জুম্‌’আর খুতবা

ইসলামে নফল রোজার ফযীলত ও মাসায়েল

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি | শুক্রবার , ৩ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:০২ পূর্বাহ্ণ

প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা:

আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করুন! তাঁরই ইবাদত করুন। নামায রোযা, হজ্ব, যাকাত, ফরজ ইবাদত। যা সুনির্দিষ্ট বিধান ও শর্তাবলীর আলোকে মুসলিম নরনারীর উপর অপরিহার্য। পবিত্র কুরাআনের বিরাশি আয়াতে নামাযের নির্দেশ করেছেন, ফরজ নামায পরিত্যাগ বা বর্জন করার কোন সুযোগ নেই। ফরজ ইবাদত বর্জন করা কবীরা গুনাহ। যে কারণে বান্দাকে অনন্তকাল জাহান্নামের কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। এভাবে একমাস ব্যাপী সিয়াম সাধনা করা ফরজ। এ কারণে কেউ যদি বিনা প্রয়োজনে ইচ্ছাকৃত রমজানের একটি রোযা ভঙ্গ করে একটি রোযার পরিবর্তে একটি কাযা রোযা ও ষাটটি একাধারে কাফফারার রোযা আদায় করতে হবে। মাঝখানে ফাঁক দিতে পারবেনা। কোন কারণে মাঝখানে বাদ দিলে পুনরায় ষাটটি রোযা নতুন করে একাধারে আদায় করতে হবে। (রদ্দুল মুহতার, বাহারে শরীয়ত, ৫ম খন্ড, কিতাবুল ফিকহ আলাল মাযাহিবিল আরবাআ)

নফল নামায, নফল রোযা, বান্দার জন্য ঐচ্ছিক ইবাদত। নফল ইবাদত যত বেশী হবে বান্দা ততবেশী আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সক্ষম হবে। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, নফল ইবাদতের মাধ্যমে বান্দা আমার নিকটবর্তী হতে থাকে।

(বোখারী শরীফ)

রোযার প্রকারভেদ সংক্রান্ত আলোচনা:

ইসলামী শরীয়তে কুরআন ও হাদীসের আলোকে মুজতাহিদ ফকীহগনের বর্ণনা মতে রোযা ছয় প্রকার। ১. ফরজ, . ওয়াজিব, . সুন্নাত, . নফল, . মাকরূহ, . হারাম। ১. মহাগ্রন্থ আল কুরআনের সূরা বাকারার ১৮৩ নং আয়াতের বর্ণনামতে পবিত্র রমজানে পূর্ণ একমাস রোযা রাখা ফরজ। ২. মান্নতের রোযা ও কাফফারার রোযা পালন করা ওয়াজিব। ৩. মহররম মাসের আশুরার ৯ ও ১০ তারিখের ২টি রোযা রাখা সুন্নাত। আরাফা দিবসের জিলহজ্ব মাসের ৯ তারিখের রোযা রাখা সুন্নাত, শাওয়াল চাঁদের ৬ রোযা সুন্নাত। প্রতি চান্দ্র মাসের ১৩,১৪,১৫ তারিখের রোযা সুন্নাত। ৪. নফল রোযা, যেমন শাবানের ১৫ তারিখ শবে বরাতের রোযা, ২৭ রজব শবে মিরাজের রোযা রাখা নফল। ৫.মাকরূহ, স্বামীর বিনা অনুমতিতে নফল রোযা রাখা মাকরূহ, আশুরার একটি রোজা রাখা। এভাবে শুধুমাত্র জুমাবার দিবসে রোযা রাখা মাকরূহ, তবে নির্দ্দিষ্ট কোন তারিখের রোযা। যেমন ১৫ শাবান শবে বরাতের রোযা, ২৭ রজব শবে মেরাজের রোযা ইত্যাদি যদি জুমাবারে এসে যায় তাহলে ঐদিন রোযা রাখা মাকরূহ নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন “জুমার দিন তোমাদের জন্য ঈদের দিন, সুতরাং তোমরা ঐ দিন রোযা রেখোনা এর আগের দিন বা পরের দিন রোযা রাখো। (আত্‌তারগীব ওয়াত তারহীব ২য় খন্ড, পৃ: ৮১, হাদীস ১১)

