশ্বিক সমস্যা সমাধান। এই প্রজন্ম জলবায়ু পরিবর্তন, বর্ণবৈষম্য, লিঙ্গ সমতা, এবং মানবাধিকারকে গুরুতর বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। যারা এসব সমস্যা নিয়ে কাজ করছে এবং কার্যকর ভূমিকা রাখছে, তাদের ব্র্যান্ড জেনারেশন ত–এর কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করছে।
৩. দায়িত্বশীল ভোক্তা হিসেবে ভূমিকা পালন : জেনারেশন Z চায় তাদের প্রতিটি ক্রয় যেন দায়িত্বশীলভাবে হয়। তারা সেইসব ব্র্যান্ড বেছে নেয় যারা পরিবেশ সংরক্ষণ, সামাজিক উন্নয়ন, এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি দায়িত্বশীল। এ কারণে ব্র্যান্ডগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের নৈতিকতা এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীলতার কথা সামনে নিয়ে আসা।
কীভাবে ব্র্যান্ডগুলো জেনারেশন Z–এর সাথে সংযোগ তৈরি করতে পারে:
ব্র্যান্ডগুলো যদি জেনারেশন Z–এর সাথে সঠিকভাবে সংযোগ স্থাপন করতে চায়, তবে তাদের কৌশলগতভাবে চিন্তা করতে হবে। এখানে কিছু উপায় আছে যেগুলো ব্র্যান্ডগুলো অনুসরণ করতে পারে:
১. সমাজের উন্নয়নে কাজ করা : শুধুমাত্র পণ্য বিক্রি নয়, সমাজের উন্নয়নে ব্র্যান্ডগুলোর ভূমিকা রাখা উচিত। জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে কাজ করা ব্র্যান্ডের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের প্রচারণা জেনারেশন Z–এর কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
২. স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা প্রদর্শন করা : ব্র্যান্ডগুলোর প্রতি জেনারেশন Z–এর বিশ্বাস অর্জন করতে হলে তাদের স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি পদক্ষেপে নৈতিকতা এবং সততা বজায় রাখতে হবে, যা তরুণ প্রজন্মের মনোযোগ আকর্ষণ করবে।
৩. সামাজিক মাধ্যমের কার্যকর ব্যবহার : জেনারেশন Z ডিজিটাল নেটিভ হওয়ায়, তাদের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে সোশ্যাল মিডিয়াকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা জরুরি। তবে কেবল প্রচারণার জন্য নয়, তারা সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে সামাজিক ও নৈতিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে চায়। তাই ব্র্যান্ডগুলোর উচিত এমন প্রচারণা চালানো, যা সামাজিক ন্যায়বিচার, পরিবেশগত সচেতনতা, এবং মানবিক মূল্যবোধকে সামনে আনে।
চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ :
যদিও উদ্দেশ্য–চালিত মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে ব্র্যান্ডগুলো জেনারেশন Z–এর কাছে ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারে, তবে এর কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যেমন :
১. বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা : উদ্দেশ্য–চালিত মার্কেটিং সহজে করা যায় না; এর জন্য সময়, শ্রম, এবং সঠিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। অনেক ব্র্যান্ডই শুধুমাত্র মার্কেটিং প্রচারণার মাধ্যমে উদ্দেশ্য–চালিত হতে চায়, কিন্তু বাস্তবে তারা সেসব উদ্দেশ্য পালন করতে ব্যর্থ হয়। এটি জেনারেশন Z–এর কাছ থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেতে পারে।
২. ব্যালান্স রাখা : একটি ব্র্যান্ডের প্রধান উদ্দেশ্য পণ্য বা সেবা বিক্রি করা। তবে উদ্দেশ্য–চালিত মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক বা পরিবেশগত সমস্যা নিয়ে অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়া হলে ব্যবসায়িক লক্ষ্যে সমতা বজায় রাখা কঠিন হতে পারে।
ব্র্যান্ডগুলোর জন্য ভবিষ্যৎ নির্দেশনা :
১. উদ্ভাবনী ধারণা প্রয়োগ : ব্র্যান্ডগুলোর উচিত তাদের প্রচারণায় নতুন এবং উদ্ভাবনী ধারণা যুক্ত করা, যা শুধু বিক্রয় বাড়াবে না, বরং সামাজিক পরিবর্তনেও অবদান রাখবে। ব্র্যান্ডগুলো যদি নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন নতুন প্রোগ্রাম চালু করে, তবে তা জেনারেশন Z–এর মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে।
