জুম্‌’আর খুতবা

ইসলামে তারাবীহ নামাযের ফযীলত

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি | শুক্রবার , ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৫:৫৮ পূর্বাহ্ণ

সম্মানিত মুসলিম ভাইয়েরা!

আল্লাহ তা’য়ালাকে ভয় করুন! মহান প্রভুর ইবাদত করুন, ফরজ নামায সমূহ আদায় করুন, রমজান মাসে রোজা পালন করুন, রাত্রিতে তারাবীহ আদায় করুন, নবীজির সুন্নাত অনুসরণ করুন। খোলাফায়ে রাশেদীনের পদাঙ্ক অনুসরণ করুন, সম্মানিত সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈদের কথা ও আমল সমূহ অনুসরণ করুন। মহান আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন, “ঈমান ও আমলে যেসব মুহাজির ও আনসার সাহাবীগণ সকলের অগ্রগামী এবং পরবর্তীতে যারা যথার্থরূপে তাদের অনুসরণকারী তাদের সকলের প্রতি আল্লাহ পাক সন্তুষ্ট এবং তাঁরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। আল্লাহ পাক তাঁদের জন্য এমনসব জান্নাত তৈরী করে রেখেছেন যে গুলোর নিম্নদেশে স্রোতস্বীনি প্রবাহিত। তাঁরা সেথায় অবস্থান করবেন এটা এক বিরাট সাফল্য” (সূরা: তাওবা, আয়াত: ১০০)

হে মানবমন্ডলী! জেনে রাখুন! তারাবীহ নামায নারী পুরুষ সকলের জন্য সুন্নাতে মোয়াক্কাদা। আর জামাতের সাথে আদায় করা সুন্নাতে কেফায়া। তারাবীহ নামাযের ফজিলত ও বিশ রাকাত হওয়া প্রসঙ্গে অসংখ্য হাদীস শরীফ বর্ণিত হয়েছে, এ পর্যায়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস শরীফ সকলের জ্ঞাতার্থে পেশ করা হলো।

তারাবীহ শব্দের অর্থ:

আরবি তারাবীহ শব্দটি বহুবচন। এক বচনে তারবীহাতুন। এর অর্থ আরাম করা, বিশ্রাম করা। তারাবীহ নামাযে প্রতি চার রাকাত আদায়ান্তে কিছুক্ষণ কলেমা দুআ জিকর পড়া হয় এবং বিশ্রাম নেয়া হয়, তাই তারাবীহ নামে নাম করণ হয়েছে। তারাবীহ নামাযের সময় হলো এশার নামাযের ফরজ ও সুন্নাত আদায়ের পর বিতরের পূর্বে তারাবীহ নামায পড়তে হয়। (হাশিয়াতুল হেদায়া, :১৩৪)

হানাফী মাযহাব মতে তারাবীহ নামায পুরুষ ও মহিলা সকলের জন্য সুন্নাত মুয়াক্কাদা। তারাবীহ নামায ছেড়ে দেয়া জায়েজ নেই। (দুরুল মোখতার, বাহারে শরীয়ত: খন্ড: , পৃ: ৪৯)

হাদীস শরীফের আলোকে বিশ রাকাত তারাবীহ এর দলীল:

হযরত সায়েব ইবনে ইয়াযীদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, তাঁরা সাহাবায়ে কেরাম ও তাবিঈগণ ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)’র যুগে বিশ রাকাত নামায পড়তেন। তিনি আরো বলেন, তাঁরা নামাযে একশত আয়াত বিশিষ্ট সূরাসমূহ তিলাওয়াত করতেন। উসমান (রা.)’র যুগে দীর্ঘ সময় নামাযের কারণে তাঁরা (কেউ কেউ) লাঠিতে ভর করে দাড়াতেন। (বায়হাকী, সুনানুল কুবরা, হাদীস: ৪২৮৮)

হযরত ইয়াহিয়া বিন সাঈদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বর্ণনা করেন, হযরত ওমর (রা.) এক ব্যক্তিকে বিশ রাকাত নামায পড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। (ইবনে আবি শায়বা, আল মুসান্নাফ, খন্ড:, পৃ: ১৬৩)

হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি রমযানে কারীগণকে ডাকেন এবং তাদের একজনকে আদেশ করেন তিনি যেন লোকদের নিয়ে বিশ রাকাত তারাবীহ পড়েন এবং আলী (রা.) তাঁদের নিয়ে বিতর পড়তেন। (সুনানুল কুবরা, বায়হাকী, খন্ড: , পৃ: ৪৯৭)

