আলকুরআনের আলোকে রোযার গুরুত্ব:
হিজরি ২য় সনে পবিত্র রমজানের রোযা ফরজ হয়েছে, প্রত্যেক জ্ঞান সম্পন্ন বিবেকবান সুস্থ প্রাপ্ত বয়স্ক মুসলিম নরনারীর উপর রোজা রাখা ফরজ। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ, তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যেন তোমরা তাকওয়াবান হতে পার। (সূরা: বাকারা, ২: আয়াত: ১৮৩)
আরো এরশাদ হয়েছে, “সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এ মাস পাবে তারা যেন এ মাসে সিয়াম পালন করে আর কেউ অসুস্থ থাকলে কিংবা সফরে থাকলে অন্য সময় এ সংখ্যা পূরণ করবে। (সূরা: বাকারা, আয়াত: ১৮৫)
চাঁদ দেখে রোযা শুরু করা:
সরকারে দুআলম নুরে মোজাচ্ছম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, “তোমরা চাঁদ দেখে রোযা শুরু করবে এবং চাঁদ দেখে তা শেষ করবে। (তিরমিযী)
চাঁদ দেখে রোযা শুরু করা ও চাঁদ দেখে রোযা সমাপ্ত করা অসংখ্য সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যখন তোমরা রমজানের চাঁদ দেখবে তখন রোজা শুরু করবে আবার যখন (শাওয়ালের) চাঁদ দেখবে ঈদুল ফিতর পালন করবে। যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তখন ত্রিশ দিন পূর্ণ করবে। (বুখারী শরীফ)
ইসলামী বিধানে ২৯ শাবান সুর্যাস্তের পর রমজানের চাঁদ অনুসন্ধান করা ফরজে কেফায়া। (মারাকিউল ফালাহ, পৃ: ২৩৯)
“রমজান” শব্দের প্রতিটি অক্ষর তাৎপর্যপূর্ণ:
আরবি বর্ণমালার পাঁচটি বর্ণের সমষ্টি রমজান শব্দটির মধ্যে রয়েছে যথাক্রমে “রা” “মীম” “দ্বাদ” “আলিফ” ও “নূন”। “রা” দ্বারা রিদওয়ানুল্লাহ তথা আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রতি ইংগিত সূচক, “মীম” বর্ণ দ্বারা মাগফিরাতুল্লাহ আল্লাহর ক্ষমা অর্থ প্রকাশক, “দ্বাদ” বর্ণ দ্বারা দ্বিমানুল্লাহ তথা আল্লাহর জিম্মাদারী, “ আলিফ” বর্ণ দ্বারা উলফতুল্লাহ তথা আল্লাহ প্রতি ভালবাসা এবং “নূন” বর্ণ দ্বারা নুরুল্লাহ তথা আল্লাহর জ্যোতি বা আলো অর্থের প্রতি ইংগিত সূচক। অর্থাৎ যে বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে আল্লাহর ক্ষমা প্রাপ্তির প্রত্যাশায় তাঁরই জিম্মাদারী ও ভালবাসায় সিক্ত হয়ে নিজকে সিয়াম সাধনায় সম্পৃক্ত রাখবে তাঁর কলব নূরান্বিত, দ্বীপ্তমান ও জ্যেতিময় হয়ে উঠবে।
আসমানী কিতাব সমূহ রমজানুল মুবারকে অবতীর্ণ হয়েছে :
সম্মানিত নবী রসূলগণের উপর অসংখ্য আসমানী কিতাব পবিত্র রমজান শরীফে অবতীর্ণ হয়েছে।
হযরত আবু যর গিফারী (রা.) থেকে বর্ণিত, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, হযরত ইবরাহীম (আ.)’র উপর সহীফাসমূহ ৩য় রমজান দিবাগত রজনীতে অবতীর্ণ হয়েছে। ছয় রমজান দিবাগত রজনীতে হযরত মুসা (আ.)’র উপর তাওরীত নাযিল হয়েছে। আট রমজান দিবাগত রজনীতে হযরত দাউদ (আ.)’র উপর যবুর শরীফ নাযিল হয়েছে। তের রমজান দিবাগত রজনীতে হযরত ঈসা (আ.)’র উপর ইনযিল শরীফ নাযিল হয়েছে। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর মহিমান্বিত কদরের রজনীতে সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানী কিতাব মহাগ্রন্থ আলকুরআন নাযিল হয়েছে। (গুনীয়াতুত তালেবীন, প্রকাশ কায়রো, মিসর, পৃ: ২৭৬)
সর্বশ্রেষ্ঠ মাস রমজানুল মুবারক :
