হে মানবমণ্ডলি! মহান প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করুন। তারই ইবাদত করুন, তার প্রদত্ত নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। এ মহিমান্বিত মাসে এমন একটি রজনী রয়েছে যেটা হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যে বান্দা এ রাতে লাভবান হতে পারলনা সে কোন্ সময়ে লাভবান হবে? যে বান্দা এ রজনীতে মাওলার দরবারে তাওবাহ করতে পারলনা সে কোন্ সময়ে সংশোধন হবে? এ রাতে আমরা তাঁর নিকট প্রাচুর্যতা পুণ্য কল্যাণ দারিদ্র থেকে মুক্তি প্রার্থনা করছি। যে কোন মুসীবত ও সংকটকালে তাঁর আযাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করুন। রমজানের শেষ দশকে রয়েছে পবিত্র লায়লাতুল কদর, এ রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ফায়সালা করা হয়। সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময় মহান প্রভুর অনুমতিক্রমে গোটা বৎসরের বিষয়াদি নির্ধারণ করা হয়। যে মাসের প্রতিটি রজনীতে শেষ তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আকাশে তিনি তাঁর নূরের তাজল্লী (প্রভা) অবতীর্ণ করেন, বলতে থাকেন আহবানকারী কে আছো? আমি তার আহবানে সাড়া দিব, প্রার্থনাকারী কে আছো? তাকে দান করবো।
আল কুরআনের আলোকে লায়লাতুল কদর: আল্লাহ তা’য়ালাকে ভয় করুন। সর্বদা তার গুণগান ও প্রশংসা করুন। আপনার উপর প্রদত্ত ফরজ ইবাদত সমূহ যথাযথ ভাবে পালন করুন। তাঁর প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতের অনুসরণ করুন। মহান আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র লায়লাতুল কদর এর মর্যাদা প্রসঙ্গে “আল কদর” নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাযিল করেছেন। এরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই আমি তা (আল কুরআন) অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত রজনীতে। তুমি কি জান মহিমান্বিত রজনী কি? মহিমান্বিত রজনী হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। সে রাতে ফেরেস্তাগণ এবং রূহ (জিব্রাইল আ🙂 অবতীর্ণ হন প্রত্যেক কাজে তাদের প্রভুর অনুমতিক্রমে সে, শান্তিই–শান্তি সে রজনীতে উষার আবির্ভাব পর্যন্ত।” (সূরা আল কদর)
লায়লাতুল কদর’র অর্থ ও তাৎপর্য: লায়লাতুল কদর শব্দ দুটি আরবি। লায়লাতুন অর্থ রাত বা রজনী, কদর অর্থ সম্মান মর্যাদা সুতরাং লায়লাতুল কদর অর্থ সম্মানিত বা মর্যাদা মন্ডিত মহিমান্বিত রজনী। আমাদের দেশে যা শবে কদর নামে প্রচলিত। শব শব্দটি ফার্সী, আরবি লায়লাতুন শব্দের সমার্থবোধক। ইমাম যুহরীর বর্ণনা মতে কদর রজনী অন্যসব রজনীর তুলনায় অধিক সম্মানের অধিকারী এ কারণে এ রজনীকে লায়লাতুল কদর বলা হয়। (কুরতুবি ২০:১৩০)
উম্মতে মোহাম্মদীকে লায়লাতুল কদর দান করার তাৎপর্য:
বিখ্যাত হাদীস গ্রন্থ মুআত্তা শরীফে ইমাম মালিক (র🙂 বর্ণনা করেন “প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ববর্তী নবীদের উম্মতের বয়স সম্পর্কে অবহিত হলেন, তিনি তাদের তুলনায় স্বীয় উম্মতের বয়স কম দেখতে পেয়ে মনে করলেন আমার উম্মতের লোকেরা কম বয়সের কারণে পূর্ববর্তী নবীদের উম্মতের সমান আমল কীভাবে করতে পারবে। তখন আল্লাহ তা’য়ালা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ রজনী লায়লাতুল কদরের রজনী দান করলেন। (মুআত্তা ইমাম মালেক, হাদীস নং ১৫)
হাদীস শরীফে বর্ণনায় এসেছে একদা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের সম্মুখে পূর্ববতী নবী হযরত আইয়ুব (আ.) হযরত যাকারিয়া (আ.) হযরত হিযকীল (আ.) ও হযরত ইউশা আলায়হিস সালাম প্রমুখ যারা আশি বছর করে আল্লাহর ইবাদত বন্দেগীতে মগ্ন ছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম এ বর্ণনা শুনে ঈর্ষান্বিত হলেন, তখন জিবরাইল (আ.) প্রিয় রাসূলের দরবারে উপস্থিত হলেন নবীজিকে সান্ত্বনা দিলেন, বললেন আপনার প্রভু আপনাকে তার চেয়ে উত্তম দিয়েছেন। অত:পর সূরাতুল কদর তিলাওয়াত করলেন, তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনন্দিত হলেন। (তাফসীরে কুরতবি : ২০: ১৩২)
আল্লাহ তা’আলা একমাত্র শেষ নবীর উম্মতের জন্য লায়লাতুল কদর দান করেছেন: আল্লাহ তা’য়ালা নবীজির উম্মতদের এমনসব বৈশিষ্ট্য দান করেছেন যা পূর্ববর্তী উম্মতদের কাউকে দান করেননি, হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, লায়লাতুল কদরের পবিত্র রজনী আল্লাহ তা’য়ালা শুধুমাত্র আমার উম্মতকে দান করেছেন পূর্বেকার উম্মতের কারো জন্য এ মর্যাদা নসীব হয়নি। (আদ্দূররুল মনসুর ৬: ৩৭১)
হাদীস শরীফের আলোকে লায়লাতুল কদর : হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি লায়লাতুল কদরে ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় সালাত আদায় করবে তাঁর অতীতের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (বুখারী শরীফ হাদীস নং ১৯০১)
হযরত আনাস ইবন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রমজান মাস প্রবেশ করলে রসূলুল্লাহ এরশাদ করলেন, নিশ্চয় এ মাস তোমাদের নিকট উপস্থিত হয়েছে আর এতে এমন এক রজনী রয়েছে যা হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যে এটা থেকে বঞ্চিত হলো সে সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো। এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত করা হয় শুধু হতভাগা ব্যক্তিকে। (ইবন মাযাহ, হাদীস নং ১৬৪৪)
জিবরাইল (আ🙂 ও ফিরিস্তাগণ জমীনে অবতরণ করেন: কদরের রজনীতে হযরত জিবরায়ীল (আ🙂 ফিরিস্তাদের বহর নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করেন, যে সব বান্দা বসে ও দাঁড়িয়ে আল্লাহর ইবাদত করেন তাদের গুণাহ ক্ষমা করার জন্য ফিরিস্তারা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেন। (শুআবুল ঈমান ৩: ৩৪৩)
রমজানের শেষ দশকের ফযীলত: হযরত আয়শা সিদ্দিকা (রা🙂 থেকে বর্ণিত, রসূলুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, তোমরা লায়লাতুল কদরকে রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রজনী সমূহে তালাশ কর। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং ১৯১৩) সংখ্যাগরিষ্ঠ ওলামায়েকেরামের মতে সাতাশতম রজনীতে লায়লাতুল কদর। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) শবে কদর সাতাশতম রজনীতে হওয়ার পক্ষে তিনটি দলিল পেশ করেছেন – ১. লায়লাতুল কদর শব্দটিতে নয়টি অক্ষর আছে সূরা কদরে তা তিনবার উল্লেখ হয়েছে সুতরাং গুণফল দাড়ায় সাতাশ। ২.সূরা কদরে শব্দ সংখ্যা ত্রিশ তন্মধ্যে “হিয়া” শব্দটি সাতাশতম। ৩.হযরত ফারুকে আজম (রা.) শব্দে কদর এর নির্দিষ্টতা সম্পর্কে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস এর নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, বেজোড় সংখ্যা আল্লাহ তা’য়ালার নিকট অধিক প্রিয়, বেজোড় সংখ্যা থেকে সাত সংখ্যাটি আরো বেশী প্রিয়। অত:পর সাত আসমান, সাত যমীন, সপ্তাহের সাতদিন, জাহান্নামের সাত স্তর, তাওয়াফের সাত চক্কর, সাফা মরওয়ায় সাতবার প্রদক্ষিণ, সাতবার কক্ষর নিক্ষেপ, সূরা ফাতেহায় সাত আয়াত, কুরআনের সাত কেরাত, আসহাবে কাহাফের সাতজন গুহাবাসী ইত্যাদি উল্লেখ করেছেন। (গুনীয়াতুত তালেবীন, পৃ: ২৮৭)
