জুম্‌’আর খুতবা

ইসলামের দৃষ্টিতে শবে বরাতের গুরুত্ব : করণীয় ও বর্জনীয়

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি | শুক্রবার , ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৬:০১ পূর্বাহ্ণ

প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা!

আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করুন! শাবান মাসে ১৫ তারিখ দিবাগত রজনীতে ইবাদত বন্দেগীতে অতিবাহিত করুন। এ পূণ্যময় রজনীর ফযীলত ও রবকত অর্জনে আল্লাহ ও তদীয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্তুষ্টি অর্জন করুন। পবিত্র শবে বরাত তথা শাবান মাসের ১৫ তারিখের দিবাগত রজনী সেই সব পূণ্যময় রজনীর অন্যতম। এ রজনীর গুরুত্ব ও ফযিলত সম্পর্কে কোরআনুল করীম ও হাদীস শরীফে অসংখ্য বর্ণনা বিধৃত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য তাফসীর গ্রন্থসমূহে শবে বরাতের সমর্থনে নির্ভরযোগ্য দালিলিকি প্রমাণাদির বিদ্যমান রয়েছে।

আল কুরআনের আলোকে শবে বরাত:

মহান আল্লাহ্‌ পাক এরশাদ করেন, হামী-, ওয়াল কিতাবিল মুবীন ইন্না আনযালনাহু ফী লায়লাতিন্‌ মুবারাকাতিন্‌ ইন্না কুন্না মুনজীরীনা ফীহা ইয়ুফরাক্কো কুলু আমরিন হাকীম।

অর্থ: হামী-, শপথ ঐ সুস্পষ্ট কিতাবের। নিশ্চয় আমি সেটাকে বরকতময় রজনীতে অবতীর্ণ করেছি। নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। তাতে বন্টন করে দেয়া হয় প্রত্যেক হিকমতময় কাজ। (সূরা: দুখান: )

হযরত ইকরামা রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং একদল সাহাবীদের বর্ণনা মতে আল কোরআনে বর্ণিত লায়লাতুল মোবারকাদ্বারা ১৪ শাবান দিবাগত রজনীকে বুঝানো হয়েছে। এ বরকতময় রজনীতে পবিত্র কোরআনুল করীম লওহে মাহফুজ থেকে প্রথম আসমানে অবতীর্ণ হয়। তাফসীরে কাশশাফ, তাফসীরে কবীর, তাফসীরে সিরাজুম্‌ মনীর, তাফসীরে জুমাল, তাফসীরে সাবী, তাফসীরে রুহুল বয়ানসহ প্রসিদ্ধ তাফসীর গ্রন্থ জালালাইন শরীফসহ ২৭টি তাফসীরের কিতাবে বর্ণিত আয়াতে “লাইলাতুম মুবারাকা” দ্বারা “লাইলাতুল বরাত” কে বুঝানো হয়েছে। (উক্ত শবে বরাতে) ক্বোরআনুল করীম সপ্ত আসমান থেকে প্রথম আসমানে অবতীর্ণ হয়। তাফসীরে জুমালে বর্ণিত হয়েছে কোরআন মজীদ পূর্ণাঙ্গরূপে সেই রাতে লওহে মাহফুজ হতে প্রথম আসমানে অবতীর্ণ হয়েছে।

হাদীস শরীফের আলোকে শবে বরাত:

* হযরত আবু মুসা আশআরী রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা শাবানের ১৫ তারিখ রাতে সমস্ত সৃষ্টির দিকে রহমতের দৃষ্টিতে থাকান এবং আল্লাহ্‌ মুশরিক ও বিদ্বেষপোষণকারী ব্যতীত সকল বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। (ইবনে মাযাহ ১/৪৪৫, হাদীস: ১৩৯০)

* তাফসীরে কুরতুবীতে উল্লেখ হয়েছে, “লায়লাতুম মুবারাকাহ” দ্বারা লায়লাতুল কদর বুঝানো হয়েছে। কারো কারো মতে লায়লাতুন নিসফে মিন শা’বানকে বুঝানো হয়েছে। (তাফসীর কুরতুবী, খন্ড: ১৬, পৃ: ১২৬)

* তাফসীরে কাশশাফে উল্লেখ হয়েছে, লায়লাতুম মুবারাকা দ্বারা “লায়লাতুল ক্বদর” বুঝানো হয়েছে, কারো মতে শা’বানের পনেরতম রাত কে বুঝানো হয়েছে, এর চারটি নাম রয়েছে। লায়লাতুল বারাত এবং লায়লাতুল ক্বদরের মধ্যে চল্লিাশ রাতের ব্যবধান রয়েছে। ( আল জামি লি আহকামিল কুরআন, খন্ড: ১৬, পৃ: ১২৭ তাফসীরে রুহুল বয়ান, খন্ড: , পৃ: ৩১১)