বর্ণিত তিনটি হাদীস শরীফে রমজানে বিশ রাকাত তারাবীহ পড়ার দালিলিক প্রমাণ উপাস্থাপিত হয়েছে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, খোলাফায়ে রাশেদীন সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, মুজতাহিদ ইমামগণ ও উম্মতের ইজমা দ্বারা প্রমাণিত যে তারাবীহ নামায বিশ রাকাত। ইসলামের অনেকগুলো প্রমাণিত আমল নিয়ে দেশে বিদেশে মুসলিম সমাজে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, মুসলমানদের ঈমান আক্বিদা ও আমল নিয়ে নানাবিধ চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে, ইসলামের বিগত দেড় হাজার বৎসরের ইতিহাসে চার মাযহাবের মুজতাহিদ ইমাম ও ফকীহগণের কেউ তারাবীহ নামায আট রাকাত বা দশ রাকাত বা বিশ রাকাতের কম বলেছেন এমর্মে পৃথিবীর কোন হাদীস তাফসীর ও ফিকহর কিতাবের কোনো নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণ্য দলীলের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবেনা। মুসলিম উম্মাহর সম্মিলিত ও অবিচ্ছিন্ন কর্মধারা তারাবীহ নামাযের রাকাত সংখ্যা কমানোর ব্যাপারে অনেকে দেশে বিদেশে তাদের অশুভ চক্রান্ত অব্যাহত রেখেছে। মুসলমানদেরকে ইবাদত থেকে বঞ্চিত করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, বিশ রাকাত তারাবীহ নিয়ে তাদের আপত্তি, অথচ বিশ রাকাত নিয়ে আপত্তি করার অস্তিত্ব সাহাবীর যুগ, তাবেঈনদের যুগ, তাবে তাবেয়ীদের যুগ, মুজতাহিদ ইমামগণের কোনো যুগে খুঁেজ পাওয়া যাবেনা। তাদের দাবী হলো বিশ রাকাতের কোনো প্রয়োজন নেই, আট রাকাতই যথেষ্ট, এর বেশি পড়া বিদআত। তারাবীহর সংখ্যা নিয়ে লা মাযহাবীদের আবিষ্কার ও আজগবী গবেষণার শাখা প্রশাখা বর্তমানে দেশে বিদেশে বিস্তৃত হচ্ছে এর ডালপালা ক্রমশ বিস্তার ঘটছে, মুসলিম উম্মাহর ঈমান ইসলামের প্রাণকেন্দ্র হারামাঈন শরীফাইন মক্কা মদীনায় তারাবীহ এর সূচনাকাল থেকে সর্বদা বিশ রাকাত ছিল ধারাবাহিক আমল। কোন শাসকের আমলে আট রাকাত হয়নি, অথচ দুঃখজন হলেও সত্য যে, শরীয়তের বিধি বিধান উপেক্ষা করে দলীল প্রমাণ জলাঞ্জলি দিয়ে বিগত কয়েক বছর থেকে হারামাঈণ শরীফাঈনে দশ রাকাত আদায় করা হচ্ছে। মুসলিম উম্মহার ঈমান আমল নিয়ে খেল তামাশা করার অধিকার তাদেরকে কে দিল? বিশ রাকাত তারাবীহ এর উপর উম্মতের ইজমা প্রতিষ্ঠিত। বিশ রাকাতের বিরুদ্ধে কথা বলার শরয়ী ভাবে কারো অধিকার নেই। বিশ রাকাতের বিপক্ষে ও আট রাকাতের সমর্থনে তাদের কোন দলীল নেই। এ প্রতারক ধোঁকাবাজরা বুখারী শরীফের তাহাজ্জুদ সংক্রান্ত একটি হাদীসকে তারাবীহ এর নামে চালিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে যাচ্ছে। হাদীসটি নিম্নে পেশ করা হলো এবং হাদীসের সঠিক মমার্থ পাঠকের জ্ঞাতার্থে উপস্থাপন করার প্রয়াস পাব।

হযরত আবু সালমা ইবনে আব্দুর রহমান হতে বর্ণিত, তিনি হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) কে জিজ্ঞেস করেন, রমজান মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামায কেমন ছিলো? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান ও অন্যান্য মাসে এগার রাকাতের বেশি নামায পড়তেন না। (বুখারী শরীফ, খন্ড:, পৃ: ১৫৪)