. হারাম রোযা: ইসলামী শরীয়তে নির্দিষ্ট কতগুলো দিনে রোযা রাখা হারাম, যেমন ঈদুল ফিতরের দিন, ঈদুল আযহার দিন, আইয়্যামে তাশরীক তথা জিলহজ্ব মাসে ১১,১২,১৩ জিলহজ্ব তারিখে রোযা রাখা হারাম। (ফাতওয়াএ রিজভীয়্যাহ, বাহারে শরীয়ত, ৫ম খন্ড)

হাদীসের আলোকে শাওয়ালের ছয় রোযার ফযীলত:

ঈদুল ফিতরের মাস পবিত্র শাওয়ালের গুরুত্ব ও মহিমা অপরিসীম। দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর তাকওয়া ভিত্তিক জীবন গঠনের প্রত্যয়ে অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়ার ঈমানী চেতনা, রমজানের অর্জিত তাকওয়া ও শিক্ষাকে জাগ্রত রাখার লক্ষ্যে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান পরবর্তী শাওয়াল মাসে ছয়টি রোযার বিধান দিয়ে আমাদেরকে আত্মশুদ্ধি ও খোদাভীতি অর্জনের পথ সুগম করে দিয়েছেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখার পর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোযা রাখবে সে সারা বছর রোযা রাখার সওয়াব লাভ করবে।” (মুসলিম শরীফ)

* হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, যে রমজানের রোযা রাখালো, অতঃপর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোযা রাখল, সে গুনাহ থেকে এমনিভাবে মুক্ত হয়ে যাবে যেনো আজই মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হলো। (মাযমাউয যাওয়ায়িদ, ৩য় খন্ড, হাদীস ৫১০২)

* যে ব্যক্তি শাওয়ালের ছয়টি রোযা রাখলো সে যেনো সারা বছর রোযা রাখলো, কেননা যে একটা নেকী করবে সে দশটি সওয়াব পাবে। রমজান মাসের রোযা দশমাসের সমান ছয়দিন দুই মাসের সমান, সুতরাং বার মাসের রোযা হয়ে গেলো। (আসসুনানুল কুবরা লিন নাসায়ী, ২য় খন্ড, হাদীস নং: ২৮৬০,২৮৬১)

ইমাম নাসাঈ ইবনে মাযাহ ইবনে খোজায়মা ইবনে হিব্বান প্রমুখ হযরত সওবান (রা.) থেকে ইমাম আহমদ, ইমাম তাবরানী (রা.) হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ঈদুল ফিতরের পর শাওয়ালে ছয় রোযা রাখল সে পূর্ণ বছরের রোযা রাখলো যে একটি নেক কাজ করল সে বিনিময়ে দশটি প্রতিদান পাবে। রমজান মাসের রোযা দশ মাসের সমান এবং শাওয়ালের ছয়দিনের ছয় রোজা দুই মাসের সমান পূর্ণ এক বৎসরের রোযা হয়ে গেল। (বাহারে শরীয়ত, ৫ম খন্ড, পৃ: ১৭০)

মাসআলা: ছয় রোযার জন্য কোন দিন নির্দিষ্ট করা নেই। মাসের যে কোন সময় রাখা জায়েজ। উত্তম হলো ছয় রোযা পৃথকভাবে রাখবে। ঈদের পর লাগাতার ছয়দিন এক সাথে রাখলেও কোন ক্ষতি নেই। (বাহারে শরীয়ত)

মাসআলা: শ্রমিক বা কর্মচারী নফল রোযা রাখার কারণে কাজ যদি পূর্ণভাবে করতে না পারে সে ক্ষেত্রে রোযা রাখার ব্যাপারে মালিকের অনুমতি নিতে হবে।

আর যদি রোযা রেখে কাজ পূর্ণরূপে করতে পারে সেক্ষেত্রে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। (রদ্দুল মোখতার, বাহারে শরীয়ত, ৫ম খন্ড, পৃ: ১৬৭)

মাসআলা: নফল রোযা শুরু করার দ্বারা আবশ্যক হয়ে যায়। যদি ভঙ্গ করে কাযা দেওয়া ওয়াজিব হবে। (দুররুল মোখতার, বাহারে শরীয়ত, ৫ম খন্ড, পৃ: ১৬৬)

মাসআলা: মাতাপিতা যদি নিজ সন্তানসন্ততি কে রোগ ব্যাধির ভয়ের কারনে নফল রোযা রাখতে নিষেধ করে সেক্ষেত্রে মাতাপিতার কথা মেনে নিবে। (রদ্দুল মোখতার, বাহারে শরীয়ত)