২. কাস্টমার ফিডব্যাকের গুরুত্ব : জেনারেশন Z খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেয় এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের মতামত প্রকাশ করে। তাই ব্র্যান্ডগুলোর উচিত এই প্রতিক্রিয়া গুরুত্ব সহকারে নেওয়া এবং তাদের কৌশলগুলিতে পরিবর্তন আনা। তাদের কাস্টমারদের সাথে সংলাপ তৈরি করে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হবে।
৩. লোকাল এবং গ্লোবাল দৃষ্টিভঙ্গি : জেনারেশন Z শুধুমাত্র স্থানীয় সমস্যা নয়, বৈশ্বিক সমস্যাও সমাধান করতে চায়। সুতরাং, ব্র্যান্ডগুলোর উচিত লোকাল এবং গ্লোবাল উভয় ক্ষেত্রেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করা। এটি তরুণ প্রজন্মের সাথে একটি শক্তিশালী সংযোগ তৈরি করবে এবং ব্র্যান্ডের একটি ইতিবাচক ইমেজ গড়ে তুলবে।
বাংলাদেশি ব্র্যান্ডের উদাহরণ :
বাংলাদেশের ব্র্যান্ডগুলোও জেনারেশন Z–এর পরিবর্তিত চাহিদা এবং মূল্যবোধের সাথে খাপ খাওয়াতে শুরু করেছে। এখানে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশি ব্র্যান্ডের উদাহরণ দেওয়া হলো যারা Purpose Driving Marketing কৌশল গ্রহণ করে সফলতা অর্জন করেছে :
১. গ্রামীণফোন :
গ্রামীণফোন শুধু একটি মোবাইল নেটওয়ার্ক সরবরাহকারী ব্র্যান্ড নয়, তারা দীর্ঘদিন ধরে সমাজের উন্নয়ন এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে। তাদের ‘Internet for All’ এবং ‘শিশুদের ইন্টারনেট নিরাপত্তা’ প্রচারণা জেনারেশন ত–এর কাছে বেশ জনপ্রিয়। গ্রামীণফোন বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে অংশ নিচ্ছে, যেমন পরিবেশ সুরক্ষা, ডিজিটাল শিক্ষার প্রসার এবং প্রযুক্তি–নির্ভর সামাজিক সমস্যার সমাধানে কার্যকর ভূমিকা পালন করা। এই ধরনের উদ্যোগ Purpose Driving Marketing–এর আদর্শ উদাহরণ।
২. ব্র্যাক (BRAC):
বিশ্বের সবচেয়ে বড় এনজিও হিসেবে পরিচিত ব্র্যাক তাদের বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমের জন্য প্রসিদ্ধ। যদিও তারা মূলত একটি এনজিও, তাদের ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজ, বিশেষ করে ব্র্যাক ডেইরি এবং ব্র্যাক আর্টিসান, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশাল অবদান রাখছে। ব্র্যাক আর্টিসান তৈরি করছে এমন পণ্য, যা সরাসরি গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সাহায্য করে। এই ধরনের উদ্যোগ সরাসরি Purpose Driving Marketing–এর অংশ।
৩. আরএফএল (RFL) এবং প্রাণ:
আরএফএল এবং প্রাণ গ্রুপ বাংলাদেশে স্বনামধন্য এবং বহুল জনপ্রিয় ব্র্যান্ড। এই প্রতিষ্ঠানগুলো সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং পরিবেশগত সুরক্ষা প্রকল্পে অবদান রাখছে। তারা প্লাস্টিক পণ্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য করার ওপর জোর দিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করছে। এছাড়াও প্রাণ গ্রুপ স্থানীয় কৃষকদের সহায়তা দিয়ে তাদের উৎপাদিত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর জন্য কাজ করছে। এটি শুধু ব্যবসায়িকভাবে তাদের সাফল্য এনেছে তা নয়, স্থানীয় কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা রেখেছে।
৪. স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস:
স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস বাংলাদেশে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানি। স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস শুধু স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে সীমাবদ্ধ নয়; তারা সামাজিক সচেতনতা এবং মানবিক উন্নয়ন কর্মসূচির সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। ‘Health Awareness Campaign এবং Free Health Camp’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে তারা স্বাস্থ্যসেবার বাইরে সমাজে ইতিবাচক প্রভাব রাখছে। এই ধরনের কর্মসূচি তাদের Purpose Driving Marketing কৌশলকে তুলে ধরে।
৫. এসিআই (ACI) :