* ইমাম ইবনে কাসির বর্ণনা করেন,“লাইলাতুল মুবারাকা” হল শাবানের ১৫ তারিখের রাত, যেমনটি তাবেয়ী ইকরামা (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে। (তাফসীরে ইবনে কাসির, খন্ড: , পৃ: ২২৫)

* হযরত গাউসুল আযম দস্তগীর আবদুল কাদের জিলানী (.) উক্ত আয়াতের তাফসিরে বর্ণনা করেন,লায়লাতুল মুবারাকা হল শাবানের ১৫ তারিখের রাত শবে বরাতের রাত। (গুনীয়াতুত তালেবীন, পৃ: ৩৪৩)

* বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা প্রণেতা ইমাম বদরুদ্দীন আইনী (রহ.) বর্ণনা করেন, শাবানের ১৫ তারিখের রজনী পূণ্যময় রজনী।

(উমদাতুল কারী, খন্ড: ০২, পৃ: ৩৪৩)

* এ রাতের গুরুত্ব সম্পর্কে আরো এরশাদ হয়েছে, হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন। শাবান মাসের অর্ধ রাতে (শবে বরাতে) জিবরাঈল আলায়হিস্‌ সালাম) আমাকে বললেন, হে মুহাম্মদ! (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) আকাশের দিকে মস্তক উত্তোলন করুন। আমি বললাম এ রজনীর গুরুত্ব কি? তদুত্তরে বললেন, এ রজনীতে আল্লাহ্‌ পাক তিনশত রহমতের দরজা খুলে দেন। যারা আল্লাহর সাথে শিরক করে না, যাদুকর নয়, গনক নয়, বারবার যিনা করে না ও মদ পান করে না এসব বান্দাকে আল্লাহ্‌ পাক ক্ষমা করে দেন। (ইবনে মাযাহ)

এ রজনীর ফজিলত সম্পর্কে আরো উল্লেখ আছে, শায়খুল ইসলাম ইমাম নববী রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন, ইমাম শাফেয়ী রহমাতুল্লাহি আলায়হি প্রণীত তাঁর কিতাবুল উমএ বলেন আমাদের নিকট এ বাণী পৌঁছেছে যে, পাঁচটি রজনীতে দোয়া নিশ্চিত কবুল হয়। ১. জুমার রাতে, . ঈদুল আযহার রাতে, . ঈদুল ফিতরের রাত, . রজব মাসের প্রথম রাত, . ১৫ শাবান রাতে (শবে বরাতের রজনীতে)(শরহুত তাহযীব, খন্ড: ০৫, পৃ:৪৫)

* দুআ কবুলের রজনী:

শবে বরাতের পুণ্যময় রজনীতে বান্দার দুআ ফেরত হয় না। এরশাদ হয়েছে, হযরত আবদুর রজ্জাক বলেন, বাইলামানী থেকে শ্রবণকারী ব্যক্তি আমাকে সংবাদ দিয়েছেন, বাইলামী তাঁর পিতা থেকে তিনি হযরত আবদুল্লাহ বিন ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন, পাঁচ রজনীতে দুআ ফেরত হয় না। জুমার রাত, রজবের প্রথম রাতের, শাবানের ১৫ তারিখের রাত, ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতরের রাত। (ইমাম আব্দুর রাযযাক: আল মুসান্নাফ ৪/৩১৭, হাদীস: ৭৯২৭, ইমাম বায়হাকী: শুয়াবুল ঈমান ৫/২৮৮ পৃ, হাদীস: ৩৪৪০)

শবে বরাতের নাম সমূহ, শবে বরাতের চারটি নাম রয়েছে, . লায়লাতুল মুবারাকা তথা বরকতময় রজনী। ২. লায়লাতুল বরাত তথা মুক্তির রজনী। ৩. লায়লাতুর রহমাত তথা রহমতের রজনী। ৪. লায়লাতুস্‌ সক তথা পুরস্কারের সনদ প্রাপ্তির রজনী। (তাফসীরে সাবী)

এ রজনীতে ক্ষমার আযোগ্য যারা:

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তাআলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তাআলা সেই রাতে সকল মুসলমানের ক্ষমা করবেন। কিন্তু গনক, যাদুকর, মদ্যপায়ী, মাতাপিতার অবাধ্যকারী এবং ব্যভিচারী ব্যতীত। [তাফসীর কবীর।]

শবে বরাতে করণীয়:

পুণ্যময় রজনী শবে বরাতে ইবাদত বন্দেগী, দুআ, দরূদ, যিকর, আযকার, তিলাওয়াত, মিলাদ কিয়াম, দান সাদকা ইত্যাদি বরকতময় আমলের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করা উত্তম আমল। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এ রজনীর আমল ও দিনের আমল সম্পর্কে এরশাদ করেন, অর্থাৎ বরাতের রজনীতে জাগ্রত থেকে ইবাদত করো, দিনে রোজা পালন করো। (ইবনে মাযাহ, আসসুনানন ১/৪৪৪, পৃ: ১৩৮)

