হযরত শো’আইব আলাইহিস সালাম’র দ্বীনি দাওয়াত
হযরত শো’আইব (আ)’র পরিচিতি: নাম: শোআইব (আ.) তাঁর পিতার নাম মিকাইল ইবন ইয়াশযুন ইবন মাদইয়ান ইবন ইবরাহীম, তিনি হযরত ইবরাহীম (আ.) এর তৃতীয় পুত্র মিদয়নের বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মাদায়েন এলাকার নবী ছিলেন। আল্লাহর নবী হযরত ইবরাহীম (আ.)’র তৃতীয় পুত্র মিদয়নের নামানুসারে এলাকাটি মাদায়েন নামে অভিহিত। আদইয়ান হলো লূত সাগরের নিকটবর্তী সিরিয়া ও হিজাজের সীমান্তবর্তী একটি জনপদের নাম। পূর্ব জর্ডানের সামুদ্রিক বন্দর, “মোআন” এর অদূরে এখনো এ জনপদের অস্তিত্ব বিদ্যমান রয়েছে, তাফসীরকারদের বর্ণনামতে তিনি “খতীবুল আম্বিয়া” অর্থাৎ নবীগণের মধ্যে সুবক্তা হিসেবে তাঁর প্রসিদ্ধি ছিল। তিনি হযরত মুসা (আ.)’র শ্বশুর ছিলেন। পবিত্র কুরআনের ১১ জায়গায় তাঁর নাম মুবারক উল্লেখ হয়েছে। পৃথিবীতে আল্লাহর গযবে ধ্বংস প্রাপ্ত প্রধান ৬টি প্রাচীন জাতির মধ্যে পঞ্চম জাতি হলো “আহলে মাদইয়ান”। এ অবাধ্য জনগোষ্ঠীকে শির্ক ও মূর্তিপূজা থেকে হিদায়াতের পথে সত্যান্বেষী মুক্তিকামী মানুষদের মাঝে দ্বীনি দাওয়াত প্রচার করেছেন। “আসহাবুল আইকাহ” নামেও পবিত্র কুরআনে তাদের ঘটনাবলী বিবৃত হয়েছে। “আসহাবুল আইকাহ” নামে নামকরণের তাৎপর্য হলো আয়কা অর্থ ঘন গাছ পাতা বিশিষ্ট ভূমি, মাদইয়ান অঞ্চল ঘন গাছে আবৃত ছিল তাই মদইয়ানবাসীকে আয়কাবাসী বলা হয়েছে। তাদের বস্তিগুলো ছিলো অত্যন্ত উর্বর ফলফুলে ভরা ও সজীব জমিতে ঘন বাগান বেষ্টিত ছিল। তাদের মূল পেশা ছিল ব্যবসা বাষিজ্য। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, এবং নিশ্চয় আয়কাবাসীরা অবশ্যই অত্যাচারী ছিলো। (সূরা: হিজর, আয়াত: ৭৮, তাফসীরে নূরুল ইরফান, পৃ: ৬৯৯), মাদাইয়ানবাসীরা ব্যবসা বানিজ্যে অসৎ উপায় অবলম্বন করতো সুদ ভিত্তিক লেনদেনে তারা সম্পৃক্ত থাকতো, ব্যবসা বাণিজ্যে তারা প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করত, ক্রেতাকে পরিমাপে কম দিত, নেওয়ার সময় অধিক মাত্রায় গ্রহণ করত, তাদের কেউ কেউ চুরি ডাকাতি ছিনতাই অপকর্মে লিপ্ত ছিলো, বাণিজ্য কাফেলার পণ্য সামগ্রী তাদের ছিনতাইয়ের কবল থেকে মুক্ত ছিলনা।
হযরত শো’আইব (আ.) কে নবী হিসেবে প্রেরণ ও দ্বীনি দাওয়াত প্রচার: নবী–রাসূলগণ “বিপথগামী, দিশোহারা মানুষের” মুক্তির দিশারী হিসেবে পৃথিবীতে প্রেরিত হয়েছেন। কুফর, শির্ক, ব্যবসা বাণিজ্যে প্রতারণা, ওজনে কম দেয়া ও নেওয়ার সময় বেশী নেওয়া ইত্যাদি অন্যায় অপরাধ অপকর্মে নিয়োজিত মানুষগুলোকে আল্লাহর দ্বীনের পথে পরিচালিত করার লক্ষ্যে মহান আল্লাহ মাদইয়ান বাসীর নিকট হযরত শোআইব (আ.) কে দ্বীনি দাওয়াত প্রচারের গুরুদায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করে বিশ্ববাসীকে ধন্য করেছেন। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, “আর আমি মাদইয়ানের অধিবাসীদের কাছে তাদের ভাই শো’আইবকে প্রেরণ করেছিলাম। সে বলেছিল হে আমার কওম, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোন মাবুদ নেই, তোমাদের কাছে এসে গেছে তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণ, সুতরাং পরিমাপ ও ওজন পূর্ণরূপে করবে। এবং লোকদের তাদের প্রাপ্য জিনিস কম দেবেনা। আর পৃথিবীতে শান্তি শৃংখলা প্রতিষ্ঠিত হবার পর বিশৃংখলা সৃষ্টি করবেনা। ইহা তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা মু’মিন হও, আর তোমরা বসে থেকোনা, কোনো পথে ঘাটে এ উদ্দেশ্যে যে, ভয় প্রদর্শন করবে এবং বাধা দিতে আল্লাহর পথে ঐসকল লোককে যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে এবং এ উদ্দ্যেশে যে তাতে বক্রতা অন্বেষণ করবে। স্মরণ কর যখন তোমরা সংখ্যায় কম ছিলে, তখন তিনি তোমাদের সংখ্যায় বৃদ্ধি করেছেন। আর লক্ষ কর কেমন হয়েছিল বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীদের পরিণতি। (সূরা: আল আরাফ, আয়াত: ৮৫ ও ৮৬)