রমজান মাসের ফযীলত বর্ণনাতীত। বড়পীর হযরত আবদুল কাদের জিলানী (র.) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যে, মানুষের মধ্যে মানব জাতির পিতা সৈয়্যদুল বশর হযরত আদম (আ.) শ্রেষ্ঠ। আরববাসী ও সৃষ্টিকূলের মধ্যে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শ্রেষ্ঠ। রোমবাসীর মধ্যে হযরত সুহাইব (রা.) শ্রেষ্ঠ। আবসিনিয়ার মধ্যে হযরত বিলাল হাবশী (রা.) শ্রেষ্ঠ। বিশ্বের সকল জনপদ ও নগরীর মধ্যে মক্কা নগরী শ্রেষ্ঠ। বায়তুল মুকাদাস শ্রেষ্ঠ উপত্যকা। জুমার দিবস শ্রেষ্ঠ দিবস। আসমানী কিতাবের মধ্যে আল কুরআনই শ্রেষ্ঠ কিতাব। সূরা আল বাক্বারা শ্রেষ্ঠ সূরা। আয়াত সমূহের মধ্যে আয়াতুল কুরসী শ্রেষ্ঠ। হাজরে আসওয়াদ শ্রেষ্ঠ পাথর। পৃথিবীর কুপ সমূহের মধ্যে জমজম শ্রেষ্ঠ কূপ। হযরত মুসা (আ.)’র লাঠি শ্রেষ্ঠ লাঠি। আল্লাহর নবী হযরত ইউনুস (আ.) যে মাছের পেটে ছিলেন, সে মাছ শ্রেষ্ঠ মাছ। হযরত সোলায়মান (আ.)’র ব্যবহৃত আংটি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আংটি। বৎসরের বার মাসের মধ্যে পবিত্র রমজান মাস উত্তম ও শ্রেষ্ঠ মাস। (গুনীয়াতুত তালেবীন, প্রকাশ, কায়রো, মিসর, পৃ: ২৮২)
হাদীস শরীফের আলোকে রমজানুল মুবারকের ফযীলত :
রমজানুল মুবারকের তাৎপর্য ও গুরুত্ব প্রসঙ্গে অসংখ্য সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে, নিম্নে কয়েকটি হাদীস শরীফ উপস্থাপন করার প্রয়াস পাচ্ছি :
হযরত সালমান ফারেসী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, শাবান মাসের শেষ দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে গিয়ে এরশাদ করেছেন, হে মানব মন্ডলী! একটি সম্মানিত মহান মাস। তোমাদের উপর ছায়া বিস্তার করেছে, যে মাস বরকতময়। এ মাসে রয়েছে এমন একটি রজনী যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। মহান আল্লাহ এ মাসের সিয়াম পালন ফরজ করেছেন, এ মাসের রজনীতে ইবাদত করাকে নফল করেছেন, এ মাসে কেউ ভাল কাজ (নফল) করলে অন্য মাসের ফরজের সমান সওয়াব পাবে। এ মাসে কোন ফরজ আদায় করলে অন্য মাসের সত্তরটি ফরজ আদায়ের সমান সওয়াব পাবে। এটি ধৈর্য্যের মাস, আর ধৈর্য্যের প্রতিদান হলো জান্নাত। এটি সহমর্মিতার মাস। এটি এমন মাস যে মাসে মুমীনের রিযক বৃদ্ধি করে দেয়া হয়। এ মাসে যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে ইফতার করাবে তার গুণাহ সমূহ মাফ করে দেয়া হবে। (সহীহ ইবন খুযাইমাহ, ৩য় খন্ড, হাদীস নং ১৮৮৭)
রমজানের রোযা রাখা ফরজ:
প্রত্যেক মুসলিম নরনারীর উপর রমজানের রোযা রাখা আবশ্যক। এ প্রসঙ্গে এরশাদ হয়েছে, “হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, কেউ শরয়ী ওজর বা অসুস্থতা না থাকা সত্বেও রমজানের একটি রোজা না রাখে সে জীবনভর রোযা রাখলেও তার ক্ষতিপূরণ হবেনা যদিও পরবর্তীতে রাখে। (ইবনে মাযাহ, পৃ: ১২০, আবুদউদ, খন্ড ১ম, পৃ: ৩২৬, আনোয়ারুল বায়ান, খন্ড ৩, পৃ: ২৭)
হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) থেকে বর্ণিত, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান সহকারে সওয়াবের আশায় রমজানে কিয়াম তথা তারাবীহ আদায় করবে সে তার গুণাহসমূহ থেকে এভাবে পবিত্র হয়ে যাবে যেমন নবজাত শিশু নিষ্পাপ ভূমিষ্ট হয়েছে। (নাসাঈ শরীফ, হাদীস নং: ২২০৮)
নবীজির উম্মতের পাঁচটি অনন্য বৈশিষ্ট্য :
বরকতময় মাস রমজান। পাঁচটি বৈশিষ্ট দিয়ে আল্লাহ নবীজির উম্মতকে মর্যাদা মন্ডিত করেছেন যা অন্যকোন নবীর উম্মতকে আল্লাহ দান করেন নি।
প্রথম : রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর নিকট মিশকের সুগন্ধির চেয়েও উত্তম।
দ্বিতীয় : ইফতারের সময় পর্যন্ত ফেরেস্তারা রোজাদারের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
তৃতীয় : রমজানের প্রতিদিন আল্লাহ তা’য়ালা জান্নাতকে সুসজ্জিত করেন।
চতুর্থ : রমজানে শয়তানকে শিকল দিয়ে বন্দী করা হয়।
পঞ্চম : রমজানের প্রতিটি রজনীর শেষাংশে আল্লাহ এ উম্মতের রোজাদারকে ক্ষমা করেন। (আদ্বদ্বীয়াউল লামেঈ মিনাল খুতাবিল জাওয়ামেঈ, পৃ: ১৩৬)