হাদীসের আলোকে যে সব দিনসমূহে রোযা রাখা হারাম:

হাদীস শরীফে পাঁচ দিন রোযা পালনে নিষেধ করা হয়েছে, এরশাদ হয়েছে, হযরত আবু সাঈদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতর এর দিনে এবং কুরবানির দিন সিয়াম পালনে নিষেধ করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)

হাদীস শরীফে আরো এরশাদ হয়েছে, হযরত নুবায়শা আলহুযালী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, তাশরীকের দিনগুলো (ঈদুল আযহার পরের তিন দিন) আহার করা, পান করা এবং আল্লাহর যিকর এর জন্য। (মুসলিম)

মাসআলা: ঈদের দিন রোযা রাখা এবং আইয়্যামে তাশরীক অর্থ্যৎ জিলহজ্বের এগার, বার ও তের তারিখে রোযা রাখা হারাম। (আলমগীরি, দুররুল মোখতার, রদ্দুল মোখতার, বাহারে শরীয়ত, খন্ড: ৫ম, পৃ: ১২৬)

মাসআলা: শাওয়ালের ছয় রোযা ঈদের পরের দিন থেকে শাওয়াল মাস শেষ হওয়া পর্যন্ত যে কোনো ছয় দিন রোযা রাখা যাবে। অথবা লাগাতার ছয়দিনও রাখা জায়েজ আছে। (রদ্দুল মোহতার, খন্ড: , পৃ: ৪৩৫)

প্রতি চান্দ্র মাসে ১৩,১৪,১৫ তারিখে রোযা পালন করা। হযরত আবু যারগিফারী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন আমরা প্রত্যেক মাসের তিনটি শুভ দিন সিয়াম পালন করব, চান্দ্র মাসের ১৩,১৪,১৫ তারিখ। (নাসাঈ শরীফ, ফিকহুস সুনানি ওয়াল আছার, খন্ড: ১ম, পৃ. ৪৭৬)

সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোযা রাখার ফযীলত:

হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, বান্দার আমল প্রতি সোমাবার ও বৃহস্পতিবার আল্লাহর নিকট পেশ করা হয় তাই আমি পছন্দ করি যে, আমি রোযাদার অবস্থায় যেন আমার আমল পেশ করা হয়। (তিরমিযী, হাদীস: ৭৪৭)

হে আল্লাহ আমাদের কে আপনার মকবুল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন, আমাদের নামায, রোযা, দানসাদকাসহ নেক আমলগুলো কবুল করুন। পবিত্র কুরআনের হেদায়ত ও বরকত নসীব করুন। নিশ্চয় আপনি মহান দানশীল রাজাধিরাজ, পুণ্যবান, অতি দয়ালু ও পরম করুনাময়। আমীন।

লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসাএ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম; খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন

চাতরী চৌমুহনী, আনোয়ারা, চট্টগ্রাম।

প্রশ্ন: তারাবীহ নামায ছুটে গেলে কাযা করতে হবে কিনা? তারাবীহ সংক্রান্ত কয়েকটি জরুরি মাসআলা জানতে চাই।

উত্তর: তারাবীহ নামায ছুটে গেলে তার কাযা নেই। (দুররুল মুখতার, খন্ড:, পৃ: ৪৯৪) বিনা ওযরে তারাবীহ নামায বসে পড়া মাকরূহ। (দুররুল মুখতার, খন্ড:, পৃ: ৪৯৯) তারাবীহ নামাযে কম পক্ষে এক খতম কুরআন মজীদ পড়া ও শুনা সুন্নাতে মুযাক্কাদা। (ফতোওয়ায়ে রজভীয়া, খন্ড:, পৃ: ৪৫৮) তারাবীহ’র রাকাত সংখ্যা নিয়ে যদি মুসল্লীর সন্দেহ হয়, বিশ রাকাত হলো? না আঠার রাকাত? এমতাবস্থায় যাদের সন্দেহ রয়েছে তারা নিজ দায়িত্বে দু’রাকাত পৃথক পৃথকভাবে পড়ে সন্দেহমুক্ত হবেন। (আলমগীরি, খন্ড:, পৃ: ১১৭) নাবালেগ ইমামের পিছনে বালেগের তারাবীহ আদায় হবেনা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশিশুর প্রাণসংহারক সংক্রামক রোগ হাম
পরবর্তী নিবন্ধপাম্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, দেখতে পাচ্ছেন না? মন্ত্রী বললেন ‘এটা ঠিক না’