শু’আইব (আ) নিজ সম্প্রদায়ের অহঙ্কারী সর্দারদেরকে আল্লাহর ভয় ও পরকালের দাওয়াত দেন: শু’আইব (আ.)’র অবাধ্য সম্প্রদায়ের অহংকারী সর্দাররা আল্লাহর জমিনে বসবাস করে আল্লাহর মনোনীত নবীকে জনপদ থেকে তাড়িয়ে দেয়ার ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে নবীর প্রতি অসম্মান ও অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছে তারা বলেছিল “আমরা অবশ্যই তোমাকে তোমার সঙ্গীর সাথী মু’মিনদেরকে আমাদের জনপদ থেকে বহিষ্কার করব। (সূরা: আ’রাফ, আয়াত: ৮৮)
আল্লাহর নবী শো’আইব (আ) বিরুদ্ধবাদীদের হুমকী, ধমকী, বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, চুরি–ডাকাতিসহ নানাবিধ অপকর্মের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অব্যাহত রেখে ছিলেন। তিনি এক আল্লাহ ছাড়া কোন কুফরি ও বাতিল অপশক্তির চোখ রাঙানো বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করেননি। তিনি তাঁর জাতির লোকদের মাঝে দ্বীনি দাওয়াত ও আল্লাহর একত্ববাদের পয়গাম তীব্র সাহসিকতার সাথে চালিয়ে গেছেন। তিনি তাঁদেরকে সতর্ক করার পাশাপাশি আল্লাহর ইবাদত ও পরকালকে ভয় করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, “আর আমি মাদইয়ান বাসীদের প্রতি তাদের ভাই শু’আইব কে নবী হিসেবে প্রেরণ করেছিলাম, তিনি বলেছিলেন হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং শেষ দিবসকে ভয় কর আর পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করনা। (সূরা: আনকাবুত, আয়াত: ৩৬)
নবীর প্রতি বিদ্রুপ করার কারণে তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়:
এ অবাধ্য জাতি আল্লাহর নবীর প্রতি সম্মান জানাতে ব্যর্থ হলো। সীমালংঘনকারী এ অসভ্য জাতি কেবল নবীর দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করেনি আল্লাহর নবীর প্রতি মিথ্যারোপ করেছে। নবীর উপদেশের প্রতি ঠাট্টা বিদ্রুপ করার কারণে মহান আল্লাহর কঠিন শাস্তি থেকে তারা কেউ রক্ষা পায়নি, তাদের উপর কঠিন গযব ও শাস্তি নেমে আসে প্রচন্ড ভূমিকম্প শুরু হল, ফলে আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দেন। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, কিন্তু তারা তাকে মিথ্যাবাদী বলল, ফলে ভূমিকম্প তাদেরকে পাকড়াও করল এবং তারা নিজ নিজ গৃহে উপুড় হয়ে পড়ে রইলো। (সূরা: আনকাবুত, আয়াত: ৩৭)
সন্তান–সন্ততি: তাফসীরকার ও ঐতিহাসিকগণের বর্ণনামতে শু’আইব (আ.)’র দুইজন কন্যাসন্তান ছিল বড় কন্যার নাম ছিল সফুরা, আর ছোট কন্যার নাম ছিল লিয়া। (ইবনুল জাওজী, আল মুনতাজাম, ১ম খন্ড, পৃ: ৩৩৬)
শো’আইব (আ.) তার জাতিকে তাওবার আহবান জানান:
পাপী তাপী গুনাহগার সীমালঙ্গনকারী বান্দা অনুতপ্ত হয়ে অনুশোচনা করে অপরাধ স্বীকার করলে এবং মহান আল্লাহ দরবারে কায়মনোবাক্যে তাওবা করলে আল্লাহ বান্দাকে ক্ষমা করেন। তিনি তাঁর কওমকে তাওবার আহবান জানান। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, আর তোমাদের পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, এবং তাঁরই সমীপে তাওবা করো, নিশ্চয় আমার প্রভু পরম দয়ালু প্রেমময়। (সূরা: হুদ, আয়াত: ৯০)
ইন্তিকাল: ঐতিহাসিকগণের বর্ণনামতে হযরত শো’আইব (আ.) দীর্ঘায়ু লাভ করেন এক বর্ণনা মতে তাঁকে মসজিদুল হারামে হাজরে আসওয়াদের বিপরীতে দাফন করা হয়। (ইবন আসাকির, তাহযীব, তারীখু দিমাশক ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ: ৩২২)
অন্য বর্ণনামতে তাঁকে হযারামাওত এলাকায় দাফন করা হয়েছে। তিনি ২২০বছর হায়াত লাভ করেন, মহান আল্লাহ আম্বিয়া আলাহিমুস সালাম এর আদর্শ আমাদের অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা–এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), বন্দর, চট্টগ্রাম; খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।