উত্তম হলো চৌদ্দ অথবা পনের শাবান রোজা রাখা। হযরত সৈয়্যদানা আম্মার ইবনে ইয়াসির রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে বর্ণিত, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি মাগরিবের নামাযের পর ছয় রাকাত নামায পড়বে তার জীবনের সকল প্রকার গুনাহ্‌ ক্ষমা করে দেয়া হবে। (তাবরানী শরীফ)

শবে বরাতে কবর যিয়ারত করা সুন্নাত: বিশুদ্ধসূত্রে বর্ণিত আছে যে, শবে বরাতে হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে গমন করতেন। কবরবাসীদের জন্য দোয়া করতেন। মুসলমানদের উচিত এ পুণ্যময় রাতে সুন্নাতে রসূলের অনুসরণে কবরস্থানে যিয়ারত করা, মৃতদের রূহে ঈসালে সওয়াব করা, স্বীয় অপরাধ থেকে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা, খালেস নিয়তে তওবা করা।

শবে বরাতে রাতব্যাপী ইবাদতে জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়: হযরত মুয়াজ ইবনে জবল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি পাঁচ রজনীতে বিনিদ্র রজনী যাপন করবে রাতভর ইবাদত বন্দেগী করবে, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে। তন্মধ্যে পনের শাবানের রজনী শবে বরাত অন্যতম। (সূত্র, আততারগীব, ওয়াতারহীব, খন্ড২য়, পৃ. ৯৮, বাহারে শরীয়ত, খন্ড, পৃ. ১০৫)

শবে বরাতে রুকুসিজদাকারীদের জন্য শুভ সংবাদ: হুযুর শাহেনশাহে বাগদাদ গাউসুল আযম আবদুল কাদের জীলানী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বলেন, এ রজনীতে (শবে বরাতে) রুকুকারী ও সিজদাকারীদের জন্য সৌভাগ্য, রহমত, বরকত ও নিয়ামতের শুভ সংবাদ।

শবে বরাতে বর্জনীয়: এ রজনীতে মর্যাদা ও পবিত্রতা যথাযথভাবে রক্ষা করতে হবে। কোনভাবেই অযথা সময় নষ্ট, গল্পগুজব, দলবদ্ধভাবে আড্ডা করা, পটকা বাজি, আতশ বাজি, অশ্লীল, নগ্নতা, বেহায়াপনা, উলঙ্গপনা, অসামাজিক কার্যকলাপ, নাচগান, বাদ্যবাজনা ইত্যাদি অপকর্মে লিপ্ত হওয়া জঘন্যতম অপরাধ ও শরিয়তবিরোধী অপকর্ম হিসেবে গণ্য করা হবে।

মহান আল্লাহ আমাদের এ বরকতময় রজনীতে উত্তম আমল করার তাওফিক দিন। আমিন।

লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসাএ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী); খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

 

আবু ছালেহ আনোয়ারী

আনোয়ারা, চট্টগ্রাম।

প্রশ্ন: লায়লাতুল বরাতের রজনীতে মহিলারা কবর যিয়ারতে গমন করা জায়েজ আছে কিনা? জানালে উপকৃত হব।

উত্তর: পুরুষদের জন্য কবর যিয়ারত করা সুন্নাত যা হাদীস দ্বারা প্রমানিত। হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, তোমরা কবর সমূহের যিয়ারত করো, যেহেতু কবর যিয়ারত মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। (সহীহ মুসলিম, খন্ড: , পৃ: ১৩৪)

বিখ্যাত হাদীস গ্রন্থ “মিশকাত” এর ব্যাখ্যাকার মোল্লা আলী ক্বারী (.) বর্ণনা করেন, সর্ব সম্মত মতানুসারে পুরুষদের জন্য কবর যিয়ারত সুন্নাত। মহিলাদের জন্য মাকরূহ কিনা? এ বিষয়ে দুটি মত রয়েছে অধিকাংশ ওলামাদের মতে মাকরূহ। কতেক আলেমদের মতে ফিতনার আশঙ্কা না হলে মাকরূহ নয়।

আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা (.)’র বর্ণনা মতে বিশুদ্ধ মত হলো মহিলারা কবর যিয়ারত গমন জায়েজ নয়। (ফতওয়ায়ে রজভীয়্যাহ, খন্ড:, পৃ: ১৬৫)

হাদীস শরীফে মহিলারা কবর যিয়ারত গমন নিষেধ করা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, কবর যিয়ারতকারী মহিলাদের উপর আল্লাহ অভিসম্পাৎ করেছেন। (ইবন মাযাহ, পৃ: ১৯৩)

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাজনীতির বলি ক্রিকেট: বিশ্বকাপে নেই বাংলাদেশ
পরবর্তী নিবন্ধআনোয়ার হোসেন খান