উক্ত হাদীসের ভিত্তিতে লা মাযহাবীদের দাবী হলো তারাবীহ আট রাকাত, নবীজি রমজান ও রমজান ব্যাতীত অন্য সময়ে ১১ রাকাতই পড়তেন, প্রথমে চার রাকাত, অতপর চার রাকাত, অতঃপর তিন রাকাত বিতর। সুতরাং তারাবীহ হলো আট রাকাত। বর্ণিত হাদীসটি তাহাজ্জুদ সম্পর্কিত। হাদীসটি গভীরভাবে লক্ষ্য করলে বিষয়টি পরিস্কার হবে। ১. ইমাম বুখারী হাদীসটি তাহাজ্জুদের অধ্যায়ে এনেছেন, . হাদীসটি কিয়ামুল লাইল অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, এতে প্রতীয়মান হলো হাদীসটি তাহাজ্জুদ প্রসঙ্গে। নবীজি তাহাজ্জুদ আট রাকাত পড়তেন, এতে কারো দ্বিমত নেই। ৩. আয়েশা (রা.) বলেছেন, এ আমল রমজানেও ছিলো অন্যান্য মাসেও ছিলো। এর দ্বারা বুঝা যায় এ নামায ছিল তাহাজ্জুদের। কারণ অন্য মাসে তারাবীহ আদায় করা হয় না। তারাবীহ শুধু রমজানেই আদায় করা হয়, সুতরাং হযরত আয়েশা (রা.) তারাবীহ এর নয় তাহাজ্জুদের কথাই বলেছেন। ৪. আয়েশা (রা.) এর এ হাদীস দ্বারা তাঁর কামরায় নামায পড়া প্রমাণ হয়। নবীজি তারাবীহ তিন দিন মসজিদে গিয়ে সাহাবীদের কে নিয়ে পড়েছেন মর্মে বুখারীর অন্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত সুতরাং এ হাদীস দ্বারা তারাবীহ এর দলীল দেওয়া মোটেও যুক্তিসঙ্গত নয়। তারাবীহ নামায বিশ রাকাত ১৬টি বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। লা মাযহাবীগণ আট রাকাত প্রমাণের জন্য আর একটি প্রতারাণার আশ্রয় নিয়ে থাকে সেটি হলো ইমাম বুখারী হাদীসটি তারাবীহ অনুচ্ছেদেও এনেছেন, সেটির জবাব হলো তাহাজ্জুদ নামায রমজান ও গায়রে রমজানে সব সময় পড়া যায়। এ কারণে ইমাম বুখারী তাহাজ্জুদের অনুচ্ছেদ ও রমজানের অনুচ্ছেদ উভয়টিতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। বিশ রাকাত প্রসঙ্গে মুজতাহিদ ইমামগণের ইজমা ইমাম আবু হানিফা (রহ.) থেকে বর্ণিত, রমজানের প্রতি রাতে তারাবীহ নামায বিতরের নামায ছাড়া পাঁচ তারাবিহায় বিশ রাকাত। (ফতোওয়ায়ে কাযি খান: : ১১২)

ইমাম শাফেয়ী (রহ.) মতে বিশ রাকাত:

হযরত ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বর্ণনা করেন, তারাবীহ নামায আমার নিকট বিশ রাকাত এ জন্যই পছন্দীয় যে হযরত ওমরা (রা.) থেকে এরূপই বর্ণিত হয়েছে, মক্কাবাসীরাও এভাবে বিশ রাকাত তারাবীহ আদায় করেন। (কিতাবুল উম্ম: :১৪২)

ইমাম নওভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বর্ণনা করেন, সকল ওলামায়ে কেরামের ঐক্যমতে তারাবীহ সুন্নাত এবং তা বিশ রাকাত। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস মোল্লা আলী ক্বারী বর্ণনা করেন, তারাবীহ নামায বিশ রাকাতের উপর সাহাবীগণের ইজমা প্রতিষ্ঠিত। মহান আল্লাহ নবীজির সুন্নাত বিশ রাকাত তারাবীহ আদায় করার তাওফিক দান করুন।

লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসাএ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম; খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

মুহাম্মদ আনোয়ারুল আজীম

শোভনদন্দী, পটিয়া, চট্টগ্রাম।

প্রশ্ন: মসজিদে পানাহার ও ইফতার করা সম্পর্কে শরয়ী সমাধান জানালে কৃতার্থ হব।

উত্তর: মসজিদে পানাহার করা, নিদ্রা যাওয়া জায়েজ নেই। পানাহার করার ইচ্ছা করলে ই’তিকাফের নিয়্যত করে সমজিদে প্রবেশ করতে হবে। শুধুমাত্র ই’তিকাফকারীর জন্য পানাহার করার অনুমতি রয়েছে। (বাহারে শরীয়ত, খন্ড:, পৃ: ৩৭০)

কেউ যদি মসজিদে পানাহার করতে চায়, ইফতার করতে চায়, সে যেন ই’তিকাফের নিয়্যত করে। (রদ্দুল মুহতার, খন্ড:, পৃ: ৪৩৫)

মসজিদের আদব হলো ইতিকাফকারী ব্যক্তি যেন ইতিকাফকালীন সময়ে স্বল্প খাবার গ্রহণ করে এবং পেট হালকা রাখে। (আল মালফুজ, খন্ড:, পৃ: ৩৭৭)

মসজিদে হাসি ঠাট্টা করা, কঠোরভাবে নিষেধ। মসজিদে হাসার কারণে কবরে অন্ধকার নেমে আসবে। (আল মালফুজ, খন্ড:, পৃ: ৩৭৭)

নবীজি এরশাদ করেছেন, মসজিদে হাসলে কবর অন্ধকার হয়ে যাবে। (জামেউস সগীর, হাদীস: ৫২৩১)

পূর্ববর্তী নিবন্ধসোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে মানসিক স্বাস্থ্যে বিপর্যয় ও থ্রি ‘এল’ থিওরি
পরবর্তী নিবন্ধছাদকেন্দ্রিক সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তিকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণার দাবি