কুরআন মজীদ খতম করা:
পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করা সর্বোত্তম ইবাদত। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, তোমরা কুরআন তিলাওয়াত করো, কেননা কিয়ামতের দিন তা তিলাওয়াত কারীর জন্য সুপারিশকারী হিসেবে উপস্থিত হবে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৩৩৭)
নবীজি নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করতেন। রমজানে তিলাওয়াতে অত্যধিক গুরুত্ব দিতেন। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নিশ্চয় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বাধিক দানশীল ছিলেন। রমজানে তিনি আরো বেশী দানশীল হয়ে যেতেন। প্রতি রমজানে জিবরীল আলাইহিস সালাম নবীজির সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং পরস্পরকে কুরআন শোনাতেন। (সুনাদে আহমদ, হাদীস নং: ৩৫৩৯)
ইমাম আজম আবু হানিফা (র.) প্রতি রমজানে একষট্টি কুরআন খতম আদায় করতেন। ত্রিশটি দিনে ত্রিশটি রাতে এক খতম তারাবীতে। (বাহারে শরীয়ত, খন্ড ৪র্থ, পৃ: ৫৫)
ইমাম বুখারী (র.) রমজান শরীফে এক চল্লিশ খতম কুরআন আদায় করতেন, ত্রিশ দিনে ত্রিশ খতম তারাবীতে এক খতম, তাহাজ্জুদ নামাযে প্রতি তিন দিনে এক খতম করে ত্রিশ দিনে দশ খতম আদায় করতেন। (বোখারী শরীফের ব্যাখা গ্রন্থ হাদীয়ুস সারী, পৃ: ৪৮১)
তারাবীহ নামাযে একবার কুরআন মজীদ খতম করা সুন্নাতে মুআক্কাদাহ, দু’বার খতম করা উত্তম, তিন বার করা অধিক উত্তম। (দুররুল মোখতার, বাহারে শরীয়ত, খন্ড ৪র্থ, পৃ: ৫৩)
হাফেজ কুরআনকে সম্মান করা:
নবীজি এরশাদ করেছেন, তোমরা হাফেজে কুরআনদের সম্মান করো যে তাদেরকে সম্মান করলো সে আমাকে সম্মান জানালো। (কানযুল উম্মাল, খন্ড ২, পৃ: ২৫৮, আনোয়ারুল বায়ান, খন্ড ৩ পৃ: ৭)
এছাড়াও পবিত্র রমজান মাসে শেষ দশকে ইতিকাফ পালন করা, নিয়মিত তাহাজ্জুদ নামায আদায় করা, এতিম মিসকীন দরিদ্র, অসহায় মানুষকে সাহায্য করা, শবে কদর অনুসন্ধান করা, অধিক পরিমাণ দান সাদকা করা, উত্তম আমল হিসেবে পরিগণিত করা, মহান আল্লাহ আমাদের সিয়ামের গুরুত্ব অনুধাবন ও করণীয় নেক আমল গুলো সঠিক ভাবে সম্পাদন করার তাওফিক নসীব করুন। আমীন।
লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা–এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), বন্দর, চট্টগ্রাম; খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।
মুহাম্মদ আনোয়ারুল আজীম
অক্সিজেন, বায়েজিদ, চট্টগ্রাম।
প্রশ্ন: ইসলামে সেহেরী খাওয়া সংক্রান্ত নির্দেশনা সম্পর্কে জানালে উপকৃত হব।
উত্তর: হাদীস শরীফ সেহেরী খাওয়া সংক্রান্ত অসংখ্য বর্ণনা এসেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, তোমরা সেহেরী খাও। কারণ সেহেরীতে বরকত রয়েছে। (সহীহবুখারী, হাদীস: ১৯২৩)
হাদীস শরীফে আরো এরশাদ হয়েছে, খেজুর হচ্ছে মু’মিনের সর্বোত্তম সেহেরী। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ২৩৪৫)
মিশকাত শরীফের ব্যাখ্যা প্রণেতা হাদীস বিশারদ মোল্লাআলী ক্বারী (রহ.) বলেন, সেহেরীর সময় অর্ধরাত থেকে শুরু হয়। (মিরকাতুল মাফাতীহ, ৪র্থ খন্ড)
বিলম্বে সেহেরী খাওয়া মুস্তাহাব। তাফসীরে নাঈমীতে আছে, দেরী বলতে রাতের ষষ্ঠ অংশ বুঝায়, সূর্যাস্ত থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত সময়সীমাকে রাত বলা হয়। সাধারণত রাত তিনটা থেকে ৪টা ৫৫ মিনিট পর্যন্ত। বিভিন্ন জেলা ভিত্তিক সময়ের কয়েক মিনিট তারতম্য হয়ে থাকে। সেহেরীর শেষ সময়ের ১০ মিনিট পর ফজরের আজান হয়।