এসিআই, একটি বৃহৎ বহুমুখী ব্র্যান্ড, তাদের পরিবেশ সচেতনতা ও সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে জেনারেশন Z–এর কাছে একটি দায়িত্বশীল ব্র্যান্ড হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। এসিআই তাদের ‘Green Solution’ উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষি ও স্বাস্থ্যখাতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করছে। তারা জৈব পণ্যের প্রসারে এবং কৃষকদের জন্য উন্নত সেবা প্রদানে সচেষ্ট। এসিআই এর মাধ্যমে সমাজের প্রতি তাদের দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন করছে, যা জেনারেশন ত–এর মূল্যবোধের সাথে মিল রয়েছে।
৬. এলিট পেইন্ট (Elite Paint):
Elite Paint, বাংলাদেশে রঙ প্রস্তুতকারী খাতের পথপ্রদর্শক, Purpose Driving Marketing–এর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। প্রতিষ্ঠানটি Global Superbrands Awardএবং Best Employer Brand Award–এর মতো সম্মাননা অর্জন করেছে, যা তাদের অসাধারণ সেবা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। Elite Paint বাংলাদেশের প্রথম কোম্পানি যারা ‘Lead Safe পেইন্ট তৈরি করেছে, যা পরিবেশগত ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তাছাড়া তাদের CSR কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তারা বিপুল সংখ্যক প্রাথমিক বিদ্যালয় রঙ করাসহ শিক্ষার উন্নয়নে অবদান রেখেছে। এই ধরনের উদ্যোগ Elite Paint–এর দায়িত্বশীল ব্র্যান্ড ইমেজকে জেনারেশন Z–এর কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
Purpose Driving Marketing-এর মাধ্যমে বাংলাদেশি ব্র্যান্ডগুলো জেনারেশন Z–এর সাথে একটি গভীর সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। গ্রামীণফোন, ব্র্যাক, আরএফএল, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস এবং এসিআই, এলিট পেইন্ট এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজের জন্য দায়বদ্ধ থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই উদ্যোগগুলো তাদের পণ্যের প্রতি ভোক্তাদের বিশ্বাস বাড়িয়েছে এবং জেনারেশন Z–এর সাথে একটি দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক তৈরি করেছে।
এভাবে ব্র্যান্ডগুলো শুধু নিজেদের ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করছে না, বরং দেশ ও সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। Purpose Driving Marketing বাংলাদেশের বাজারে ভবিষ্যতের সাফল্যের জন্য একটি অপরিহার্য দিক হয়ে উঠছে, যা জেনারেশন Z–এর নেতৃত্বে ব্র্যান্ডের মূল নীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে।
জেনারেশন Z–এর ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কারণে ব্র্যান্ডগুলোর মূল্যবোধ ও মার্কেটিং কৌশলে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। Purpose Driving Marketing কেবল একটি বিপণন কৌশল নয়; এটি একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে ব্র্যান্ডগুলো তাদের সামাজিক, নৈতিক এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতাগুলিকে সামনে রেখে ক্রেতাদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। বর্তমান যুগে যখন ক্রেতারা শুধুমাত্র পণ্য বা সেবার মান নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চায় না, তখন এই দৃষ্টিভঙ্গি ব্র্যান্ডের দীর্ঘস্থায়ী সাফল্যের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
জেনারেশন Z–এর একটি বিশেষ দিক হলো তারা সমাজে পরিবর্তন আনার একটি শক্তি হিসেবে নিজেদেরকে দেখে। তারা চায় যে ব্র্যান্ডগুলো তাদের পণ্য বিক্রির বাইরেও সমাজে একটি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করুক। এই প্রজন্মের চাহিদা শুধুমাত্র ভালো পণ্য বা পরিষেবা নয়; তারা এমন ব্র্যান্ডকে সমর্থন করতে চায় যারা তাদের মূল্যবোধকে সম্মান করে এবং একইসাথে সমাজের জন্য কিছু করে। সুতরাং, Purpose Driving Marketing হল সেই কৌশল যা ব্র্যান্ডগুলোকে জেনারেশন Z–এর সাথে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক তৈরি করতে সাহায্য করে।
লেখক : সিনিয়র ম্যানেজার, স্ট্র্যাটেজিক সেলস, এলিট পেইন্ট এন্ড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিঃ