জুম্‌’আর খুতবা

রমজানুল মোবারকে ইতিকাফের ফযীলত ও মাসায়েল

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি | শুক্রবার , ৬ মার্চ, ২০২৬ at ৬:১০ পূর্বাহ্ণ

ইতিকাফ শব্দের আভিধানিক ও শরয়ী অর্থ: ইতিকাফ শব্দিটি আরবি, “আক্‌ফুন” মূল ধাতু থেকে নির্গত। আকফ অর্থ অবস্থান করা। শরীয়তের পরিভাষায় যে মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাত সহকারে নিয়মিত আদায় করা হয় এমন মসজিদে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দ্যেশে নিয়ত সহকারে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলা হয়।

পবিত্র কুরআনের আলোকে ইতিকাফের নির্দেশনা: পবিত্র রমজান মাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের নাম ইতিকাফ। এর ফযীলত পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমানিত। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন স্মরন কর, সে সময়টার কথা যখন আমি কাবা গৃহকে মানব জাতির মিলনকেন্দ্র ও নিরাপত্তাস্থল করেছিলাম এবং বলেছিলাম তোমরা ইবরাহীমের দাঁড়ানোর স্থানকে সালাতের স্থানরূপে গ্রহণ কর, এবং ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে আমার গৃহ তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী ও রুকু সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখতে আদেশ দিয়েছিলাম। (সূরা: বাকারা: ১২৫)

অন্য আয়াতে আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, “স্ত্রীদের সাথে তোমরা সহবাস করো না যখন তোমরা মসজিদগুলোতে ইতিকাফরত থাকো। (সূরা: বাকারা, আয়াত: ১৮৭)

হাদীস শরীফের আলোকে ইতিকাফের নির্দেশনা:

রমজানের শেষ দশদিন ইতিকাফ করা সুন্নাত “হযরত আয়িশা সিদ্দিকা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান মাসের শেষ দশদিন ইতিকাফ করতেন। তিনি তাঁর ওফাত পর্যন্ত এভাবে ইতিকাফ করেন অতঃপর তাঁর স্ত্রীগণ তাঁর পরে ইতিকাফ করেন।” (বুখারী ও মুসলিম)

হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি রমজানে দশদিন ইতিকাফ করতেন, এক বছর সফরে যাওয়ায় ইতিকাফ করতে পারেননি তাই যে বছর ওফাত বরন করেন সে বছর বিশ দিন ইতিকাফ করেন। (মুসনাদে আহমদ, আবু দাউদ)

একবার হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি জাহেলী যুগে মসজিদুল হারামে একরাত ইতিকাফের মান্নত করেছিলাম, প্রতি উত্তরে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন তুমি তোমার মান্নত পূর্ণ করো।

হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি রমজানে দশ দিনের ইতিকাফ করলো সে যেন দুটি হজ্ব ও দুটি ওমরা আদায় করলো। (বায়হাকী শরীফ)

ইতিকাফ সুন্নাতে মুআক্কাদা কিফায়া:

ইতিকাফ সুন্নাতে মুআক্কাদা কিফায়া। যদি মহল্লা বা এলাকার মসজিদে কেউ ইতিকাফ না করে তবে সুন্নত পরিত্যাগের কারণে সংশ্লিষ্ট মহল্লার সকলেই গুনাহগার হবে। যদি একজনও ইতিকাফ পালন করে তবে সকলেই দায়মুক্ত হবে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো শেষ দশকের বেজোড় রজনীতে লায়লাতুল কদর তালাশ করা এবং এ রাতের সওয়াবের অধিকারী হওয়া। রমজানের শেষ দশকের ইতিকাফ পালনে নিয়ম হলো রমজানের বিশ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্বে ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে প্রবেশ করবে এবং ত্রিশে রমজান সূর্যাস্তের পর বা উনত্রিশ তারিখ চাঁদ দেখার পর মসজিদ থেকে বের হবে। যদি বিশ তারিখ মাগরীব নামাযের পর ইতিকাফের নিয়ত করল তাহলে সুন্নাতে মুআক্কাদাহ আদায় হবেনা। (দুররুল মোখতার, আলমগীর, বাহারে শরীয়ত, খন্ড:, পৃ: ১৮১)

ইতিকাফের জন্য শর্ত:

ই’তিকাফের জন্য মুসলমান, বুদ্ধিমান হওয়া শর্ত। নারীরা হায়েয ও নিফাস হতে পবিত্র হওয়া শর্ত। ইতিকাফের জন্য জামে মসজিদ হওয়া শর্ত নয়। (রদ্দুল মোখতার, আলমীরি, ১ম খন্ড)

মাসআলা: মক্কা মোকাররমার হেরম শরীফে ইতিকাফ থাকা সর্বোত্তম, অতঃপর মসজিদে নববীতে অতঃপর মসজিদুল আকসায়, অতঃপর যে মসজিদে বড় জামাত হয়। (বাহারে শরীয়ত, খন্ড: , পৃ: ১৮০)

মাসআলা: মহিলারা মসজিদে ইতিকাফ থাকা মাকরুহ বরং ঘরের মধ্যে তারা ইতিকাফ করবে, তবে এমন স্থানে করবে যা নামায পড়ার জন্য নির্ধারিত রেখেছে যেটাকে ঘরের মসজিদ বলা হয়। মহিলার জন্য ঘরে নামাযের জন্য একটিস্থান নির্ধারণ করে রাখা মুস্তাহাব। এবং সে স্থানটি প্লাট ফর্মের ন্যায় উঁচু করবে। পুরুষের জন্যও ঘরে নফল নামায আদায় করার জন্য একটি স্থান নির্ধারণ উচিৎ। পুরুষরা নফল নামায ঘরে পড়া উত্তম।(দুরুল মোখতার, রদ্দুল মোখতার, বাহারে শরীয়ত, খন্ড: , পৃ: ১৮১)

সুন্নাত ইতিকাফ অর্থাৎ রমজান শরীফে শেষ দশকে যে ইতিকাফ পালন করা হয় সেটাতে রোযা রাখা শর্ত। মুস্তাহাব ইতিকাফের জন্য রোজা শর্ত নহে।

ইতিকাফকারীর করণীয় আমল: ইতিকাফ পালন কালে চুপ থাকবেনা কথাও বলবে না। কুরআন তিলাওয়াত করবেন, যিকর, তাসবীহ, তাহলীল পড়বেন, নফল নামায পড়বেন, হাদীস শরীফ পাঠ করবেন, অধিকহারে দরুদ শরীফ, দ্বীনি ইলম অর্জন করবে দ্বীনি শিক্ষার আলোচনা করবে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও অন্যান্য নবীদের (আলাইহিমুস সালাম)’র জীবনী গ্রন্থ আউলিয়ায়ে কেরাম ও মকবুল বান্দাদের ঘটনাবলী ও দ্বীন সম্পর্কে লিখিত বিষয়াদি পাঠ করবেন। (দুররুল মোখতার, বাহারে শরীয়ত, খন্ড: , পৃ: ১৮১)

যে সব কারণে ইতিকাফ ভঙ্গ হয়ে যায়: . শরয়ী প্রয়োজন ব্যতীত মসজিদ থেকে বের হওয়া, মানবীয় প্রয়োজন যেমন মলমূত্র ত্যাগ করার ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে মসজিদের বাইরে গেলে ই’তিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে।

. রোগী দেখা বা রোগীর সেবার জন্য মসজিদ থেকে বের হতে পারবেনা।

. ই’তিকাফকারী জানাযার সালাত আদায় করার জন্য মসজিদ থেকে বের হতে পারবেনা। (আলমগীরি ১ম খন্ড, ফতোয়ায়ে শামী, খন্ড:)

. ই’তিকাফ অবস্থায় সঙ্গম, চুম্বন, স্পর্শ করা বা আলিঙ্গন, বীর্যপাত হোক বা না হোক ই.তিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে।

. ই’তিকাফ অবস্থায় কোন মহিলার মাসিক হলে ই’তিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে। (বাদায়েউস সানায়ে, ২য় খন্ড)

পুরুষদের ইতিকাফ হতে হবে মসজিদে : পুরুষদের জন্য ঘরে ই’তিকাফ করার অনুমোদন নেই। ইতিকাফের বরকত ও উপকারিতা তখনই অর্জিত হবে যখন দুনিয়াবি চিন্তাধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বান্দা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর নিকটবর্তী হবেন। এমনকি অতি প্রয়োজনীয় ব্যাপার ছাড়া মোবাইলে কথা বলা থেকেও বিরত থাকবেন। ইতিকাফ অবস্থায় মোবাইল যদি সাথে রাখেন সেক্ষেত্রে অবশ্যই জরুরি প্রয়োজনেই কেবল ব্যবহার করবে। নারীদের ক্ষেত্রে ইতিকাফের জন্য স্বামীর অনুমতি অপরিহার্য। নফল রোযা রাখতে হলে যেমন স্ত্রীর জন্য স্বামীর অনুমতি প্রয়োজন তেমনি ইতিকাফের জন্যও স্বামীর অনুমতি অপরিহার্য।

ওয়াজিব ও সুন্নাত ইতিকাফের জন্য রোজা রাখা জরুরি: ইতিকাফরত মসজিদে যদি জুমআ না হয়, তখন ইতিকাফকারী পাশ্ববর্তী যেই মসজিদে জুমআ অনুষ্ঠত হয় সেখানে গিয়ে জুমআ আদায় করবে, জুমআ আদায় করেই ইতিকাফের মসজিদে ফিরে আসবে। নফল ইতিকাফের জন্য রোযা রাখা জরুরি নয়। অবশ্য ওয়াজিব ও সুন্নাত ইতিকাফের জন্য রোযা রাখা জরুরি। (বাদায়েউস সানায়ে, খন্ড: , পৃ: ১০৮১০৯)। নফল ইতিকিাফের জন্য নির্ধারিত কোনো সময় নেই, সাধারণভাবে যে কোন সময় ইতিকাফ করা নফল। (মা’আরিফুস সুনান, খন্ড:, পৃ: ১৯১১৯২)

কেউ যদি নির্দিষ্ট দিনের বা তারিখে ইতিকাফের মান্নত করে তাকে ঐ নির্দিষ্ট দিনে বা তারিখেই ইতিকাফ পালন করতে হবে। শরয়ী ওযর ব্যতীত তা আদায়ে বিলম্ব করা জায়েজ নয়। (বাহরুর রায়েক, খন্ড:)-হে আল্লাহ রমজানুল মুবারকে আমাদের ক্ষমা করুন, কুরআনের বরকত, রহমত ও নিয়ামত আমাদের নসীব করুন। আমীন।

লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসাএ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর; খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

মুহাম্মদ আবদুল করিম

খরনা, পটিয়া, চট্টগ্রাম।

প্রশ্ন: আমাদের দেশের কয়েকটি জেলার কিছু মুসলমানরা সৌদি আরব তথা মধ্য প্রাচ্যের অনুসরনে একদিন আগে রোজা ও ঈদ পালন করে থাকেন। এ বিষয়ে শরয়ী সমাধান জানালে কৃতার্থ হব।

উত্তর: শরয়ী বিষয়ে কোন দেশের অনুসরণ নয় কুরআন সুন্নাহ ও ফোকাহায়ে কেরামের সিদ্ধান্তই সমাধানের মূলভিত্তি। পবিত্র কুরআনে চাঁদ দেখার বিধান প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, হে হাবীব আপনাকে নতুন চাঁদ সম্পর্কে (তারা) জিজ্ঞেস করছে, আপনি বলুন, সেটা সময়ের কতগুলো প্রতীক মানবজাতি ও হজ্বের জন্য। (সূরা বাক্বারা, পারা:০২, আয়াত: ১৮৯)। ভৌগলিক কারণে দেশে দেশে চাঁদ দেখার ভিন্নতা হয়ে থাকে, যে দেশে যখন চাঁদ দেখা যায় সে অনুযায়ী রোজা ও ঈদ পালনে শরীয়তের নির্দেশ রয়েছে। হাদীস শরীফে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো, চাঁদ দেখে রোজা ছাড়ো, যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তবে শাবান মাস ত্রিশ দিনে পূর্ণ করো, (বুখারী ও মুসলিম) চান্দ্র মাসের তারিখ গণনা চাঁদ দেখার সাথে সম্পৃক্ত। শাবানের ঊনত্রিশ তারিখ সূর্যাস্তের সময় চাঁদ দেখা ওয়াজিবে কেফায়া, চাঁদ দেখা গেলে রোজা রাখা আরম্ভ করবে। ( আলমগীরি ১/২১৭, বাহারে শরীয়ত, ৫ম খন্ড, পৃ: ১৩৪)

সুতরাং সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে অথবা সারা বিশ্বে একই দিনে রোজা ও ঈদ পালন করার দাবী অযৌক্তিক ও বাস্তবতা বিরোধী। জ্যোতিবিদ্যার আলোকে একথা বলা যে চাঁদ উদিত হয়েছে বা হয়নি তা গ্রহণযোগ্য নয়। (আলমগীরি, বাহারে শরীয়ত, ৫ম খন্ড, পৃ: ১৩৫)

পূর্ববর্তী নিবন্ধরামাদান ও আল্‌-কোরআন-এক অবিচ্ছেদ্য অংশ
পরবর্তী নিবন্ধমরিয়ম নগর যুব কল্যাণ সংস্থার শিক্ষা সামগ্রী বিতরণ