আল্লাহ তা’য়ালা পাঁচটি বিষয় গোপন রেখেছেন: ১.ইবাদত বন্দেগীতে আল্লাহ সন্তুষ্টি গোপন রেখেছেন। ২.তাঁর নাফরমানিতে তার ক্রোধ ও শাস্তি গোপন রেখেছেন। ৩.নামাযের মধ্য সালাতুল ওস্তাকে গোপন রেখেছেন। ৪.তাঁর সৃষ্টির মধ্যে তাঁর প্রিয় বান্দাকে গোপন রেখেছেন। ৫.রমজানুল মুবারকে লায়লাতুল কদর গোপন রেখেছেন।(গুনীয়াতুত তালেবীন,পৃ: ২৮৭)
লাইলাতুল কদরের দুআ ও আমল: লাইলাতুল কদর রজনীতে বান্দা আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য মসনুন দুআ সমূহ পাঠ করবেন, জীবনে অন্যায় পাপাচার ও অপরাধ কর্ম থেকে ক্ষমা প্রার্থনার দুআ সমূহ পাঠ করবেন। কুরআন তিলাওয়াত ও যিকর থেকে শুরু করে সব ধরনের ইবাদত ইসলামে স্বীকৃত ও অনুমোদিত। তবে অন্যান্য দুআ ছাড়াও একটা বিশেষ দুআ কদরের রাতে অধিক পরিমাণ পড়তে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের শিখিরে গেছেন, হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা সিদ্দিকা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ কে জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি যদি কদরের রাত পেয়ে যাই কোন দুআটি পাঠ করব। নবীজি এরশাদ করেন, তুমি এ দুআটি পাঠ করবে “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি”। অর্থ: হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি পরম ক্ষমাশীল এবং ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দিন। (তিরমিযী, হাদীস: ৩৫১৩)
শবে কদরের নফল ইবাদত:
কদর রজনীতে নফল ইবাদতের ফযীলত সম্পর্কে আউলিয়ায়ে কেরাম বুজুর্গানেদ্বীন ও হক্কানী ওলামাদের বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। এ রজনীতে চার রাকাত, আট রাকাত, বার রাকাত, অনেকে বিশ রাকাত নামায পড়েছেন মর্মে প্রমান পাওয়া যায় “প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতেহার পর সূরা তাকাসূর একবার এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস তিনবার পাঠ করবে, এক বর্ণনায় দু রাকাতের নিয়ত করে ৬ নিয়তে বার রাকাত আদায় করাও ফযীলত পূর্ণ। প্রথম রাকাতে সূরা কদর দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস তিনবার পড়বে। প্রতি চার রাকাত অন্তর একশতবার দরুদ শরীফ পাঠ করবে, হযরত ইসমাইল হক্কী রাহমাতুল্লাহি আলাইহ বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি শবে কদরে ইখলাসের সাথে নফল নামায আদায় করবে তার বিগত জীবনের গুনাহ সমূহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। (আনোয়ারুল বয়ান, খন্ড:৩য়, পৃ: ৯৬, নুযহাতুল মাজালিস, খন্ড:১, পৃ: ১২৯, তাফসীরে রহুল বয়ান)
আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে মহিমান্বিত ফযিলত পূর্ণ রজনী লায়লাতুল কদরে পূণ্যময় আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা–এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), বন্দর, চট্টগ্রাম। খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।












